শুক্রবার, মে ৭
Shadow

রোহিঙ্গা সংকট ও শান্তিতে নোবেল

নোবেল ফাউন্ডেশন মোট ৬টি বিষয়ে নোবেল পুরস্কার দিয়ে থাকে। পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা শাস্ত্র, অর্থনীতি, সাহিত্য এবং শান্তি।
এ পর্যন্ত ২০১৭ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য ৩১৮ জন প্রার্থীর নাম জমা পড়েছে। এর মধ্যে ২১৫ জন ব্যক্তি এবং ১০৩টি সংস্থার নাম রয়েছে। মূলত বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলেই কেবল শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। সাম্প্রতিককালে বিশ্বের সব চেয়ে আলোচিত বিষয় হলো রোহিঙ্গা। এই রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যে কারণে আমরা আশা করতেই পারি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের বিষয়টি। চলুন একটু বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাই।

মিয়ানমারের সামরিক জান্তার গণহত্যা থেকে কোনরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে আমাদের সরকার। শুধু যে আশ্রয় দিয়েছে তা কিন্তু নয় মোটামুটি সুন্দর ও সুস্থভাবে বাঁচার জন্য তাদের যা যা প্রয়োজন তাই করে দেওয়া হয়েছে। সরকার তো করেছেই পাশাপাশি সারাদেশের সাধারণ মানুষ যেভাবে রোহিঙ্গাদের সহযোগিতায় ঝাপিয়ে পড়েছে সত্যিই তা অকল্পনীয়। আমাদের দেশের অত্যন্ত গরীব মানুষ যারা দিন আনে দিন খায় তারাও রোহিঙ্গাদের সহায়তায় যে যা পারছে এখনও করছে। খুব আশ্চর্য হয়েছি যখন দেখেছি আমাদের দেশের কিছু ভিক্ষুক তারাও রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ করছে তখন গর্বে বুক ভরে উঠেছে। বিশ্ব নেতাদের আর বুঝতে বাকী নেই বাংলাদেশের মানুষ কতটা হৃদয়বান।

রোহিঙ্গাদেরকে আমাদের দেশে আশ্রয় দেওয়ায় আমাদের লাভ-ক্ষতি নিয়ে একটু ভেবে দেখা দরকার। ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্রসীমা সহ ২,৪৬,০৩৭ বর্গ কিলোমিটারের আমাদের এই বাংলাদেশ। যা বিশ্বের অনেক দেশের একটি অঙ্গ রাজ্যের চেয়েও অনেক ছোট। কিন্তু লোক সংখ্যা ওই ছোট অঙ্গ রাজ্যের চেয়ে দ্বিগুণ। প্রতিনিয়তই লোক সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আশানুরুপ হচ্ছে না। উপরুন্তু বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আমরা রীতিমত নাজেহাল। বিশেষ করে অকাল বন্যা,পাহাড় ধস সব মিলিয়ে আমরা জীবন যাপনে মারাত্মকভাবে হিমশিম খাচ্ছি। অল্প কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া বন্যায় দেশের ২১ জেলায় প্রায় ৩৫ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ১ লাখ ৭২ হাজার ২১৭ হেক্টর ফসলি জমি নষ্ট হয়েছে। এই ক্ষতি এখনও আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। যে কারণে দেশে চালের বাজার এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাহিরে। আর তার ঠিক কয়েকদিন আগে পাহাড় ধসে শ দুয়েক মানুষ মারা গেলো। কেনো পাহাড় ধস হয় তার কারণ আমাদের সবার জানা। পাহাড় ধসের অন্যতম কারণ হলো গাছপালা ও পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন করা।

