বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৮
Shadow

উদ্বোধন অপেক্ষায় মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভার

প্রাইম ডেস্ক :

ভরা দুপুরের কড়া রোদে কেউ বসে নেই। কেউ ঘষে মুছে ধব ধবে সাদা রঙে রাঙিয়ে তুলছে সেফটি পিলার। কেউ বাতিতে রং বেরঙের তার কেটে বিদ্যুৎ সংযোগ দিচ্ছে। কেউ আবার স্প্যানের ভেতরের সংযোগ (এসটিইউ) দিতে ব্যস্ত। হাতে সময় খুব কম। কাজও প্রায় শেষ। উদ্বোধনও হবে এ মাসের মাঝামাঝিতে। তাই খুব তোড়জোড়ে মালিবাগ-মৌচাক সমন্বিত ফ্লাইওভারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন কর্মরত শ্রমিকরা। মালিবাগ-মৌচাক এ উড়ালসড়কে টানা তিনবছর ধরে এসটিইউ সেকশনে কর্মরত রাজারবাগ এলাকার ইকবাল মাহমুদ  বলেন, নয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের চার লেনের এ ফ্লাইওভারটির মূল কাজ পুরোটাই সম্পন্ন হয়েছে। অপরদিকে সড়কের ডিভাইডার চিহ্ন, দু’পাশের বেড়িকেডসহ ধোয়ামোছা ও রং করার কাজও প্রায় শেষের দিকে। তবে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে বাদ-বাকি কাজগুলো সমাপ্ত হয়ে যাবে বলে জানান এই নির্মাণ শ্রমিক। এদিকে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ চলে আসা এ ফ্লাইওভার উদ্বোধন এ মাসেই হবে বলে মনোযোগের সঙ্গে দ্রুত কাজ করছেন নির্মাণ শ্রমিকরা। শান্তিনগরের ফ্লাইওভারের বিদ্যুতের খুঁটিতে তার সংযোগ দিচ্ছিলেন ইলেকট্রিশিয়ান আবুল আহসান। তিনি বলেন, মৌচাক, মগবাজার, রাজারবাগ ও শান্তিনগরের অংশে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রায় শেষ। এখন বাকি আছে শুধু মালিবাগ চৌরাস্তা মোড়ের মূল বিদ্যুতের সংযোগ। তবে দিন-দুয়েকের মধ্যে কাজ সমাধান দেয়া যাবে বলে জানান তার সহযোগী আলতাব হোসেন। গতকাল মালিবাগ-মৌচাক সমন্বিত ফ্লাইওভার ঘুরে দেখা যায়, সড়কের কালো পিচের মাঝখানে সাদা রঙের ডিভাইডার চিহ্ন ও দু’পাশে সেফটি দেয়ালে সাদা রঙের ওপর সূর্যের আলোর ঝলকানিতে ঝকঝক করছে ফ্লাইওভারটি। এদিকে সেফটি দেয়ালের ওপরে লাল রঙের মোটা পাইপ ও বড় বড় নাট বল্টু দিয়ে অসংখ্য বিদ্যুৎ খুঁটি সংযুক্ত করে দৃষ্টিনন্দন করে প্রস্তুত করা হচ্ছে রাজধানীর দ্বিতীয় এ বৃহৎ ফ্লাইওভারটি। উদ্বোধন হলেই আর বাধা থাকবে না সব ধরনের যান চলাচলে। জানাচ্ছিলেন মৌচাক এলাকায় এসটিইউ সেকশনে কর্মরত আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, এখন সব ধরনের যান চলাচলের উপযোগী মালিবাগ-মৌচাক উড়ালসড়ক। অপেক্ষা কেবল উদ্বোধনের। তবে ফ্লাইওভারে যান চলাচলে কয়েকটি পয়েন্টে সম্মুখীন হতে হবে গতি বিপত্তির। ফলে মালিবাগ-মৌচাক মোড়ে ফ্লাইওভারে বসানো হয়েছে গতিরোধক সিগন্যাল লাইট। নির্মাণ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফ্লাইওভারে কোনো সিগন্যাল থাকার কথা না থাকলেও নকশায় ভুল করার কারণে নাকি এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। মালিবাগ ও মৌচাক মোড়ে দেখা যায়, পশ্চিম ও পূর্ব পাশে সেট করা হয়েছে সিগন্যাল লাইট। এতে পড়তে হবে সব ধরনের যানবাহনকে গতি বিপত্তিতে। এদিকে বিভিন্ন দেশের ফ্লাইওভারের উদাহরণ টেনে প্রকল্প পরিচালক সুশান্ত কুমার পাল বলেন, সড়কের নকশায় ভুলের কোনো প্রশ্নই আসে না। ৬ লেনের এ ফ্লাইওভারটিতে পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে নির্ধারিত স্থানে সিগন্যাল লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এছাড়াও ফ্লাইওভারের কিছু আনুষঙ্গিক কাজ চলমান রয়েছে।  