মঙ্গলবার, জানুয়ারি ১৯
Shadow

ধর্ষণের সময় সন্তানরা কান্না করায় গুলিকরে হত্যা

প্রাইম ডেস্ক :

গণহত্যা আর নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই এখন কক্সবাজারের উখিয়া-আর টেকনাফ এলাকায়। এখানে তাদের অস্থায়ী বসতি। খোলা আকাশের নিচে এখনও অনেকের বসবাস। এরমধ্যে উখিয়া-টেকনাফ সড়কের মঙ্গনাগুনা, বালুখালী, বালুখালী ডালার মোড়, কুতুপালং, চেংখালী, হ্যায়ংখালী এলাকার পাহাড়গুলো সবচেয়ে বেশি মানুষের ঠিকানা। সব মিলিয়ে ছোট বড় ২০টি পাহাড় আর সমতলে প্লাস্টিকের ‘ঝুপড়ি’ অসহায় মানুষের ঠিকানা। এখনও অনেক মানুষ আছেন জঙ্গলে নয়ত রাস্তার পাশে। গাছ কাটায় বদলে গেছে পাহাড়ের রূপ। তবুও পাহাড় আপন করে নিয়েছে অসহায় আশ্রিতদের। যদিও প্রতিটি পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে গড়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি। ভারি বর্ষণে যে কোন সময় সেখানেও ঘটতে পারে প্রাণহানি। ঝুঁকি নিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাবনা নেই। আশ্রয় মিলেছে সটাই বড় কথা।

পাহাড়ের ভাঁজে আর সমতলের প্রতিটি প্লাস্টিকের ঝুপড়ি ঘরে রয়েছে একটি করুণ গল্প। প্রতিটি ঘর মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের নীরব সাক্ষী। ছোট ছোট সবক’টি বসতি পাঁজরভাঙ্গা কষ্টের ইতিহাস। যা সবসময় তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। এখানে যারা আছেন, কেউ হারিয়েছেন স্বজন। কেউবা প্রিয়জন-সন্তান। কাছের মানুষ। সন্তানের সামনে মাকে ধর্ষণের পর আগুন দিয়ে শিশুদের জ্বালিয়ে দেয়ার ঘটনাও আছে। বার্মার মিলিটারিদের বীভৎসতা দেখে কান্না করায় বাবা-মায়ের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে শিশুদের। এমন অসংখ্য ঘটনা এখন উখিয়া আর টেকনাফজুড়ে। সবকিছু বুকে চেপে রেখে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।

সন্তানদের নির্বিচারে গুলি করে সেনারা

মিয়ানমারের মংডুর চালিপরাং এলাকার বাসিন্দা হামিদা খাতুন। তিনি এখন বালুখালী ডালার মোড়ের পাশের পাহাড়ে আশ্রয় নিয়েছেন। মাটি কেটে কেটে বানানো হয়েছে পাহাড়ের সিঁড়ি। প্রতি সিঁড়িতে দেয়া হয়েছে বালু বা মাটির বস্তা। পাহাড়ের চারপাশ ঘিরেই রয়েছে সিঁড়িপথ। যাদের যেভাবে সুবিধা সে পথ ধরেই ওঠেন। এরমধ্যে একটি ব্লকে থাকেন হামিদা। ছয় সন্তানের মধ্যে তিনজন ছোট। তিনজন বড়। সবচেয়ে বড় ছেলের বয়স ছিল ১০ বছর। তিনি জানালেন, সম্প্রতি সকাল বেলা মিলিটারিরা আমাদের গ্রাম ঘিরে ফেলে। সবাই ভয়ে ভীত, সন্ত্রস্ত। ওরা এসেই আমাদের গালাগাল দেয়। বলে ‘এটা তোদের দেশ নয়। তোদের দেশ বাংলাদেশ। ওখানে যা’।

আমরা বলেছি, ‘সকালে আমরা দেশ ছাড়ব। তোমরা আমাদের মের না। কিন্তু তারা কোন কথা শোনেনি। হঠাৎ বেপরোয়া হয়ে ওঠে সেনারা। একের পর এক আমার ছেলে মেয়েদের টেনেহিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে আনল। ঘরে আমার স্বামীকে বেঁধে রাখা হলো। এরপর তারা আমার ওপর অত্যাচার শুরু করে। আমি দু’জনকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বারান্দা পর্যন্ত চলে আসি। তারপর সবাই আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্বামী সন্তানদের সামনে পাষন্ডের দল আমাকে ধর্ষণ করে। রক্তাক্ত করে দেয় আমার শরীর। ওদের তা-ব দেখে আমার সন্তানরা কাঁদছিল। বড় দুই ছেলে আলাল-বেলাল আমাকে বাঁচানোর জন্য চিৎকার করছিল। প্রতিবেশীদের ডাকছিল তারা। কেউ এগিয়ে আসেনি। আমার সন্তানরা ওদের পায়ে পড়েছে। কিন্তু কাজ হয়নি। বারবার সন্তানদের কান্না থামাতে ধমক দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে ওরা আমার বড় দুই ছেলেকে গুলি করে।

একেরপর এক গুলিতে ছেলেদের বুক ঝাঁজরা হয়ে যায়। ওরা বাঁচার জন্য চেষ্টা করছিল। ছটফট করছিল মৃত্যু যন্ত্রণায়। মৃত্যুর সময় পানি চাচ্ছিল। কিন্তু আমাকে ওরা উঠতে দেয়নি। বারবার চেষ্টা করেছি। ভাই বলে সম্বোধন করেছি। মন গলেনি। ওরা হাসছিল। আমার আর্তনাদ একবারের জন্য মন গলাতে পারেনি তাদের। বুকের ওপর চার দস্যুর তান্ডব চলে।

