বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৫
Shadow

আবার আলোচনায় প্রধান বিচারপতি

প্রাইম ডেস্ক :

গত দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের টানাপড়েন চলছিল। শুরুটা হয়েছিল নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরিবিধির গেজেট প্রকাশ নিয়ে। গত আগস্টে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর সে টানাপড়েন প্রকাশ্য রূপ নেয়। বিশেষ করে সে রায়ে দেওয়া পর্যবেক্ষণের কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হা। রায়ের পক্ষে-বিপক্ষে সরগরম হয়ে পড়ে রাজনৈতিক ও আইনাঙ্গন। পরে গত সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রায় বাতিলের জন্য আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব পাস করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সিদ্ধান্ত হয়। এমন অবস্থায় গত ২৭ আগস্ট থেকে সুপ্রিমকোর্টের ৩৯ দিনের অবকাশকালীন ছুটি শুরু হলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে আসে। কিছু দিনের জন্য হলেও ঢাকা পড়ে যায় ষোড়শ সংশোধনী রায় নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক। আলোচনার বাইরে চলে যান প্রধান বিচারপতি। কিন্তু গত সোমবার অবকাশকালীন ছুটি শেষের এক দিন আগে হঠাৎ করেই এক মাসের ছুটির আবেদন করায় আবার নতুন করে আলোচনায় এলেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হা (এস কে সিন্হা)।

এ নিয়ে গত দুদিন ধরেই সরগরম দেশের আইন ও রাজনৈতিক অঙ্গন। আবারো আলোচনায় বিচার ও নির্বাহী বিভাগ। একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রধান বিচারপতি অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে ছুটি নিয়েছেন এবং রাষ্ট্রপতি ৩ অক্টোবর থেকে তা অনুমোদন দিয়েছেন। এই সময়ে জ্যেষ্ঠ বিচারক মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির কার্যভার দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এমনও বলা হয়েছে, ষোড়শ সংশোধনী রিভিউর সঙ্গে প্রধান বিচারপতির ছুটির কোনো সম্পর্ক নেই। নানা মত দিচ্ছেন আইনজ্ঞরা। ঘুরে-ফিরে আলোচনায় আসছেন প্রধান বিচারপতি। এমনও ভাবা হচ্ছে, এক মাসের ছুটির মাধ্যমে আলোচনায় থেকে প্রধান বিচারপতির সরে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে চলা বিচার বিভাগের টানাপড়েনেরও আপাতত শেষ হলো। তবে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতি ও বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের দাবি, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হাকে ছুটিতে যেতে প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। এমনকি প্রধান বিচারপতির ছুটির বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গতকাল রাতেই জরুরি বৈঠক করে বিএনপি।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে নতুন করে টানাপড়েন শুরু কিংবা ষোড়শ সংশোধনী রায় পুনর্বিবেচনায় কোনো প্রভাব ফেলবে কি না-গত দুদিন ধরেই এমন প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আইনজ্ঞরা বলেছেন, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রধান বিচারপতির ছুটিতে গেছেন। এখানে অন্য কোনো কারণ নেই। চাপের বিষয়ও নেই। এমনকি এ নিয়ে রাজনীতি না করারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা। তারা আরো বলেছেন, বিচারকাজ পরিচালনায় সংবিধান অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির পরবর্তী জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্বভার দিয়েছে সরকার।

আইনজ্ঞ প্রধান বিচারপতির ছুটির পক্ষে এমনও মত দেন যে, দীর্ঘদিন ধরে প্রধান বিচারপতি বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। আইনমন্ত্রী তার অসুস্থতার কথা বলেছেন। ৩১ জানুয়ারি তিনি অবসরেও যাবেন। এর আগে অনেকগুলো মামলার রায় দিতে হবে তাকে। সব দিক বিবেচনায় রাষ্ট্রপতি তার ছুটি মঞ্জুর করেছেন। এ ছুটি তার প্রাপ্য।

সুপ্রিমকোর্ট সূত্রমতে, গত ২৭ আগস্ট থেকে সুপ্রিমকোর্টে ৩৯ দিনের অবকাশকালীন ছুটি শুরু হয়। এরই মধ্যে কানাডা ও জাপানে প্রায় পক্ষকাল সফরশেষে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হা গত ২৩ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন। ৮ সেপ্টেম্বর প্রথমে তিনি তার অসুস্থ মেয়েকে দেখতে কানাডায় গিয়েছিলেন। এরপর তিনি কানাডা থেকে গত ১৭ সেপ্টেম্বর জাপান যান এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান বিচারপতিদের সম্মেলনে যোগ দিতে। অবকাশকালীন ছুটি শেষে গত মঙ্গলবার তার কাজে যোগ দেওয়ার কথা।

প্রধান বিচারপতির ছুটি নিয়ে বিভিন্ন মহলের নানা আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী রায়ের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির ছুটির কোনো সম্পর্ক নেই। যারা এটাকে সংযোগ করতে চাইছে, আমি বলব তাদের একটা দুরভিসন্ধি আছে। তিনি আরও জানান, ছুটির আবেদনপত্রে প্রধান বিচারপতি ক্যান্সারসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত ছিলেন এবং সেগুলো সম্পূর্ণ সারেনি বলে উল্লেখ করেছেন। এ জন্য তার আরও বিশ্রামের প্রয়োজন।

