শুক্রবার, মে ৭
Shadow

প্রধান বিচারপতির দুর্নীতি

ছুটিপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পরদিনই তার বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, আর্থিক অনিয়মসহ বিদেশে অর্থ পাচার এবং নৈতিক স্খলনসহ ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে খোদ তার কর্মস্থল সুপ্রীমকোর্ট থেকে। এখানে উল্লেখ করা আবশ্যক যে, গত শুক্রবার রাতে বিদেশে রওনা হওয়ার প্রাক্কালে নাটকীয় কায়দায় গাড়ি থেকে নেমে প্রধান বিচারপতি উপস্থিত সংবাদকর্মীদের বলেন যে, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। কয়েকটি দেশ সফর শেষে তিনি যথাসময়ে ফিরে আসবেন এবং প্রধান বিচারপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। এ সময় তিনি একটি স্বাক্ষরিত লিখিত বিবৃতিও তুলে দেন সাংবাদিকদের হাতে। একজন প্রধান বিচারপতি আদৌ এটি পারেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন মহলে। ইতোপূর্বে রাষ্ট্রপতিকে লেখা ছুটির আবেদনপত্রে তিনি নিজেকে অসুস্থ বলে দাবি করেছিলেন। রাষ্ট্রের একটি দায়িত্বশীল পদে থেকে একই ব্যক্তির সাতদিন আগে-পরে ‘সুস্থতা’ ও ‘অসুস্থতা’ বিষয়কে দ্বিচারিতায় বিস্মিত হতে হয় বৈকি। এর বাইরেও লিখিত বিবৃতিতে তিনি সুপ্রীমকোর্টের কার্যপরিধি এবং ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে ক্ষমতাসীনদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কিছু বক্তব্য তুলে ধরেন, যা প্রকারান্তরে ধান ভানতে শিবের গীত গাইছেন বলেই প্রতীয়মান হতে পারে। অনেকটা এই প্রেক্ষাপটেই চলে আসে সুপ্রীমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল স্বাক্ষরিত বিবৃতিটি। সেখানে বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও নৈতিক স্খলনসহ ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের নথি আপীল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির কাছে হস্তান্তর করেন রাষ্ট্রপতি। অতঃপর তারা প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বিচারালয়ে বসে বিচারকাজ পরিচালনা করতে অসম্মতি জানান। তখন প্রধান বিচারপতি পদত্যাগের কথা জানিয়ে দেন সহকর্মীদের। এর পরই তাদের কিছু না জানিয়ে অসুস্থতাজনিত ছুটির দরখাস্ত করেন রাষ্ট্রপতি বরাবর। এ নিয়ে নানা নাটকীয়তা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে। সুপ্রীমকোর্ট প্রদত্ত বিবৃতির পর এ সম্পর্কিত সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান হতে পারে।

এখন যে প্রশ্নটি অনিবার্য সামনে চলে আসে তা হলো দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও নৈতিক স্খলনের দায় মাথায় নিয়ে একজন প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব পালনে স্বপদে ফিরতে পারেন কি না! এ্যাটর্নি জেনারেল বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন ‘সুদূরপরাহত’ বলে। অন্যদিকে, আইনমন্ত্রী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে তার প্রায় সবই এ্যান্টি করাপশন কমিশনের আওতায়। রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমতা বলে দুর্নীতি দমন কমিশন এর তদন্ত করবে। অনুসন্ধানে সত্যতা পাওয়া গেলে মামলাসহ কি ব্যবস্থা নেয়া যায় তা আইন অনুসরণ করেই করা হবে। এর পাশাপাশি তিনি এও বলেছেন যে, প্রধান বিচারপতি একটি প্রতিষ্ঠান ও সাংবিধানিক পদ। ফলে এক্ষেত্রে তাড়াহুড়া বা খামখেয়ালি করা সমীচীন হবে না।

তদন্তাধীন কোন বিষয়ে মন্তব্য করা বাঞ্ছনীয় নয়। তবে এটা তো সত্যি যে, সর্বস্তরের মানুষের শেষ ভরসাস্থল হলো আদালত। মানুষ ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় দ্বারস্থ হয়ে থাকে আদালতের। সে ক্ষেত্রে আর্থিক দুর্নীতি, অর্থ পাচার, এমনকি নৈতিক স্খলনও একজন বিচারকের কাছে কাম্য নয়, প্রধান বিচারপতির ক্ষেত্রে তো নয়ই। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, বর্তমান প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার ক্ষেত্রে সেটাই ঘটতে চলেছে। এর বাইরেও প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন সময় তিনি নানা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যা আইনজীবীদের মনে ক্ষোভ-বিক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা এবং মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়ের প্রাক্কালে কুখ্যাত সাকা চৌধুরীর স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতদান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বিস্তর, যা তিনি নিজেও প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছেন। যা হোক, প্রধান বিচারপতি সাময়িকভাবে যাচ্ছেন এবং ফিরে এসে দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন বলে দেশ ত্যাগ করেছেন। আমরা তার কথায় আস্থা রাখতে চাই। আশা করি তিনি ‘সুস্থ’ হয়ে অচিরেই দেশে ফিরে আসবেন এবং তার বিরুদ্ধে আনীত তদন্তাধীন বিষয়গুলো মোকাবেলা করবেন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষাসহ দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখার স্বার্থে সেটাই প্রত্যাশিত। ততদিন পর্যন্ত বিষয়টির অহেতুক রাজনীতিকরণসহ আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচী কাম্য নয়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.