শনিবার, এপ্রিল ১৭
Shadow

গণপিটুনিতে হত্যা : এক নিষ্ঠুর সমাজ বাস্তবতা

মহসীন হাবিব :

সোহাগের লাশের ময়নাতদন্তে দেখা গেছে, তার পায়ের হাড় রীতিমতো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে। কী পরিমাণ নিষ্ঠুর হলে এভাবে একটি কিশোরকে দীর্ঘ সময় ধরে পিটিয়ে হত্যা করা সম্ভব! একটি সমাজে নানা ধরনের অপরাধী থাকে; থাকে সিরিয়াল কিলার, ডাকাত দল, লুণ্ঠনকারী, এমনকি হত্যাকারী যারা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে থাকে। এরা সবাই অন্ধকারের বাসিন্দা। কিন্তু সামাজিক জীবনযাপন করা লোকরা দলবেঁধে কী করে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করতে পারে; এ কোন সামাজিক জীবনের উদাহরণ?
২৫ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সাগর নামে যে ছেলেটিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, সে একজন হতদরিদ্র বাবার সন্তান। একটি বস্তিতে তাদের বাস। সাগরকে হত্যার যে ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠে এসেছে, তাতে দেখা গেছে ক্রোধোন্মাদ কয়েকজন বেধড়ক পেটাচ্ছে ছেলেটিকে। আর কয়েকজন নারী ও শিশু অসহায় চোখে ওই দৃশ্য দেখছে। কেউ একজন সে পাশবিক নির্যাতনের ছবি তুলে ইন্টারনেটে দিয়েছে। তারপরই শুরু হয়েছে তোলপাড়। আর তখনই অপরাধীদের শনাক্ত করার তাগিদ দেখা দিয়েছে। চুরির অভিযোগে সাগরকে হত্যা করে আক্কাস আলী নামের এক হ্যাচারির মালিক। সঙ্গে ছিল যথারীতি তার সাগরেদরা, ভাই-বেরাদার। সাগর নিহত হওয়ার পর তার লাশ নিয়ে ওরা ফেলে দেয় হ্যাচারির পাশেই একটি ঝোপে; কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। দুষ্কৃতকারীরা শনাক্ত হয়েছে।
এমন পিটিয়ে মর্মান্তিক হত্যার ঘটনা আমাদের দেখতে হচ্ছে বারবার। এটি বাংলাদেশের একটি নিষ্ঠুর কালচার। তাই আজ সমাজ মনস্তত্ব নিয়ে প্রশ্ন জাগে। ঠিক একই রকম দৃশ্য আমরা দেখেছি সিলেটের শিশু রাজন হত্যার ২৮ মিনিটের ভিডিওতে। কতটা উদ্ধত হলে হত্যাকারীদেরই একজন মোবাইল ফোনে ভিডিও করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে দিতে পারে, তা কল্পনা করাও কষ্টকরÑ কোনো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কয়েকজন মিলে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করছে। এমনকি অপরাধী বলে প্রমাণিত নয়, শুধু সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে একাধিক ব্যক্তি পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আমরা দেখে আসছি। যখন কাউকে কয়েকজন মিলে পিটিয়ে হত্যা করে, তখন তার চতুর্গুণ মানুষ চারপাশে তাকিয়ে দৃশ্য অবলোকন করে। তাদের কিছু করার থাকে না। এমন প্রকাশ্যে নিষ্ঠুর হত্যাকা-ের ঘটনা দেশে একটি-দুইটি নয়, অসংখ্য। প্রযুক্তির সুবাদে এখন হয়তো দুই-একটি ঘটনা সামনে চলে আসছে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বাধ্য হচ্ছে নিয়মমাফিক ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু যে ঘটনা কোনো প্রচার মাধ্যমে আসে না, শুধু একটি বা দুইটি গ্রামের লোক জানে, তার কোনো বিচার হয় না। বিচার হয় না, কারণ কোনো ধনী বা সমাজের প্রভাবশালীর দুলালকে পিটিয়ে হত্যা করা হয় না। এই তো মাত্র কিছুদিন আগের কথা, ফরিদপুর শহরের শহরতলী বদরপুর এলাকায় তিন মোটরসাইকেল আরোহী তরুণকে কিছু মানুষ মিলে ঘেরাও করে। ওই তিন তরুণের বাড়ি ছিল মাগুরায়। অভিযোগ, ওরা ডাকাত। কিন্তু ছেলেগুলো