ফিটনেসবিহীন গাড়ি

সংখ্যাটি রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। রাজধানীসহ সারাদেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত হলেও ফিটনেস নবায়ন না করা গাড়ির সংখ্যা চার লাখ ৭৯ হাজার ৩২০টি। গত ২৪ জুন হাইকোর্টের এক নির্দেশের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার আদালতে লিখিত এক প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান দাখিল করে বিআরটিএর আইনজীবী। মনে রাখতে হবে যে, এর বাইরেও রয়েছে লাইসেন্সবিহীন অথবা ভুয়া বা জাল কাগজপত্রের যানবাহন। মাঝে-মধ্যে ঢাকা ও অন্যত্র বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে যানবাহন পরীক্ষা করে ফিটনেসবিহীন গাড়ি শনাক্তকরণসহ যানবাহন জব্দ, মামলা দায়েরসহ জেল জরিমানা ইত্যাদি করে না তা নয়। তবে যানবাহনের সংখ্যার তুলনায় এর পরিমাণ নগণ্য বলা চলে। অতঃপর হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে ফিটনেস নবায়নে দুমাসের মধ্যে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে বিআরটিএকে। তবে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত বিআরটিএর সেই সক্ষমতা আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বিস্তর।

মনে রাখতে হবে যে, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ ফিটনেসবিহীন যানবাহন। সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, ক্ষয়ক্ষতি রোধসহ মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করার তোড়জোড় চলছে। দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জাতীয় কমিটিও যেমন করা হয়েছে, তেমনি শতাধিক সিদ্ধান্তও হয়েছে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা রোধে। এটা তো সত্য যে, কোন একক কারণে দুর্ঘটনা ঘটে না। পরিবহন খাতে যুগ যুগ ধরে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। সড়কে চলমান নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন হয়েছে। স্কুলের কচি শিক্ষার্থীরাও সহপাঠীদের মৃত্যুর প্রতিবাদে নেমে এসেছিল রাজপথে। চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল নৈরাজ্য কতদূর বিস্তৃত হয়েছে পরিবহন খাতে। নৈরাজ্য দূরীকরণে আইন আছে। কিন্তু সে আইন যেন ‘কাজীর গরু কেতাবে’ থাকার মতো। গাড়ি চালক, যাত্রী, পথচারী ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও মালিকদের বেপরোয়া মনোভাবে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোকে যেন মৃত্যু উপত্যাকায় পরিণত করেছে। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ২৮ গুণ বেশি। প্রতিবছর আট হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারান সড়ক দুর্ঘটনায়। আহত ও পঙ্গুতে পরিণত হন অর্ধলক্ষাধিক। একটি দুর্ঘটনা মানে একটি পরিবারকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়া। পঙ্গুত্বের অভিশাপে যারা ভোগে তারা পায় না ক্ষতিপূরণ। যানবাহন মালিকরা রাস্তায় চলাচলের অনুপযুক্ত যানবাহনকে রং-চং মাখিয়ে নতুনের আবরণ দিয়ে রাস্তায় নামায়, আর চালকদের আনাড়িপনায় প্রাণ যায় যাত্রীদের। এদেশে যানবাহন চালানোর জন্য প্রশিক্ষণ নয়, উৎকোচই প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। যেনতেন প্রকারে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পেয়ে যায়। দেশের মহাসড়কগুলোতে হাটবাজার বসানোর মতো কা-জ্ঞানহীন কায়কারবার দুর্ঘটনার সহায়ক হয়ে আছে অনেকদিন ধরে। জাতীয় মহাসড়কগুলোতে ১৫৪টি ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান রয়েছে। বেশকিছু স্থানে নিরাপত্তা চিহ্ন ফলক বসানো হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যথাযথ মান বজায় রাখা হয়নি। রেলক্রসিংগুলো প্রায় অরক্ষিত। সড়কচিহ্ন ও মার্কিংসহ নানা ত্রুটি সর্বত্র। ১৮১ কোটি ২ লাখ টাকা ব্যয়ে জাতীয় মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানগুলোয় সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। মহাসড়কে গাড়ির সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার করার সিদ্ধান্ত ফাইলবন্দী রয়েছে। ফলে দুর্ঘটনা বাড়ছেই। সড়ক-মহাসড়কে ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান, নসিমন, করিমন, লেগুনা চলছে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে। সকল নৈরাজ্য, অব্যবস্থা, অনিয়মতান্ত্রিকতা দূর করে পরিবহন খাতকে ফিরিয়ে আনতে হবে সুশৃঙ্খল অবস্থায়। সড়ক-মহাসড়ক থেকে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন ভুয়া চালক অপসারণ করে বিআরটিএকে রাখতে হবে সাফল্যের স্বাক্ষর।