বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৮
Shadow

সংসদ ভেঙে সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবি বিএনপির

প্রাইম ডেস্ক :

সংসদ ভেঙে সহায়ক সরকার চায় বিএনপি। গতকাল রবিবার ইসি’র সংলাপে অংশ নিয়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে ‘সহায়ক সরকার’ এর অধীনে ভোটের প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। ভোটের সময় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েন, ২০০৮ সালের আগের সংসদীয় আসন সীমানা ফিরিয়ে আনা, ইভিএম চালু না করাসহ ২০ দফা প্রস্তাবও দিয়েছে দলটি।

সকালে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের নেতৃত্বে ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সংলাপে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। জরুরি অবস্থার সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত দলীয় চেয়ারপারসনসহ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহারের দাবিও রয়েছে দলটির।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে সকাল ১১টায় আগারগাঁও    নির্বাচন ভবনে এ সংলাপ শুরু হয়। তবে সংলাপ শুরুর আগে সিইসি বিএনপির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।

প্রায় তিন ঘণ্টা সংলাপ শেষে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের খুব বেশি কিছু করার নেই। তারপরও এই সংলাপের পর বিএনপি কিছুটা আশাবাদী তো বটেই।

তিনি বলেন, সংলাপে আমাদের ২০ দফা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনও তাদের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছে। তবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ আয়োজন ও সহায়ক সরকারের যে দাবির কথা তাদের বলেছি, সেই ব্যাপারে কমিশন তাদের ক্ষমতার মধ্য থেকে কিছু করার চেষ্টা করবে বলে আমাদের জানিয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করতে চায়, নির্বাচন কমিশনের এই সংলাপ বা রোডম্যাপ বা পথ নকশা নিছক কালক্ষেপণ বা লোক দেখানো কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে না। এই সংলাপ যেন প্রহসনে পরিণত না হয়, তা কমিশনকেই নিশ্চিত করতে হবে।

সংলাপ শেষে কিছুটা আশাবাদী বিএনপি

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি মহাসচিব বলেন, বর্তমান যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারের যে একটা প্রচণ্ড রকমের অগণতান্ত্রিক আচরণ, সেখানে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে বলে তো আমরা মনে করি না। এর মধ্যেও আশার যাত্রাটা শুরু হলো বলে মনে করেন কি না-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, কিছুটা তো বটেই, আমরা কিছুটা আশাবাদী তো বটেই।

ইসি মনে করে গণতন্ত্রের আসল রূপ নেই

নির্বাচন কমিশন থেকে কী আশা নিয়ে ফিরছেন বা কী উপলব্ধি হয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা দুই ঘণ্টা ৩৫ মিনিট আলাপ করেছি। তিনি দাবি করেন, শেষের দিকে তারা (ইসি) বলেছেন – তাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। কমিশন এও মনে করে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা তাদের দায়িত্ব পুরোপুরিভাবে পালন করতে পারছে না। গণতন্ত্রের আসল রূপও বাংলাদেশে নেই। তারা বিএনপির প্রতিনিধি দলকে জানিয়েছেন,‘তারা চেষ্টা করবেন। নিজেদের মধ্যে বসবেন, বসে দেখবেন, তারা কী করতে পারেন।

তিনি আরো বলেন, আগামীতে দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, নিরপেক্ষ ও সকল দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনের আন্তরিকতা, দক্ষতা ও নির্ভীক পদক্ষেপ সমগ্র জাতি প্রত্যাশা করে। তিনি বলেন, জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করার জন্যে বিএনপি ইসিকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করতে চায়। এজন্য ইসিকে মাঝে মাঝে গঠনমূলক সুপারিশ ও পরামর্শ প্রদান করার আহ্বান জানান তিনি।

ইসিতে বিএনপি যেসব  প্রস্তাব

সংলাপে বিএনপি ২০ দফা দাবি তুলে ধরেছে। এগুলো হলো- নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে এবং  ভোটের আগেই বর্তমান সংসদ ভেঙে দিতে হবে। ১/১১ সরকার কর্তৃক বিএনপির চেয়ারপারসনসহ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মামলা প্রত্যাহারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে পাশাপাশি বর্তমানে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

গ্রেফতারকৃত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে মুক্তি দিতে হবে, গুম-খুন-হয়রানি বন্ধ করতে হবে। এখন থেকে সকল রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশসহ সকল স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরকারের কার্যকর সংলাপের উদ্যোগ নির্বাচন কমিশনকেই গ্রহণ করতে হবে। ইভিএম বা ডিভিএমে ভোট গ্রহণ করা যাবে না। প্রতিরক্ষা বাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচনের অন্তত সাত দিন আগে থেকে মোতায়েন করতে হবে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সজ্ঞায় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ২০০৮ সালের পূর্বের সংসদীয় আসনের সীমানা বহাল রাখতে হবে। প্রশাসনকে দলীয় প্রভাব মুক্ত করতে হবে এবং চুক্তিভিক্তিক নিয়োগ বাতিল করতে হবে, নির্বাচনের ৬ মাস পূর্বে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি বাতিল করে স্থানীয় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে, নির্বাচনের পূর্ব সময়ের শুরুতেই সকল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং পুলিশের সকল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার/পরিবর্তন করতে হবে।

