শনিবার, ফেব্রুয়ারি ২৭
Shadow

রেললাইনে মৃত্যুর মিছিল

ট্রেনে কাটা পড়িয়া গত ২৬ সেপ্টেম্বর বনানীতে নিহত হইয়াছেন অজ্ঞাত পরিচয় এক যুবক। পরিতাপের বিষয় হইল, অসতর্কতায় রেললাইনে এমন মৃত্যুর ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই ঘটে। ঢাকা রেলপথ থানা পুলিশের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, গত এক বত্সরে রেললাইনে কাটা পড়িয়া মৃত্যু হইয়াছে ৩৫৪ জনের।
কেবল ঢাকায় নহে, সারা দেশেই ট্রেনে কাটা পড়িয়া মৃত্যুর সংখ্যা চিন্তা উদ্রেককারী। এক বত্সরে সারা দেশে রেলওয়েতে শুধু লাইনে কাটা পড়িয়া মৃত্যু হইয়াছে দুই সহস্রাধিক মানুষের। রেলওয়ের সিগন্যাল ও গার্ডসহ নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিতদের অসতর্কতা কিংবা অবহেলার কারণেও রেল দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। গত তিন বত্সরে দেশজুড়িয়া লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে হাজারটিরও বেশি। এইসব দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি টাকার উপরে। দেশে রেলওয়ের নেটওয়ার্কে ২ হাজার ৫৪১টি লেভেল ক্রসিং থাকিলেও রেলরক্ষী রহিয়াছে মাত্র ২৪২টিতে। একজন এক্সপ্রেস ট্রেনের চালক এই মর্মে তাহার ভীতির কথা জানাইয়াছেন যে, ঢাকা হইতে ট্রেন ছাড়িবার পর গতি বাড়াইতেই তাহাদের ভয় লাগে—না জানি কোথাও আবার লেভেল ক্রসিংয়ের উপর গাড়ির সারি রহিয়াছে কিনা! ইহার ফলে নির্ধারিত গতিতে ট্রেন চালানোও সম্ভবপর হয় না। রেলওয়ের বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, তিন কারণে রেল দুর্ঘটনা ঘটে— ইহার মধ্যে লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনা, সিগন্যাল লাইনে ত্রুটি এবং উন্নয়ন কাজ চলা অবস্থায় ট্রেন লুপ লাইন কিংবা সাইড লাইনে চলিয়া গিয়া দুর্ঘটনায় পতিত হয়। অন্যদিকে রেললাইনের উপর পথচারীদের অসচেতন চলাচল তাহাদের মৃত্যুর বড় কারণ। ঢাকা রেলপথ পুলিশের মতে, রেললাইনে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর অন্তত ৩০ শতাংশই ঘটে মোবাইল ফোনে কথা বলিতে বলিতে পথ চলিবার কারণে। তাহা ছাড়া অসতর্ক হইয়া রেললাইন পার হওয়াসহ অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। এইসব দুর্ঘটনা ঠেকাইতে পুলিশের পক্ষ হইতে সচেতনতামূলক লিফলেট বিলি করা হয়। রেললাইনে না হাঁটিবার জন্য স্টেশন হইতে মাইকিংও করা হয়। কিন্তু তাহার পরও দুর্ঘটনার লাগাম টানিয়া ধরা সম্ভব হইতেছে না। স্মর্তব্য যে, ট্রেন দুর্ঘটনা ছাড়া লেভেল ক্রসিং কিংবা লাইনে কাটা পড়িয়া মৃত্যুর জন্য রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দায়ী নহে। বরং লেভেল ক্রসিং কিংবা লাইনে কাটা পড়িয়া কাহারো মৃত্যু হইলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের উল্টা মামলা করিবার নিয়ম রহিয়াছে। কারণ রেললাইনের দুইপাশে ১০ ফুট করিয়া মোট ২০ ফুট এলাকায় যেকোনো মানুষ প্রবেশ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এমনকী, ২০ ফুটের মধ্যে কোনো গবাদিপশু প্রবেশ করিলেও তাহা আটকের মাধ্যমে বিক্রি করিয়া প্রাপ্ত অর্থ রেলওয়ে কোষাগারে জমা করিবার নিয়ম রহিয়াছে।
আইন বা নিয়ম আছে বটে, কিন্তু তাহার প্রয়োগের কোনো উদাহরণ সাধারণ মানুষের জানা নাই। সুতরাং রেললাইনে মৃত্যুর মিছিলের লাগাম টানিয়া ধরিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরো বেশি প্রাকটিক্যাল হওয়া প্রয়োজন। আইন বা নিয়ম অমান্যের জন্য শাস্তি বা জরিমানার দৃষ্টান্ত নানাভাবে প্রচার করিতে হইবে। পাশাপাশি মানুষ যাহাতে প্রকৃতই সচেতন হয়, তাহার ব্যবস্থাও করিতে হইবে কার্যকরভাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.