যা সম্পন্ন হতে আরো মাস খানেকের মতো সময় লাগবে বলে জানান শ্রমিকরা। তবে একাজ যান চলাচলের  ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধার সৃষ্টি হবে না বলে জানান তারা। এদিকে ফ্লাইওভারের কাজের পাশাপাশি নিচের সড়কগুলোর মেরামতের কাজও চলছে দ্রুত গতিতে। মৌচাক থেকে মালিবাগ, মালিবাগ থেকে শান্তিনগরের সড়কটি খুব দ্রুততার সঙ্গে মেরামত করে চলাচল উপযোগী করে তোলা হয়েছে। তবে মালিবাগ থেকে রাজারবাগ সড়কটিতে এখনো চলছে  মেরামত কাজ। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে সড়কের কাজগুলোও শেষ করা হবে বলে জানান শ্রমিকরা। টিম গ্রুপের নেতা আলতাফ মিয়া বলেন, ফ্লাইওভারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিচের সড়কের কাজও চালিয়ে যাচ্ছি। ফ্লাইওভার ও নিচের সড়কের কাজ একই সঙ্গে শেষ হবে বলে জানান এ টিম নেতা।  এদিকে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তমা ও নাভানা কনস্ট্রাকশনের যৌথ ঠিকাদারিতে উদ্বোধন করা এ ফ্লাইওভারের কাজ। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার কথা। দফায় দফায় বাড়ানো হয় প্রকল্পের সময়। পাশাপাশি প্রকল্পের ব্যয় ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা থেকে পরিবর্তন করে ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। গত বছরের মার্চ ও সেপ্টেম্বরে দু’ধাপে সাতরাস্তা ও ইস্কাটন উড়ালসড়ক খুলে দেয়া হলেও মগবাজার মৌচাক-মালিবাগের সড়কটি অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। এতে মালিবাগ-মৌচাক, মগবাজার এলাকার মানুষদের দীর্ঘদিন ধরে পোহাতে হয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগ। আর চারবছর যাবত রাস্তা খনন, জলাবদ্ধতা ও প্রচণ্ড যানজটের চরম দুর্ভোগের এসব চিত্রও স্থান পেয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এবার সেই দুর্ভোগের ইতি টানতে অবশেষে খুলতে যাচ্ছে মালিবাগ-মৌচাক-মগবাজার-শান্তিনগর-রাজারবাগ উড়ালসড়ক। এতে করে এ এলাকার দুর্ভোগে হাঁপিয়ে ওঠা যাত্রীরা নিতে শুরু করছেন স্বস্তির নিঃশ্বাস। দেখতে পাচ্ছেন যানজট মুক্ত মালিবাগ-মৌচাক এলাকা। এমনই একজন শান্তিনগরের বাসিন্দা আকবর আলী। তিনি  বলেন, ফ্লাইওভারের কাজ শুরুর পর থেকে মালিবাগ একটি নদী ছিল। কত কষ্টে যে অফিস করেছি এক আল্লাহই ভালো জানেন। তবে সড়কটি উদ্বোধনের কথা শুনে খুবই খুশি লাগছে। ভাবতে পারছি না মালিবাগ এখন যানজটমুক্ত এলাকা। একই রকম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন মৌচাকের বাসিন্দা আবদুল করিম। তিনি প্রতিবেদককে বলেন, রাজধানীর মধ্যে সবচেয়ে নোংরা জায়গা ছিল মালিবাগ-মৌচাক। এবার এ এলাকা সবচেয়ে আনন্দদায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও ফ্লাইওভারটির প্রকল্প পরিচালক সুশান্ত কুমার পাল মানবজমিনকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর ফ্লাইওভারটি উদ্বোধনের তারিখ নির্ধারণ করা হবে। নির্ধারিত তারিখে ফ্লাইওভারটি প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন বলে জানান এই প্রকৌশলী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.