নির্বাচনের পূর্ববর্তী ৯০ দিন থেকে ফলাফল গেজেট প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত সময়কালকে ‘নির্বাচনের পূর্ব সময়’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে সংশ্লিষ্ট বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সিইসি এককভাবে সিদ্ধান্ত নিলে হবে না, পুরো ইসি বসে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নির্বাচনে আচরণ বিধি প্রতিপালনে ইসির নিজস্ব প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল ক্ষমতা অর্পণ করতে হবে, নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ দিতে হবে।

ব্যালট পেপারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্সের নম্বর সংবলিত চালানপত্রের ফটোকপি প্রার্থী বা প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্টকে প্রদান করা। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার তালিকাভুক্ত করা, ভোটার যোগ্য কারাবন্দীদের ভোটার তালিকাভুক্তি করা এবং মৃত ব্যক্তিদের ভোটার তালিকা হতে বাদ দেয়া, ভোট কেন্ন্দ্র নির্ধারণ ও ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগে স্বচ্ছ থাকা, ‘অন লাইনে’ মনোনয়নপত্র দাখিলের বিধান প্রবর্তন, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জামানত হিসেবে ‘নগদ বা ক্যাশ’ অর্থ জমাদানের বিধান বাতিল করা, ভোট গ্রহণ শেষে সকল পোলিং এজেন্টের উপস্থিতিতে ভোট গণনা করা, প্রিজাইডিং অফিসার কর্তৃক ভোট গণনার স্বাক্ষরিত বিবরণী উপস্থিত প্রত্যেক এজেন্টকে প্রদান না করে ভোট কেন্দ্র ত্যাগ না করা, ভোট গ্রহণের দিনই কেন্দ্র ভিত্তিক প্রাপ্ত ফলাফল একত্রীকরণ করে প্রার্থীদের কিংবা তাদের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রির্টানিং অফিসার কর্তৃক বেসরকারিভাবে ফলাফল ঘোষণা নিশ্চিত করা। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিজয়ী প্রার্থীদের গ্রেজেট প্রকাশ করা। তফসিল ঘোষণার পর সকল রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর সভা-সমাবেশ-পথসভার অনুমতি দেয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসারের কাছে ন্যস্ত করা, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশন সংসদের মেয়াদ পূর্তির পূর্ববর্তী ১২ মাসের মধ্যে কোনা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা দরখাস্ত আহ্বান করতে পারবে না। ছবিসহ যে ভোটার তালিকা ভোটকেন্দ্রে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের কাছে থাকে, ছবিসহ অভিন্ন ভোটার তালিকা ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অথবা তার নির্বাচনী এজেন্টদের সরবারহ করা, দল বা প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণে সহায়তা ও নিরাপত্তা প্রদান, ভোট কেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নৈর্ব্যক্তিকভাবে মোতায়েনের জন্য রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে মহানগর ও জেলায় একটি করে কমিটি গঠন করা, দেশীয় পর্যবেক্ষক ও পর্যবেক্ষণ সংস্থা নিবন্ধন ও মনোনয়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা,  অধিক সংখ্যক বিদেশি পর্যবেক্ষকদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে উত্সাহিত করা। বন্ধ ঘোষিত গণমাধ্যম চালু করা, গণমাধ্যমে সকল দল ও প্রার্থীর প্রচারণায় সমতাভিত্তিক সুযোগ প্রদান, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, আইসিটি অ্যাক্ট এর বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল করা, নির্বাচনের দিন মোবাইলম ফোন নেটওয়ার্ক চালু রাখা, মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইন্টারসেপ্ট করতে পারে এমন সংস্থাগুলো হতে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের সরিয়ে সেখানে নিরপেক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের পদায়ন করা, প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, নির্বাচনে কালো টাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধে  কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা ইত্যাদি।

প্রতিনিধিদলে যারা ছিলেন

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নেতৃত্বে সংলাপে অংশ নেন- স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, এম তরিকুল ইসলাম, লে.জে.(অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিঞা, মীর্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য এ এস এম আবদুল হালিম, ইসমাঈল জবি উল্লাহ, আব্দুর রশীদ সরকার, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ।

উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশনের ধারাবাহিক সংলাপে এ পর্যন্ত বিএনপিসহ ৩৩টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ হয়েছে। আগামী বুধবার আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপ করবে ইসি। বৃহস্পতিবার শেষ হবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.