মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২৬
Shadow

মাদকাসক্তি নিরাময়ের বেহাল দশা

মাদক বাংলাদেশে একটি ভয়াবহ সমস্যা। মাদকাসক্তদের অধিকাংশই তরুণ। বস্তুত গত পাঁচ-সাত বত্সরে মাদকাসক্তির হার প্রায় শতগুণ বাড়িয়াছে। অথচ তাহাদের চিকিত্সার কোনো পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নাই বলিলেই চলে। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সরকারি কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের মান যাহাই হউক, নিরাপত্তা ব্যবস্থাও নাজুক। ২০১১ সাল হইতে এই পর্যন্ত অন্তত সাত দফায় অর্ধশতাধিক মাদকাসক্ত সেখানে চিকিত্সাধীন থাকা অবস্থায় পালাইয়া গিয়াছে। এই বত্সরেই পালাইবার ঘটনা ঘটিয়াছে দুইবার। তথাপি নিরাময় কেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয় নাই। চিফ কনসালট্যান্টসহ সেখানে ১৯টি অনুমোদিত চিকিত্সকের পদ থাকিলেও আছেন মাত্র ৮ জন। নার্স ২২ জনের মধ্যে আছেন ৮ জন। নিরাপত্তা কর্মী আছেন মাত্র তিনজন। প্রতি ৮ ঘণ্টার শিফটে একজন দায়িত্ব পালন করিলেও ছুটির দিনে নিরাপত্তা কর্মীর সংকট থাকে। সরকারিভাবে পরিচালিত কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের এই হাল হইলে অন্য নিরাময় কেন্দ্রগুলির অবস্থা সহজেই অনুমেয়। অবশ্য কেবল নাজুক নিরাপত্তার কারণেই তাহারা পালাইবার প্রণোদনা পাইতেছে— এই কথা বলা যাইবে না। স্বাভাবিক জীবনে ফিরিতে যে চিকিত্সা ও আন্তরিকতা প্রয়োজন তাহার অভাবই পলায়নের মূল কারণ বলিয়া ধারণা করা হইতেছে।
বিষয়টি বুঝিতে বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের অবস্থার দিকে আমরা নজর ফিরাইতে পারি।  পত্রিকান্তরে ঢাকার একটি নিরাময় কেন্দ্রের বিবরণ তুলিয়া ধরা হইয়াছে এইভাবে: বেড়িবাঁধের পাশে টিনশেডের আধাপাকা বাড়ি। ছোট ছোট পাঁচটি কক্ষ। নেই আলো-বাতাসের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা, ঘরের জানালা বলিতে টিনকাটা ফোকর। তাহার মধ্যেই রান্না ও থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। চিকিত্সক নাই, নাই চিকিত্সা সরঞ্জাম, রোগীরা ঘুমায় মেঝেতে। ঢাকা মহানগরে এইভাবে পাঁচ শতাধিক মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র চলিতেছে। তন্মধ্যে নিবন্ধন নিয়াছে মাত্র ১০টি। অন্যরা আবেদন পর্যন্ত করে নাই।  এইগুলিকে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখাইয়া কেহ কেহ সমাজসেবা অধিদপ্তর বা ঢাকা সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নিকট হইতে সনদ নিয়া তাহা পরিচালনা করিতেছেন। চিকিত্সা-সুবিধা বলিতে কিছুই  নাই, বরং আছে অভিযোগ আর অভিযোগ। এমনকি চিকিত্সার নামে রোগীর উপর শারীরিক নির্যাতন, মাদকের ব্যবসা পরিচালনা ও রোগীর স্বজনদের নিকট হইতে ইচ্ছামতো অর্থ আদায়ের অভিযোগও রহিয়াছে। বস্তুত বেসরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তি পরামর্শ কেন্দ্র, মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ও মাদকাসক্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা বা সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য ২০০৫ সালের জুনে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে প্রণীত বিধিমালা কেহই মানিতেছে না।
এই বাস্তবতা সত্যিই ভয়াবহ। মাদকাসক্তি বাড়িলেও মানসম্মত নিরাময় ব্যবস্থা এখনো গড়িয়া উঠে নাই। আমরা আশাও করি না যে, রাতারাতিই তাহা গড়িয়া উঠিবে। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যেইটুকু ব্যবস্থা আছে তাহার অধিকাংশই মাদকাসক্তদের নিরাময় করিবার পরিবর্তে অধিকতর অসুস্থ করিয়া তোলে।
মাদকাসক্তদের অনেকেই স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়া পাইতে নিজেই নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হন। আবার পরিবারের সদস্যরাও তাহাদের  নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করেন। কিন্তু উপযুক্ত পরিচর্যা ও আন্তরিকতার অভাব তাহাদের পালাইয়া যাইতে উত্সাহিত করে। এই অবস্থার আশু অবসানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করিবেন— ইহাই আমাদের প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.