শুক্রবার, এপ্রিল ২৩
Shadow

পুকুর-জলাশয় সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন

 

বরিশাল নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী থানা পুকুর একসময় স্বচ্ছ পানির উত্স থাকিলেও এখন তাহা ঢাকা পড়িয়াছে কলমিলতা ও কচুরিপানায়। অবহেলা ও অনাদরে ইহা পরিণত হইয়াছে নোংরা দুর্গন্ধময় বর্জ্যে ভরা ভাগাড়ে।  কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ এক বত্সর আগে আবেদন করিয়া লিজ গ্রহণ করিলেও সিটি করপোরেশনের বিধি অনুযায়ী রাজস্ব দিয়া পুকুরটির দেখভাল না করায় এই সংকট তৈরি হইয়াছে বলিয়া জানা যায়। যেহেতু প্রাচীন এই জলাধারটির পানি নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহারসহ ইহা নগরীর পরিবেশ রক্ষা ও সৌন্দর্যবর্ধনে বিশাল ভূমিকা পালন করিতে পারে, তাই ইহার সুরক্ষা একান্ত প্রয়োজন। পুকুরটির মালিক বরিশাল সিটি করপোরেশন। তাই তাহাদেরই এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হইবে।

শুধু উপরোক্ত পুকুরটিই নহে, বরিশালে এই ধরনের আরো অনেক পুকুর, জলাশয় ও দীঘি রহিয়াছে যাহার অবস্থা সংকটাপন্ন। সমপ্রতি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত এক খবর হইতে জানা যায়, দখল-দূষণের কারণে বরিশালে ১৫শত পুকুর আজ বিপন্ন প্রায়। এখানে গত সাত বত্সরে ভরাট হইয়াছে সাড়ে ১৩ হাজার পুকুর। অবশ্য এই সমস্যা শুধু বরিশালেই নহে, রাজধানী ঢাকা ও বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামসহ অন্যান্য নগর-মহানগরেও রহিয়াছে সমানভাবে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দূষণ ও ভরাট-দখলের কারণে নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুরসহ বিভিন্ন জলাধারগুলি হারাইয়া যাইতেছে। এক পরিসংখ্যান হইতে জানা যায়, ১৯৮৫ সালে রাজধানীতে দুই হাজার পুকুর ছিল। ছিল স্রোতস্বিনী ৪৪টি খাল। এখন অনেক পুকুর, খাল, ঝিলের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায়, বাস্তবে নহে। দুই হাজার পুকুরের মধ্যে প্রায় এক হাজার ৯০০টি পুকুরেরই আজ অস্তিত্ব নাই। শুধু শহরের কথা বলি কেন, গ্রাম-গঞ্জেও আজ অনেক পুকুরের অস্তিত্ব চোখে পড়ে না। অথচ এইসব পুকুর ও ডোবানালা সংস্কারের মাধ্যমে কৃষি ও মত্স্য উত্পাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি করা সম্ভব। যখন এইসব জলাশয় টইটম্বুর থাকিত, তখন সেখানে শামুক ও ঝিনুকসহ অনেক প্রাণীর দেখা মিলিত। ইহাতে হাঁস-মুরগির খাবার নিয়া চিন্তা করিতে হইত না। উঠিত শাপলা শালুকের সম্ভার। পুকুরের পানি ইরিগেশন বা সেচের কাজেও ব্যবহূত হইত। একসময় মানুষ বাড়ির নিকটে জমিতে পেঁয়াজ-রসুন-আদা-হলুদ-ডাল, টমেটো প্রভৃতি চাষ করিত। খাল ও ডোবার পানি দিয়াই চলিত সেচের কাজ। এখন পানির অভাবে উত্পাদন খরচ বেশি হইতেছে বলিয়া ঐসব ফসল উত্পাদনও হ্রাস পাইয়াছে। কেহ করিলেও পরিমাণে অনেক কম।

উপরোক্ত প্রাকৃতিক পানির আধার না থাকিবার কারণে সবচাইতে বড় যে ক্ষতি হইতেছে তাহা হইল- তাপমাত্রা বৃদ্ধিসহ ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামিয়া যাইতেছে। ইহাতে বিশুদ্ধ পানির সংকটসহ দেখা দিতেছে পরিবেশ বিপর্যয়। এই প্রেক্ষাপটে সর্বত্রই গভীর নলকূপের পানির পরিবর্তে সারফেস ওয়াটার  বা ভূ-উপরিভাগের পানির চাহিদা বাড়িতেছে। তাই শহর কিংবা গ্রাম সকল স্থানের পুকুর- জলাশয়গুলির গভীরতা বৃদ্ধিতে মালিকদের নানাভাবে উত্সাহ দিতে হইবে। সরকারি খাল-পুকুরগুলি সংস্কারে নিতে হইবে ব্যাপক উদ্যোগ। সরকার নদ-নদী ড্রেজিংয়ের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করিয়াছে। সেই অনুযায়ী সারাদেশে কাজও চলিতেছে। এখন পুকুর-ডোবাগুলিরও সংস্কারের প্রতি নজর দিতে হইবে। গ্রামের অনেক পুকুর-ডোবায় এখন আর পাড় নাই। তাই এইসব পুকুর-দীঘি পাড়ে ঘন বনায়ন করিতে হইবে। মোটকথা, মানব জাতির স্বার্থে প্রকৃতিকে বাঁচাইয়া রাখিতেই খাল-বিল-পুকুর-ডোবা ও দীঘি-নালা রক্ষা করিতে হইবে। ইহার মাধ্যমে কৃষি ও মত্স্য উত্পাদন বৃদ্ধিসহ সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হইবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.