প্রধান বিচারপতির ছুটি এবং পরবর্তী প্রধান বিচারপতির দায়িত্বভার অর্পণের নিয়ম কী-জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, প্রধান বিচারপতি নিজের ছুটি নিজেই নেন। কিন্তু তার ছুটি থাকাকালীন আরেকজন প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ জন্য রাষ্ট্রপতিকে সেটা অবহিত করতে হয়। এই অবহিতপত্রটাই আইন মন্ত্রণালয় প্রক্রিয়া করে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যায়। এখানে সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা কর্মে প্রবীণতম বিচারপতি। তাকে অস্থায়ী প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটা স্বাভাবিক ও আইনানুগ বিষয়। এই ছুটি নিয়ে তাই অন্য কোনো ধারণা করার সুযোগ নেই বলেও মত দেন এই আইনজ্ঞ।

এর আগে অবকাশের মধ্যেই গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি দুই সপ্তাহের জন্য বিদেশ সফরে গেলে তার অবর্তমানে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারক হিসেবে বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব দেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। পরে গত সোমবার প্রধান বিচারপতির আরো এক মাসের ছুটিতে যাওয়ার তথ্য জানান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। পরে আইন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ‘মাননীয় প্রধান বিচারপতি অসুস্থতাজনিত ছুটি ভোগকালীন সময়ে বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট আপিল বিভাগের কর্মে প্রবীণতম বিচারক মাননীয় বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনের দায়িত্ব প্রদান করিয়াছেন’ বলে উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে প্রধান বিচারপতির ছুটিকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিকভাবে সরব হয়েছে বিএনপি ও দলের সমর্থিক আইনজীবীরা। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দাবি করেছেন, প্রধান বিচারপতিকে অসুস্থ বানিয়ে সরানো হয়েছে। প্রধান বিচারপতির ছুটিতে যাওয়াকে কেন্দ্র করে গতকাল সকাল থেকে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা হাইকোর্টের সমিতি ভবনে স্লোগানসহ থেমে থেমে বিক্ষোভ মিছিল করেন। সমিতির নেতারা দাবি করেছেন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিন্হাকে ছুটিতে যেতে তার ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।

প্রধান বিচারপতির ছুটিকে কেন্দ্র করে ওঠা নানা বিতর্ক নিয়ে কথা হয় দেশের আইনজ্ঞদের সঙ্গে। এদের মধ্যে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, প্রধান বিচারপতি ছুটি নিতেই পারেন। তা ছাড়া তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগে কাজ করছেন। আগামী ৩১ জানুয়ারি অবসরে যাবেন। উনি নিজে বলেছেন, অনেকগুলো মামলার রায় পেন্ডিং রয়েছে। আইনমন্ত্রী অসুস্থতার কথা বলেছেন। এসব কারণে তারও কিছুদিন বিশ্রাম দরকার। এই ছুটিতে তার প্রাপ্যতা আছে। আর রাষ্ট্রপতিও বিবেচনায় ছুটি মঞ্জুর করেছেন। সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার পরবর্তী জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে অনেকে রাজনীতি খুঁজে পাচ্ছেন। চাপের মুখে তিনি ছুটি নিয়েছেন বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। আমি সেটা দেখছি না। উনি সুস্থ থাকলে অবশ্যই ছুটি শেষে তার পদে বসতে পারবেন।

এই ছুটির সঙ্গে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল রায়ের পুনর্বিবেচনার আবেদনের কোনো সঙ্গতি আছে কি না-জানতে চাইলে এই আইনজ্ঞ বলেন, রিভিউ তার মতো চলবে। ষোড়শ সংশোধনী বাতিল রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করতে হবে। সার্টিফায়েড কপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যেই করতে হবে। এটি প্রধান বিচারপতির ছুটির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়টি রিভিউর মাধ্যমে সমাধান হবে। এখানে রাজনৈতিক কোনো টানাপড়েন আছে বলে মনে করি না।

একইভাবে আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম বলেন, ব্যক্তিগত কারণে যেকোনো বিচারপতি স্বাভাবিকভাবেই ছুটিতে যেতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে বিচার বিভাগ কখনোই কোনো চাপে ছিল না। বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ স্বাধীন। বিচারপতি ব্যক্তিগত কারণে ছুটিতে যেতেই পারেন। এটা স্বাভাবিক বিষয়। এর সঙ্গে ষোড়শ সংশোধনী ও আদালতে পাকিস্তানের প্রসঙ্গ এবং সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের টানাপড়েনের কোনো সম্পর্ক নেই।

অবশ্য এই আইনজ্ঞের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও বিএনপির চেয়ারপাসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, কোনো প্রধান বিচারপতি একসঙ্গে এত লম্বা ছুটিতে গেছেন আমরা এ রকম ঘটনা অতীতে দেখিনি। আমরা সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে ওনার (প্রধান বিচারপতি) কাছে গিয়েছিলাম, ছুটিতে যাওয়ার কারণ জানার জন্য। প্রথমে উনি বলেছেন, অসুস্থ তাই দেখা করতে পারবেন না। তারপর কী কারণে ছুটিতে যাচ্ছেন জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এখন ছুটির বিষয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলবেন না। এ রহস্যের কারণ কী?

Leave a Reply

Your email address will not be published.