এই যখন আমাদের অবস্থা ঠিক তখনই পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র মিয়ানমারের সরকার অন্যায়ভাবে রোহিঙ্গা উৎখাতে কোমর বেঁধে নামলো। রোহিঙ্গাদের উপর চালানো শুরু করলো অত্যাচারের স্টিম রোলার। খুন,ধর্ষণ ও ঘর বাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়ে উঠলো নিত্যনৈমিত্তক ঘটনা। রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা শুরু করলো আমাদের বাংলাদেশে। প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ চলে আসলো, এখনও আসছে। এদের সবাইকে বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাদরে গ্রহণ করলেন। মানবতার কবি বঙ্গবন্ধুর কন্যা আমাদের প্রধানমন্ত্রী ঠিক তাই করছেন যেমনটা আমরা ও বিশে^র মানুষ চেয়েছি।

তারপরের ঘটনা বিশ্বের সবার নজরে ইতিমধ্যে চলে আসছে। শেখ হাসিনা মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো। যেখানে অল্প কয়েকদিন আগে পাহাড় ধসে আমাদের দেশের মানুষ মাটি চাপা পড়ে মারা গেলো। সরকার শক্ত হাতে তা কাটিয়ে উঠলো আর ঘোষণা দিলো যারা পাহাড়ের মাটি ও গাছপালা কাটার সাথে সম্পৃক্ত তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে বিচারের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের বাঁচাতে ২৮টি পাহাড়ে মাটি কেটে আজকে মানবতার খাতিরে শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিলো। ২ থেকে ৩ হাজার একর সরকারি বনভূমির উপর অস্থায়ী আবাসস্থল নির্মাণ করা হলো । আমাদের দেশের মানুষ ভুলে গেলো পাহাড় ধসের কথা ভুলে গেলো বন্যার কথা। ঝাপিয়ে পড়লো রোহিঙ্গাদের শিবিরে সাহায্য করার জন্য। এ যেন নিজের বুকে গুলি লাগলেও অন্যকে নিরাপদে রাখার এক অনন্য নজীর। পক্ষান্তরে যদি বাংলাদেশের সীমান্ত পয়েন্ট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হতো তাহলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নি:সন্দেহে গুলিতে মারা যেতো, এতে কোনো সন্দেহ ছিলো না।

এদিকে মিয়ানমারকে বিশ্বের সবাই একের পর এক চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করলো। কিন্তু কোনোভাবেই যখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীদের অত্যাচার থামছিল না ঠিক তখন শেখ হাসিনা জাতিসংঘের ৭২তম অধিবেশনে মিয়ানমারের সহিংসতা ও জাতিগত নিধন চিরতরে বন্ধ করে এই সংকট নিরসনে ৫টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করেন। এ ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান। বক্তব্যের এক পর্যায়ে শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা যুদ্ধ চাই না,শান্তি চাই। আমরা অর্থনৈতিক উন্নতি চাই, মানব ধ্বংস নয়, মানবকল্যাণ চাই”। শেখ হাসিনার এই বক্তব্য ও ৫ দফা প্রস্তাব সারা বিশ্বে ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। চিন ও রাশিয়া এখন সহানুভূতি দেখাচ্ছেন। প্রমাণ হয়েছে তিঁনি বিপন্ন বিশ্বের মানবতার বাতিঘর। মিয়ানমারের সরকার এখন রোহিঙ্গা বিষয়ে অনেকটায় নমনীয় হয়েছেন। তাদের মন্ত্রী আমাদের দেশে এসেছেন এবং রোহিঙ্গা ফেরৎ নেওয়ার ব্যাপারে সম্মতিও জ্ঞাপন করেছেন। রোহিঙ্গা ইস্যুটি মূলত মিয়ানমারের জাতিগত সমস্যা। সুতরাং শান্তি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার এই অনন্য অবদান সারা বিশ্বে চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে।

কার্যত আমরা বিবেচনায় আনতেই পারি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের বিষয়টি। নোবেল ফাউন্ডেশন কাকে বা কোন সংস্থাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করবেন এটা তাদের কমিটির সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিশ্বে ইতিপূর্বে শান্তিতে যে কারণে যাদেরকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে তা পর্যালোচনা করে দেখলে নোবেল কমিটির সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে অনেকাংশেই সহজ হবে।

সোলায়মান মোহাম্মদ
সংবাদকর্মী ও কলাম লেখক
sulaymansir87@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published.