বর্ষায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি না করলেই নয়?

বিপুল জনসংখ্যার পদভারে মুখর মহানগরী ঢাকায় দীর্ঘকাল ধরে চলছে অপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন। আর এ উন্নয়নের প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত চলে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি

প্রতি বছর শুকনো মৌসুমের শেষের দিকে শুরু হয় বেশিরভাগ সংরক্ষণ ও মেরামতের কাজ। এ সময় বয়ে যাওয়া দমকা বাতাসে রাস্তার ধুলাবালিতে ঢাকার আকাশ অন্ধকার হয়ে যায়। অন্যদিকে উন্নয়ন কাজ শেষ হওয়ার আগেই এসে পড়ে বর্ষাকাল। তখন কাদা আর বৃষ্টির পানিতে রাস্তাঘাট ডুবে রাজধানীতে বসবাসকারী মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। জনবহুল এলাকার বহুতল বাড়িঘরে, এপারর্টমেন্টে বসবাসকারী অসংখ্য মানুষের গাড়ি রাস্তায় বেরুতে পারে না। অটোরিকশা বা পায়েটানা রিকশায় করে কোথাও বেরুতে অনেক পথ হেঁটে যেতে হয়। এখানেও সিউয়ারেজ নির্মাণকাজ চলায় সরু রাস্তার প্রায় অর্ধাংশ কেটে মোটা ব্যাসের সিউয়ার ফেলে রাখা হয়। ঘর থেকে রাস্তায় পা ফেলাও যেন দুষ্কর হয়ে পড়ে। কখনও সিউয়ার লাইনের এক মুখে বিশাল গর্ত করে নির্মাণকাজের স্বার্থে পুরো পানিপ্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ায় বসতবাড়ির সব ময়লা-মিশ্রিত পানিতে রাস্তা ডুবে যায়। গন্ধে ঘরে টেকাও মুশকিল। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বর্ষার বাড়তি পানি। এক দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যে কালাতিপাত করতে হয় রাজধানীতে বসবাসকারী বিশাল জনগোষ্ঠীকে। রাস্তার কাজ শেষে দীর্ঘ সময় খাদ বন্ধ না করে ফেলে রাখাও যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেবামূলক সংস্থাগুলোর দায়িত্বে অবহেলা এবং তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা লক্ষ করা যায়। এরই মধ্যে রাজধানীতে বেশ ক’দিন বৃষ্টি হয়ে গেছে। চলছে পুরো বর্ষাকাল। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। রাস্তার মেরামত ও ড্রেনেজ নির্মাণের কাজও এগিয়ে চলছে। মেরামত কাজের জন্য সেবামূলক সংস্থাগুলোর রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি নগরীর যানবাহন চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করবে। জলাবদ্ধতাকে করে তুলবে আরও প্রকট। জনসাধারণের ভোগান্তিরও শেষ থাকবে না।
বিপুল জনসংখ্যার পদভারে মুখর মহানগরী ঢাকায় দীর্ঘকাল ধরে চলছে অপরিকল্পিত নগর উন্নয়ন। আর এ উন্নয়নের প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত চলে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি। রাস্তা মেরামত ও সম্প্রসারণ ছাড়াও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে, সুউচ্চ ভবন, হাউজিং ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি চলে অবিরাম। রাস্তার ওপর নির্মাণসামগ্রীর স্তূপ করে রাখার দৃশ্যও অতি পুরোনো এ শহরে। তাছাড়া ওয়াসা, তিতাস গ্যাস, পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের সংস্কার ও মেরামত কাজে লাগাতার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি জনজীবনে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। ওয়াসার পানি ও সিউয়ারেজ লাইন, তিতাসের গ্যাসলাইন, পিডিসি ও বিটিসিএলের নতুন ক্যাবল লাইন বসানো বা মেরামতের কর্মযজ্ঞ কমবেশি আছে প্রায় বছরজুড়ে। এতসব কাজ পরিচালনার জন্য মহানগরীর বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে রাস্তার বিরাট অংশ কেটে ফেলা হয়। কোথাও ক্রসড্রেনেজ সিস্টেমের জন্য দীর্ঘ সময় রাস্তা সম্পূর্ণ বা আংশিক বন্ধ করে চলে বক্সকালভার্ট নির্মাণ। ফলে জনগণের ভোগান্তির অন্ত থাকে না। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ আজ রাজধানীমুখী। মফস্বল শহরে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুব্যবস্থা অপ্রতুল। সন্তানের জন্য ভালো লেখাপড়ার সুযোগ করে দিতে এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পেতে উচ্চমধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্তরাও রাজধানী ঢাকায় বসবাসের সুযোগ করে নেন। নিম্নবিত্তের মানুষও জীবন-জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে ছুটে আসছেন ঢাকায়। গ্রামগঞ্জ, ছোট্ট শহরে তেমন কোনো কাজকর্ম নেই। দেশজুড়ে বাড়তি জনসংখ্যার চাপে চাষযোগ্য জমি কমে গেছে, কৃষক হয়েছে কর্মহীন। নদনদী শুকিয়ে গেছে। পানিদূষণের কারণে অবশিষ্ট জলাধারও আজ মাছশূন্য। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জেলে সম্প্রদায় আজ বেকার। নদীভাঙন এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবিকার অন্বেষণে গ্রামের পৈতৃক ভিটামাটি ছেড়ে ঠাঁই করে নেওয়ার একমাত্র ভরসাস্থল রাজধানী ঢাকা শহর। রুটি-রুজির জন্য রিকশা, ভ্যান চালানো বা কিছু ফেরি করার পথ খুঁজে নেওয়া সম্ভব। তাই ছিন্নমূল মানুষের ভিড়ে রাজধানী ঢাকা আজ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর। রাস্তার পাশে তাদের মানবেতর জীবনযাপন। নিত্যনতুন বাড়তি মানুষের চাহিদা সামাল দিতে ঢাকায় অবিরাম গড়ে উঠছে বৈধ-অবৈধ স্থাপনা, বাজারঘাট। দিন দিন বাড়ছে যানবাহনের সংখ্যা। কিন্তু রাস্তাঘাটের পরিধি তেমনটা বাড়ছে না। রাস্তা চলে যাচ্ছে হকারদের দখলে। জীবন-জীবিকার তাগিদে ফুটপাতে বসছে পণ্যের পসরা। দিন দিন যানজট নিচ্ছে এক ভয়াবহ রূপ। জনসংখ্যার ভারে আর পরিবেশ দূষণে নগরবাসীর জীবন দুর্বিষহ। 
নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও ঢাকার মতো ঘিঞ্জি জনবহুল শহরে ফ্লাইওভারের মতো বড় বড় প্রকল্প নির্মাণে সরকারের সফলতা রয়েছে। নতুন কিছু গড়তে পুরোনোকে ভেঙে ফেলাও খুবই স্বাভাবিক। যে কোনো নগরীর সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা একটি চলমান প্রক্রিয়া। উন্নয়ন কর্মকা-ে রাস্তা খোঁড়ার প্রয়োজন রয়েছে। তবে তা হতে হবে পরিকল্পিতভাবে। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে জনগণ ত্যাগ স্বীকার করতে সর্বদা প্রস্তুত। কিন্তু তা করতে গিয়ে নগরবাসীকে যেন চরম মূল্য দিতে না হয়, সেই দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। এর আগে ওয়ানস্টপ সেলের সভায় ডিডিসি সরকারি ও বেসরকারি ৩৪টি প্রতিষ্ঠানকে রাজধানীর বিভিন্ন অংশে সেবামূলক সংস্থার কাজ পরিচালনার জন্য রাস্তা খোঁড়ার অনুমতি দেওয়া হয় এবং খোঁড়াখুঁড়ি যথাসময়ে শেষ করে রাস্তা যথাশিগগির মেরামতের ব্যাপারে ডিডিসির শর্ত রয়েছে। কাজেই শর্ত যথাযথভাবে পূরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কড়া নজরদারি থাকা প্রয়োজন। আর যাতে সঠিক সময়ে দক্ষতার সঙ্গে উন্নয়ন ও মেরামত কাজ শেষ হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়া আবশ্যক। এ ব্যাপারে সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতার মনোভাব থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ডিডিসিকে বিশেষ তৎপরতার সঙ্গে নিতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা। সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে সর্বাত্মক সহযোগিতাদানে জনসাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে। অপরিকল্পিত এবং দীর্য়মেয়াদি রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির দুঃসহ ভোগান্তি থেকে রাজধানীবাসীকে মুক্তি দিতে সেবা প্রদানের কাজে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়সাধন বিশেষ জরুরি। রাস্তা খুঁড়ে উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালনার জন্য বৃষ্টির সময়কে যতদূর সম্ভব এড়িয়ে বছরের শুকনা মৌসুমে শেষ করার ব্যবস্থা নেওয়া হলে জনদুর্ভোগ অনেকাংশে লাঘব হতে পারে। 
ডিসিসির খনন নীতিমালা অনুযায়ী, রাস্তা খোঁড়ার পর ২৮ দিনের মধ্যে রাস্তা পুনর্নির্মাণ করার বিধান রয়েছে। উন্নয়নমূলক কাজ শেষ করে রাস্তার খানাখন্দ যথারীতি ভরাট করা জরুরি। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির ক্ষেত্রে প্রচলিত নীতিমালার সঠিকভাবে বাস্তবায়নে ডিসিসি, ওয়াসা, পিডিপি, বিটিসিএলের মতো সংস্থাকে নিতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা। জুন মাসে অর্থবছর শেষ হয়। রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থার উন্নয়নমূলক কাজ, মেরামত আর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরের বরাদ্দকৃত অর্থ জুনের আগেই শেষ করার প্রতিযোগিতা লেগে যায়। তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করাতে চায় সব প্রতিষ্ঠান। চলে বিভিন্ন সংস্থার অপরিকল্পিত রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির ধুম। তাতে যেমন বাড়ে জনদুর্ভোগ, তেমনি কাজের মানও হয় খারাপ। আগামী দিনে রাজধানীর উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়সাধন করে মহানগরীর উন্নয়নমূলক কাজগুলোকে এগিয়ে নিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। তাহলে নগরজীবনের দুর্ভোগ হ্রাস পাবে, জনমনে ফিরে আসবে স্বস্তি।