কান্নাকাটি করে আকুল আবেদন করে, আমরা ডাকাত নই, মাছের ব্যবসা করি। দয়া করে আমাদের ছেড়ে দিন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। তিন তরুণকে একসঙ্গে ডাকাত অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এমন হত্যাকা-ে কতটা নিষ্ঠুরতা ও পাশবিকতা দরকার, তা বোধগম্য। এ ঘটনা ফরিদপুরবাসী জানে, ফরিদপুরের পুলিশ প্রশাসনও জানে। কিন্তু কোনো মামলা বা কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। কারণ ওদের হত্যা করেছে ‘জনতা’। জানা গেছে, ওই ছেলেরা মাগুরা ফেরার পথে মোটরসাইকেল থামিয়ে প্রস্রাব করতে দাঁড়িয়েছিল। ওই ছেলেদের কাছে প্রকৃতপক্ষে একটি ছোট চাকুও ছিল না।
মনে আছে, কয়েক বছর আগে আমিনবাজারের কেবলার চর এলাকায় ছয় তরুণকে শবেবরাতের রাতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ওরা সবাই ছিল ছাত্র। ওই গণপিটুনিতে পাঁচজনই ঘটনাস্থলে এবং একজন কিছু পরে মারা যায়। শবেবরাতের রাতে মসজিদের মাইকে ডাকাত ডাকাত বলে ঘোষণা দিয়ে বাড়িঘর থেকে মানুষ ডেকে বের করা হয়। এ হত্যাকা-ে শুধু ব্যবহার করা হয়েছে ‘জনগণ’। পরে এ-ও জানা যায়, মসজিদের ইমামকে একটি মহল বাধ্য করে মাইকে ওই ঘোষণা দিতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই যে শত শত মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে নেমে এসেছে, এদের মধ্যে কেউ কি ছিলেন না, যিনি ছেলেগুলোকে ঘিরে ফেলার পর বলতে পারতেন, তোমরা দাঁড়াও, দেখি ছেলেগুলো সত্যিই ডাকাত কিনা, অথবা সত্যিই ডাকাত হলে হালকা উত্তম-মধ্যম দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করি! না, এমন কথা কেউ বলেননি অথবা বলার সুযোগ পাননি। কারণটা পরে তদন্তে জানা গেছে, ওই হত্যাকা- ছিল পরিকল্পিত।
কথায় বলে কৈ মাছের প্রাণ, যা সহজে মরে না। মানুষের এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে হয়তো একটি আঘাত পড়লে মৃত্যু হতে পারে; কিন্তু মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা কম কসরতের বিষয় নয়। সোহাগের লাশের ময়নাতদন্তে দেখা গেছে, তার পায়ের হাড় রীতিমতো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেছে। কী পরিমাণ নিষ্ঠুর হলে এভাবে একটি কিশোরকে দীর্ঘ সময় ধরে পিটিয়ে হত্যা করা সম্ভব! একটি সমাজে নানা ধরনের অপরাধী থাকে; থাকে সিরিয়াল কিলার, ডাকাত দল, লুণ্ঠনকারী, এমনকি হত্যাকারী যারা পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে থাকে। এরা সবাই অন্ধকারের বাসিন্দা। কিন্তু সামাজিক জীবনযাপন করা লোকরা দলবেঁধে কী করে কাউকে পিটিয়ে হত্যা করতে পারে; এ কোন সামাজিক জীবনের উদাহরণ? দশজন মানুষ একত্র হলে দুইজনের অন্তত বিবেক থাকার কথা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা থাকার কথা। এসব ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না কেন? মাত্র কয়েক মাস আগে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারে এক প্রবাসীর স্ত্রীর সঙ্গে এক ব্যক্তির পরকীয়ার কারণে জনতা তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। পরকীয়ার এ শাস্তিই কি সমাজ অনুমোদন করে? অবান্তর মনে হলেও এটা বলা যায়, যারা ওই মানুষটিকে পিটিয়ে হত্যা করেছে, তাদের অনেকেই নিজের জন্য একটি পরকীয়ার স্বপ্ন দেখে। পরকীয়া কি দেলদুয়ারের ওই ব্যক্তিই প্রথম করেছিলেন, যাকে তথাকথিত সমাজের পিটিয়ে মেরে ফেলার প্রয়োজন পড়ল?
