আরবের খেজুরে রাঙাবে কৃষি অর্থনীতি

আ. আজিজ :
গাজীপুর সদর উপজেলার পিরুজালী গ্রামের বীরমুক্তিযোদ্ধা জিল্লুর রহমানের ছেলে নজরুল ইসলাম বাদল ছোটকাল থেকেই সৌখিন এক যুবক। বিভিন্ন সময় নানা ধরনের সৃজনশীল প্রশ্ন ঘুরপাক খেত তার মনে,এমনই একটি প্রশ্ন ছিল আমদানী নির্ভর খেজুরের চাষ কি দেশে সম্ভব চাষ সম্ভব? এ প্রশ্নের যখন কোন উত্তর পাচ্ছিলেন না তখন দ্বারস্থ হন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যর্মে সেখানেই পরিচয় হয় থাইল্যান্ডের যুবক আনুসা কলনির সাথে। তার পরামর্শে ২০১৪ সালে সৌদি, কুয়েত,দুবাই,ওমান ও থাইল্যান্ড থেকে বিভিন্ন বন্ধুদের সহায়তায় ১৮ টি খেজুরের চারা এনে বাগান তৈরী করেন। আর সেখানেই অর্জিত সব মেধা, শ্রম ও অর্থ বিনোয়োগ করেন। তার এই সিদ্ধান্ত যে বৃথা যায়নি এর প্রমান পাওয়া শুরু হয় ২০১৭ সাল থেকেই। আর এখন তো রীতিমত আয়ের অন্যতম উৎস তার এই খেজুর বাগান। কখনও আয় আসছে খেজুর বিক্রি করে , আবার কখনওবা এর চারা বিক্রি হতে। নিজে খেজুর চাষে সফল হওয়ায় এখন এই খেজুর চাষ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে কাজ করছেন তিনি। তার মতে খেজুর চাষ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারলে বিদেশ থেকে খেজুর আমদানীর পরিমান কমতে থাকবে।
নজরুল ইসলাম বাদলের মতে, বাংলাদেশে খেজুরের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। এই চাহিদা ও বাজার ধরতে পারলে কৃষি অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে এই আশায় তিনি মনেপ্রানে খেজুর চাষ শুরু করেন। খেজুর চাষে তার তেমন অভিজ্ঞতা না থাকায় তাকে থাইল্যান্ডের যুবক এই চাষ বিষয়ে নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেন। প্রথমে ২০১৪ সালে ১৮টি চারা দিয়ে বাগান গড়ে তুললে ৩ বছর পর ২০১৭ সালে তার বাগানে একটি গাছে খেজুর দেখা যায়। ২০১৮ সালে তার বাগান থেকে পাওয়া যায় ৩০০ কেজি খের্জু। চলতি বছরেও তার বাগানে গাছে গাছে ধরেছে থোকায় থোকায় খেজুর। নিজের বাগানে খেজুরের ফলন পাওয়ায় এই চাষ দেশব্যাপী সম্প্রসারনের উদ্যোগ নেন তিনি। তার বাগানের বিভিন্ন গাছ থেকে কলমের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন চারা। এই চারা বিক্রি হতেও তার আয় কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে গত কয়েকবছরেই। বর্তমানে তার সাড়ে সাত বিঘার বাগানে রয়েছে ফলযোগ্য ১০২টি গাছ।
তিনি আরো জানান, আমাদের দেশে যে খেজুর আমদানী করা হয় তার সিংহভাগই নি¤œমানের। এসব খেজুরের পুষ্টিমানও তেমন থাকে না। তবে দেশে উৎপাদিত খেজুরগুলো উন্নতমানের। এ পর্যন্ত গত কয়েকবছরেই সারাদেশে ৫১৭টি স্থানে খেজুরের চারা সরবরাহ করেছেন। যেহেতু খেজুর চাষের বিষয়ে দেশের মানুষের নানা সীমাবদ্ধতা থাকায় কৃষকদের নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে তার বাগানেই হাতে কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ করে দেন তিনি। আবার অনেক খেজুর চাষীদের আগ্রহের উপর নির্ভর করে নিজের তদারকিতেই বাগান তৈরী করে দেন। বর্তমানে তার বাগানে আজুয়া, মরিয়ম,বারহী ও বীজবিহীন সহ ১৬ প্রজাতির খেজুর গাছ রয়েছে। খেজুর মুরুঅঞ্চলের সুস্বাদু ফল হলেও আমাদের দেশে উৎপাদিত খেজুরের স্বাদও অতুলনীয়। তবে এ খেজুর চাষে একটি প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। খেজুর গাছে পরিপক্ক হওয়ার পর তা পাকতে ৪৫ ডিগ্রির উপরে তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়, যা আমাদের দেশে নেই। তার মতে এখন থেকে খেজুর চাষ দেশের সবজায়গায় সম্প্রসারন করতে পারলে আগামী ১০ বছর পর দেশের উৎপাদিত খেজুর দেশেই চাহিদা পূরণ করবে।
খেজুর চাষ সম্ভাবনাময় একটি অর্থকরী ফসল জানিয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড.মাহবুব জানান, আমদানী নির্ভর এই খেজুর চাষ সম্প্র্রসারন করতে পারলে দেশীয় কৃষি অর্থনীতি স্বয়ং সম্পূর্ন হয়ে উঠবে।আবার আমদানী নির্ভরতাও কমতে থাকবে। নানা কারনে দেশীয় আবহাওয়ায় খেজুর চাষ খুবই সম্ভাবনা জাগাচ্ছে। দেশীয় আবহাওয়ায় খেজুর চাষের সুবিদা অসুবিদা খুঁজতে খেজুর চাষ নিয়ে বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই গবেষনার কাজ শুরু করেছেন। এখনও এর ফল পাওয়া যায়নি।
গাজীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারন বিভাগের উপপরিচালক মাহবুব আলম জানান,আমরা বিভিন্ন সময় কৃষক নজরুল ইসলাম বাদলের খেজুর বাগান পরিদর্শন করে তাকে নানা ধরনের পরামর্শের মাধ্যমে সহযোগিতা করে আসছি। দেশীয় আবহাওয়ায় তার বাগানে মুরুর ফল খেজুরের ফলনে আশার সঞ্চার তৈরী হয়েছে। এই চাষ দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিলে কৃষি অর্থনীতি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠবে।