শনিবার, জানুয়ারি ১৬
Shadow

নারীর প্রতি বর্তমান সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি

উন্নয়নশীল বাংলাদেশে নারীর প্রতি নিপীড়ন, নির্যাতন কিংবা সহিংসতা কোনো নতুন বিষয় নয়; বরং যুগ যুগ ধরে ক্রমাগত এ ধরনের অসামাজিকতা, অনৈতিকতা বর্বরোচিতভাবে ঘটে আসছেÑ যা দৈনন্দিন পত্রপত্রিকা আমাদের চোখের সামনে এনে হাজির করে দেয়। নারীর ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন ও সহিংসতার পেছনে প্রধান একটি কারণ হচ্ছে নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি।
নারী নির্যাতন-নিপীড়নের পরিসংখ্যান বলছে, কয়েক বছর ধরে নারী নির্যাতন ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। নারী নিপীড়নের ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সামাজিক মর্যাদাহানির ভয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঘটনার কথা প্রকাশ করে না। আমাদের দেশের মতো রক্ষণশীল কোনো নারী যখন যৌন নিপীড়নের শিকার হন, তখন পুরো সমাজ তার ঘাড়ে দোষের বোঝা চাপিয়ে দেয়। সমাজের মুখোশধারী মানুষগুলো তাকে চরিত্রহীন হিসেবে আখ্যায়িত করে। এমন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নারীর ওপর নিপীড়ন, নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে শুধু তাই নয়; বরং ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
নারীর প্রতি সহিংসতার অন্যতম কারণ তাদের যথাযথ আইনি রক্ষাকবচের অভাব। এক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় ঘুষের বিনিময়ে রাজনৈতিক আর সামাজিক প্রভাব ব্যবহার করে অপরাধী প্রায়ই বিচার প্রক্রিয়াকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসে। ভুক্তভোগী ব্যক্তি ও তার পরিবারের ওপর মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়। এক্ষেত্রে আরও এক পরিচিত কৌশল ঘুষ দিয়ে, প্রভাব ব্যবহার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হাত করা ও তাদের মাধ্যমে ঘটনার শিকার ব্যক্তির ওপর চাপ এবং হুমকি প্রদান করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিচার প্রক্রিয়ায় আরও নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, অনেক সময় মামলা নথিভুক্ত করতে গড়িমসি করে, কখনও কখনও মামলাই নেয় না। এ ধরনের অনেক দৃষ্টান্ত আমরা প্রতিনিয়ত বর্তমান সমাজে লক্ষ করছি।
সমাজে পুরুষ ও নারী উভয়ের নারী সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক বদলই পারে নারীর প্রতি সহিংসতা কমাতে বা চিরতরে বন্ধ করতে। এ এক অমোঘ বাস্তব সত্য। দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন ছাড়া নারী নিপীড়ন বন্ধ হওয়ার নয়। অস্বীকার করার উপায় নেই, এ এক দীর্ঘ প্রক্রিয়া। এর সঙ্গে জড়িত সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন, শিক্ষার প্রসার এবং সামাজিক সংস্কার থেকে উত্তরণের প্রসঙ্গও রয়েছে। আমাদের দেশের মতো কৃষিভিত্তিক সমাজের পরিবারগুলো তাদের জীবিকার প্রয়োজনে কিংবা মা-বাবা তাদের বৃদ্ধ বয়সে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ছেলেসন্তান কামনা করেন। তারা ভাবেন, ছেলেসন্তান কৃষিকাজ কিংবা অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকা-ে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারবে কিংবা বৃদ্ধ বয়সে তাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে। এ মানসিকতার কারণে মেয়েসন্তান উপেক্ষিত হয়। আর সে কারণে মেয়েসন্তানরা ছোটবেলা থেকেই আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে বড় হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে ঘরে-বাইরে কোনো নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস পায় না। নারীর উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে। আর এসবের মোট ফল নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তন না হওয়া।
নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনকে সম্ভব করে তুলতে রাষ্ট্রের নেতৃত্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, গতিশীল আইনি প্রক্রিয়া ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হলে নারী নিপীড়নের ঘটনা অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। সাম্প্রতিককালে এ বিষয়ে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় বেশকিছু উদ্যোগ নিলেও মূলত মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি ও নানা প্রশাসনিক জটিলতায় এগুলোর পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। প্রশাসনিক জটিলতার একটা বড় কারণ প্রশাসন ও বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের প্রকট অভাব। এসবের যোগফলে ঘরে-বাইরে ভয়াবহ সব নিপীড়ন-নির্যাতনের শিকার নারীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি প্রতিনিয়ত পিছিয়ে যাচ্ছে।
সমাজকে এগিয়ে নিতে পুরুষের পাশাপাশি নারীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকতেই হবে এ বার্তা এখন স্বতঃসিদ্ধ। নারী সামাজিক উন্নয়নের সব ক্ষেত্রে অবাধে অংশ নিতে পারবে তখনই, যখন তার ওপর নিপীড়ন ও সহিংসতা বন্ধ হবে। আর সেটা সম্ভব হবে একমাত্র তখনই, যখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমরা প্রত্যেকটি মানুষ নারীর মানবিক অধিকারকে নিজের অধিকার বলে ভাবতে-শিখতে পারব। আর সেখানেই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের শুরু হবে বলে আমি মনে করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.