এসব হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে আইনের শাসনের অভাব পরিষ্কার ফুটে ওঠে। তাই তো সোহাগের হত্যাকারী গর্ব করে বলতে পারে, মরলে মরুক, পুলিশ কিনে ফেলব। দুর্ভাগ্য হলেও সত্যি, এ দেশের মানুষের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতা ব্যাপক। এজন্য অবশ্যই দায়ী আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া। কিন্তু সেটাই সব বলে মনে করার কারণ নেই। মানুষের অসচেতনতা, অজ্ঞতা ও অন্ধত্বও এর জন্য কম দায়ী নয়। ইউরোপ-অমেরিকা যেখানে-সেখানে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়, ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষের জীবন কেড়ে নেয়; কিন্তু গোটা ইউরোপ বা আমেরিকায় একটি গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা খুঁজে পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ সমাজ ব্যবস্থায় এবং সমাজ মনস্তত্বে ওই কালচার নেই। পাশাপাশি পাকিস্তান অথবা বাংলাদেশে এমন গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা হামেশাই।
প্রায়ই দেখা যায়, সেলফোন চুরির অপরাধে কিশোরদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সেলফোন কিশোরদের কাছে এক লোভনীয় জিনিস। কিশোর-কিশোরীদের উচ্ছ্বসিত প্রাণে লুৎফর রহমানের আদর্শ-কথা থাকে না। আমার কৈশোরে এমন লোভনীয় বস্তু হাতের কাছে পেলে হয়তো আমিও সেটি চুরি করতাম। কিশোরের এ অপরাধকে মাইনর অপরাধ বলেই সভ্য সমাজ ধরে নেয়। আর এ সমাজে কিশোরকে দুষ্টুমির পর্যায়ের অপরাধের জন্য গণপিটুনিতে জীবন দিতে হয়!
এ ‘জনতা’র নিষ্ঠুরতার কালচার নতুন নয়। ইন্টারনেট-পূর্ব বাংলাদেশে এক উপজেলা থেকে আরেক উপজেলার খবর পৌঁছতে দিন চলে যেত। এক জেলা থেকে আরেক জেলায় কুশলাদি বিনিময়ে চিঠি লিখতে হতো, যা পৌঁছতে তিন দিন বা সাত দিন সময় পার হতো। সে সময় বহু হত্যাকা-ের কথা এখন আর কারও মনে নেই। শুধু পরিবারগুলোর কাছে সে দুঃসহ স্মৃতি আছে। আমার ছোটবেলায় ’৭০-এর দশকে একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা দেখেছি। তখন চাল শুধু ধনী লোকের খাবারে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষ রুটি খায় এবং গরিব মানুষ না খেয়েই দিন পার করে। এমনই এক পরিবেশে একজন রিকশাচালক বাচ্চাদের নিয়ে ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে কোনো একটি স্থান থেকে চাল চুরি করেন। চুরি ধরা পড়লে তাকে ফরিদপুর সরকারি শিশু সদনের সুপারিনটেন্ডেন্টের অফিসের সামনে একটি সিমেন্টের থামের সঙ্গে পিঠমোড়া করে বাঁধা হয়। এবার শুরু হয় তার ওপর শারীরিক নির্যাতন। এ নির্যাতনের প্রধান হাতিয়ার হয় খেজুরের কাঁটা। ছোট-বড় সবাই পাশের খেজুর গাছ থেকে কাঁটা তুলে আনছে এবং ওই চালচোরের পিঠে, বুকে, পেটে যে যেখানে খুশি খেজুরের কাঁটা বিঁধিয়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ কাঁটা ডাবল করে নিয়েছে। মানুষের মধ্যে কলুষিত হওয়ার প্রবণতা প্রবল। আমার বয়স তখন ৭-৮ বছর। আমার মনেও ইচ্ছা জেগেছিল আমিও একটি খেজুরের কাঁটা তার দেহে ঢুকিয়ে দিই। ভাগ্য প্রসন্ন, তাই অন্যায়টি করা হয়নি। কিন্তু সেদিন বয়স্ক অনেক মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ ‘জনতা’কে বাধা দেননি। কেন?
দেশের মানুষ নাকি ধর্মপ্রবণ। ধর্মীয় অনুশাসন, দিকনির্দেশনা পালনে এরা খুবই নিষ্ঠাবান। এখানে যে ধর্মগুলো মানুষ অনুসরণ করে, তার প্রত্যেকটি শান্তির বাণী প্রচার করে। ইসলামের নবীর বহু ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার প্রদর্শনের কাহিনী সাধারণ্যের বিশ্বাসে আছে। যিশু ক্রাইস্ট তো জীবন দিয়ে দিলেন ধৈর্য প্রদর্শন করে। হিন্দুর মহাভারত ত্যাগ আর সহিষ্ণুতার মহাকাব্য। তবে এ দেশের মানুষ এত অসহিষ্ণু হয় কী করে! শত শত বছর ধরে আমরা কী শিক্ষা গ্রহণ করেছি ধর্মীয় দিকনির্দেশনা থেকে, সামাজিক জীবন গঠনের মধ্য দিয়ে? কী শিক্ষা আমরা গ্রহণ করেছি মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শন থেকে, রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর বা রবীন্দ্রনাথের জীবন দর্শন থেকে? সমাজের কাজ তো শুধু একসঙ্গে বসবাস করা নয়, সমাজ কল্যাণ সমিতি বা সংস্থা তৈরি নয়। সমাজের দায় মানুষের মধ্য বিবেক জাগ্রত করা, ব্যক্তিমানুষকে মূল্যবোধের পাঠ দেয়া। আমরা সমাজের কাছ থেকে তাহলে কী শিখছি? প্রশ্ন জাগে, সত্যিকারের সমাজ বা সামাজিক জীবন কি এখানে গঠিত হয়েছে?
জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায় একটি গানের কথায় বলেছেন, ‘এ কোন সকাল, রাতের চেয়েও অন্ধকার।’ সমাজ মনস্তত্ব দেখা যায় না, অনুভব করতে হয়। সে অনুভূতির জায়গায় আমরা ঘোর অমনিশাই দেখি। মানুষের মধ্যে গণপিটুনির মতো জঘন্য অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে সচেতনতা আনতে হলে ব্যাপক প্রচার চালানো দরকার। প্রয়োজনে স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচিতে গণপিটুনি সম্পর্কে রচনা অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। মানুষকে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়া দরকার। পাঠ্যপুস্তকে সময়োপযোগী শিক্ষা না দেয়া গেলে সমাজ পিছিয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, গণপিটুনি সম্পর্কে সুস্পষ্ট কঠিন আইন প্রবর্তনের প্রয়োজন। জনতার নামে হত্যাকা-ে যাতে কেউ না জড়াতে পারে, সেজন্য অচিরে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। অভিভাবক হিসেবে সরকারকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

মহসীন হাবিব
সাহিত্যিক ও ইংরেজি দৈনিক দি এশিয়ান এজের নির্বাহী সম্পাদক

Leave a Reply

Your email address will not be published.