চোখের সামনে আমার ছেলেরা ছটফট করতে করতে মারা গেল। রক্তে ভরে গেল উঠান। গাছ, বারান্দা, ঘরের বেড়া সবখানেই ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। কিন্তু আমরা দুই ছেলেকে রক্ষা করতে পারিনি। এ দৃশ্য দেখে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।

দু’দিন পর আমার জ্ঞান ফেরে। তখন পর্যন্ত উঠানে লাশগুলো পড়েছিল। আমি কোন রকম ওঠে স্বামীর হাতের বাঁধন কেটে দেই। এরপর আর কোনকিছু বলতে পারিনি। আবার যখন জ্ঞান ফেরে তখন দেখলাম আমি ক্যাম্পে আছি। এই বলে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন তিনি।

বললেন, ঘটনার পর আমার স্বামী বাড়িতে খবর পাঠায়। ছুটে আসেন আমার ভাইয়েরা। তারপর দু’পরিবার মিলে এখানে আসি। সাত ভাই মিলে আমাকে কাঁধে করে এখানে আনেন। তারাই ডাক্তার দেখান। কিন্তু এখনও রাতভর তো আমি ঘুমাতে পারি না। মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকা সন্তানদের চেহারা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। শুনেছি আমার ছেলেদের দাফনও হয়নি। ওদের লাশগুলো ওঠানেই পড়েছিল। চারপাশের পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় ভাইয়েরা আমাদের নিয়ে জীবন বাঁচাতে দ্রুত বাংলাদেশের পথে রওনা দেন।

স্ত্রীকে ধর্ষণের পর ঘরের আগুনে সন্তানদের ফেলে দেয়

মংডুর সোনারগজাবিল এলাকার বাসিন্দা নাদিরা খাতুন। তার জীবনের নির্যাতনের গল্পটা আরও করুণ। কান্না আসে। তিনিও কুতুপালং এলাকার একটি পাহাড়ে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। মিয়নমারের মিলিটারিদের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বারবার তাদের উদ্দেশ্য করে থু-থু ফেলছিলেন। বলছিলেন, ওরা মানুষ নয়। পশুও তাদের থেকে মানবিক। ভাল। এই বলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। তারপর আর কিছুই বলতে রাজি হলেন না। একেবারেই চুপ হয়ে গেলেন। এগিয়ে এলেন স্বামী হাকিল। তিনি জানালেন, যা আমাদের সঙ্গে করা হয়েছে বলার ভাষা নেই। তিনি জানান, গত ২৫ আগস্টের তিনদিন পর চারদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। জ্বালিয়ে দেয়া হয় ঘরবাড়ি। নির্বিচারে মানুষ হত্যা আর ধর্ষণে মেতে ওঠে সেনা ও মগরা। প্রতিবাদ করার কোন সুযোগ নেই। আমরা ভীতসন্ত্রস্ত। সবদিক থেকেই খারাপ খবর আসতে থাকে। সকালে আমাদের গ্রামে সেনা আর মগরা হানা দেয়।

তারা এসেই ঘর থেকে আমাকে বের করে দেয়। দুই সন্তানকে নিয়ে আমার স্ত্রী বিছানায় শুয়ে ছিল। আমি উঠানে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকি। দেখলাম মায়ের কোল থেকে জোর করে এনে ছেলে-মেয়েকে বারান্দায় ফেলে রাখে ওরা। বাচ্চাগুলো কান্না করছিল। এজন্য ওদের বুকের ওপর বুট দিয়ে পাড়া দেয় দস্যুর দল। তারপর ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ। নিজেকে রক্ষার জন্য নাদিরা চিৎকার করছিল। বারবার ক্ষমা চাচ্ছিল ওদের কাছে। হাতে পায়ে ধরছিল। কাজ হয়নি। তাদের যা করার করেছে। আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে আসে নাদিরার কন্ঠ। প্রায় একঘণ্টা পাশবিক নির্যাতনের পর রক্তাক্ত নাদিরাকে ওঠানে ফেলে দিয়ে ঘরের চারপাশজুড়ে আগুন দেয়। জ্বলন্ত আগুনে ফেলে দেয় আমার সন্তানদের। ওরা আগুনের মধ্যেও চিৎকার করছিল। আমি চেয়ে চেয়ে দেখলাম। কিন্তু প্রাণের ভয়ে কিছুই করতে পারিনি। সন্তানদের চিৎকার এখনও আমার কানে বাজে। নাদিরা প্রতিদিন কয়েকবার অজ্ঞান হয়। সন্তানদের খোঁজ করে। পাগলামি করে। আমি ওকে কিভাবে বোঝাব। কখনও কথা বলে। চুপচাপ থাকে বেশিরভাগ সময়। কথা বলতে বলতে অজ্ঞান হয়ে যায়। নাদিরাকে আমি বাঁচাতে চাই। তার উন্নত চিকিৎসা দরকার। কিন্তু আমার কাছে তো অর্থ নেই। কিভাবে তার চিকিৎসা হবে, তাকে বাঁচানোই আমার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জানি না এই চ্যালেঞ্জে আমি জিতব নাকি হেরে যাব। এই বলে চোখের পানি মুছতে লাগলেন সন্তানহারা এই বাবা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.