হাওয়া হয়ে যাচ্ছে হাওয়া বেগমের সরকারী সহায়তার চাল!

আ.আজিজ :

গাজীপুরের শ্রীপুরের অজপাড়াগাঁ বদনীভাঙ্গা, এ গ্রামেরই এক হতদরিদ্র পরিবারের হাওয়া বেগম (৫৬), স্বামীকে হারিয়েছেন ১৬ বছর আগে। সে সময় থেকেই একমাত্র সন্তান ফাইজুলকে নিয়েই তার অভাবের সংসার।হাওয়া বেগমদের নিজেদের সহায় সম্পত্তি বলে কিছু নেই তাই মাথা গোজার জন্য তাই ঠাঁই নিয়েছেন সরকারের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাশেই। প্রায় ২০ বছর আগে হাওয়া বেগমের স্বামী আলাউদ্দিন সেখানেই কোনমতে একটি মাটির দেয়ালের ঘেরা দিয়ে ওপরে টিনের ছাউনি দিয়ে পরিবারটির রাতের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

হাওয়া বেগম নিজে জীবিকার তাগিদে বেছে নিয়েছেন অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ, আর একমাত্র সন্তান ফাইজুল ভ্যানগাড়ী চালিয়ে ন্ত্রী সন্তান নিয়ে কোনমতে সংসারের ঘানি টেনে চলছেন।

সময়ের পরিক্রমায় হাওয়া বেগমের মাটির ঘরটি এখন বেশ জীর্ণশীণ অবস্থায় পড়েছে, এই মৌসুমেই কালবৈখাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে ঘরের চাল ফুটো হয়ে যায়। সামান্য বৃষ্টিতেই চাল গড়িয়ে পানি পরে ঘরের ভেতর। আর হাওয়া বেগমও আক্রান্ত পড়েন বিভিন্ন রোগে। যে দিন কাজ থাকে সেদিনের আহার মিলে আর কাজ না থাকলে অনাহারেই থাকতে হয় তাকে।

স্থানীয়দের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে হাওয়া বেগমের অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে উপজেলা প্রশাসন হাওয়া বেগমকে সরকারী সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে জানুয়ারী মাসে তাকে ভিজিডি কর্মসূচীর আওতায় তার নাম লিপিবদ্ধ করেন। এর পর থেকেই প্রতিমাসেই হাওয়া বেগমের নামে সরকারী সহায়তার ৩০ কেজি করে চাল বরাদ্ধ দেয়া হচ্ছে। যদিও সেই বরাদ্ধের ৭মাস অতিবাহিত হলেও এখনও সেই চাউলের সিকিও উঠেনি হাওযা বেগমের হাতে।

শ্রীপুর উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নাজনিন আফরোজ জানান,হাওয়া বেগম স্বামী হারা এক হতদরিদ্র নারী। তার অসহায়ত্বের কথা বিবেচনা করে তার নাম সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী ভিজিডির আওতায় তালিকাভুক্ত করা হয়। চলতি বছর উপজেলার ১৮২৯জন নারীকে ভিজিডি কর্মসূচীর আওতায় আনা হয়েছে। এসব কার্ডধারীরা চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে আগামী বছর পর্যন্ত ২৪ মাস (প্রতিমাসে ৩০ কেজি) করে চাল পাবেন। তবে নিয়ম অনুযায়ী আমরা তালিকা দিলেও এ চাল বিতরন করেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ। এদিকে সরকারী সহায়তা বরাদ্ধের কয়েক মাস অতিবাহিত হওয়ার পর আমরা সংবাদ পাই হাওয়া বেগম তার বরাদ্ধকৃত চাল পাচ্ছেন না। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায় স্থানীয় ইউপি সদস্য নাকি তার চাল বরাদ্ধের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে আসছেন। আমরা বারবার ইউপি চেয়ারম্যান ও উক্ত সদস্যকে অনুরোধ করার পরও তারা এই অসহায় নারীকে বরাদ্ধ দিচ্ছেন না। তাই চলতি মাসে চাল বিতরনের সময় আমি নিজেই উপস্থিত থেকে তার হাতে তা তুলে দেব।

হাওয়া বেগমের ভাষ্য, গত ডিসেম্বর মাসে তাকে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অফিস থেকে তাকে জানানো হয় তার নাম সরকারী বরাদ্ধের তালিকায় তালিকাভূক্ত করা হয়েছে, জানুয়ারী মাস থেকে সে চাল পাবেন। এর পর থেকে প্রতিমাসেই চাল বিতরনের সময় কখনও ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় আবার কখনও ইউপি সদস্যের বাড়িতে ধর্ণা দিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন অনুনয় বিনয় করেও মেম্বারের মন গলানো যায়নি, মেম্বারের ভাষ্য,“তোমার নাম তালিকায় নেই, আমরা তোমার নাম দেইনি, যেখান থেকে তালিকা করেছ সেখানে যাও”।

তিনি আরো বলেন, আগে মেম্বারের পিছনে একটি কার্ডের জন্য অনেক ঘুরেও কার্ড পাইনি, এখন যখন কার্ড পাইছি সেই মেম্বার চাল দিচ্ছেন না। তাই হাওয়া বেগমের প্রশ্ন তার চালগুলো যাচ্ছে কোথায়? সবই কি হাওয়া হয়ে যাচ্ছে।

হাওয়া বেগমকে হয়রাণীর বিষয়ে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নং ওয়ার্ড সদস্য রুসমত আলী জানান, হাওয়া বেগম পরিষদে চাল বিতরনের সময় এখন পর্যন্ত আসেনি। এছাড়াও বিতরনের অনেক সময় আমি উপস্থিত থাকি না। তবে সে যদি চাল না পেয়ে থাকে তাহলে তালিকা দেখে তার পাওনা সব চাল এবার দিয়ে দেয়া হবে।

এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ শামসুল আরেফিন জানান, তিনি সম্প্রতি এই উপজেলায় যোগদান করেছেন। এখন পর্যন্ত কেউ তাকে এ বিষয়ে কিছু অবহিত করেনি, তবে তিনি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহন করবেন যাতে অসহায় নারী তার সব চাল পান।