শুক্রবার, জানুয়ারি ২২
Shadow

নোবেল ও প্রকৃত সাহিত্যের জয়

প্রাইম ডেস্ক :

ইশিগুরো তার উপন্যাস ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’ রচনা করেন ১৯৮৯ সালে। তিনি এ উপন্যাসের জন্য বিশ্বব্যাপী খ্যাতি লাভ করেন। এটির উপজীব্য খাবার পরিবেশনকারী এক ভৃত্যকে নিয়ে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একজন ইংরেজ মনিবের অধীনে ছিলেন। তার পরিচিত একজনের কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের স্মৃতিকাতরতায় ভোগেন
তার গল্পের কাঠামোয় অনুরণন সৃষ্টি হয় ‘আমি’ শব্দ থেকে। বর্ণনাকারীর অনুধাবন ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে তিনি সৃষ্টি করেন পাঠকের ভাবনার খোরাক। তাই বলা যায়, ইশিগুরোকে এবার নির্বাচন করে নোবেল কমিটি কিছুটা হলেও তাদের সম্মান রক্ষা করতে পেরেছে। বিশেষত কয়েক বছর রাজনৈতিক বিবেচনায় পুরস্কার দেয়ার অভিযোগ থেকে কিছুটা হলেও তারা রক্ষা পেয়েছে
কাজু ইশিগুরো ১৯৫৪ সালে জাপানের নাগাসাকিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন একজন সমুদ্রবিজ্ঞানী। তার ৫ বছর বয়সে পরিবার ইংল্যান্ডে চলে যায়। ইংল্যান্ডের সারেতে বসবাস শুরু করে। তিনি ভোকিং কাউন্টি গ্রামার স্কুলে ভর্তি হন। এ স্কুলে সাধারণত ব্রিটিশ অভিবাসী অভিভাবকদের ইংরেজ সমাজের সঙ্গে মেশার স্বাদ গ্রহণের সুযোগ ছিল। একজন তরুণ হিসেবে কাজু ইশিগুরো গীতিকার ও গায়ক  হতে চাইতেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে লোকসংগীতের ক্লাবের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। এর মাঝে তিনি বিভিন্ন ধরনের গান, গীতিকবিতা রচনা ও কনফেশনাল লিরিকও লিখেছেন। সংগীত চর্চায় কখনও সফলতা অর্জন করেননি তিনি। তার এ গান লেখা তাকে স্বকীয় সাহিত্য ভাষা তৈরি ও ব্রিটিশ লেখকদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখকে পরিণত করেছে। তিনি নিজেই বলেন, এ ধরনের লেখা আমার গদ্য লেখার জন্য ভালো প্রস্তুতি হিসেবে কাজ করেছে। এ পর্যন্ত তার সাতটি উপন্যাস ও গীতিকবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে।
কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও দর্শন অধ্যয়ন করার পর তিনি অবশেষে সৃজনশীল লেখালেখি শুরু করেন। তিনি ম্যালকম ব্র্যাডবারি এবং অ্যাঞ্জেলা কার্টারের মতো লেখকদের সঙ্গে পড়াশোনা করেন। তিনি সাহিত্যিকদের মধ্যে নিজস্বতা সৃষ্টি করতে পেরেছেন। এ কারণে  ১৯৮৩ সালে তিনি গ্রান্ট পত্রিকার সেরা ব্রিটিশ লেখকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন মার্টিন আমিস, ইয়ান ম্যাকইউন এবং সালমান রুশদির মতো লেখকদের সঙ্গে।
ইশিগুরো তার উপন্যাস ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’ এর জন্য বিশ্বব্যাপী খ্যাতি লাভ করেন। এ উপন্যাস খাবার পরিবেশনকারী একজন ভৃত্যকে নিয়ে, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে একজন ইংরেজ মনিবের অধীনে ছিলেন। ইশিগুরো তার উপন্যাস ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’ রচনা করেন ১৯৮৯ সালে। যেখানে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন একজন খাবার পরিবেশনকারী ভৃত্য। যে তার পরিচিত একজনের কাছ থেকে চিঠি পাওয়ার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের স্মৃতিকাতরতায় ভোগেন। বইটির আলোচনা করতে গিয়ে নিউইয়র্কের টিরেন্স র‌্যাফিটরি বলেন, কতটা নরম স্বর, বিদ্রƒপাত্মক, চিন্তাশীল বর্ণনাধর্মী তার লেখা আর বইয়ের প্রত্যেক অংশ প্রভাব বিস্তার করে পাঠকের ওপর। আলোচক আরও বলেন, এটি সহজেই পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম। বইয়ে লেখকের ইচ্ছা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে। যেন কলেজের বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একটি ধ্রুপদী ছোটগল্প তিনি রচনা করেছেন। এতটা অতিসচেতন লেখক শব্দ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সত্যিই বিস্ময়কর। তাই বলতে হয়, ইশিগুরোর গভীর অনুধাবন সামাজিক রীতিনীতি, তার অভিবাসী জীবনে ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা ‘দ্য রিমেইনস অব দ্য ডে’তে পরিলক্ষিত। এ বইয়ের কারণে তিনি বুকার পুরস্কার লাভ করেন। আর এ বইয়ের মূল চরিত্র অ্যান্থনি হপকিন্স নামে চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। এ বিখ্যাত উপন্যাসটি তিনি মাত্র ৪ সপ্তাহে লিখে শেষ করেছিলেন। অথচ তা পাঠক হৃদয়ের গভীরে রেখাপাত করতে সক্ষম হয়েছে।
ইশিগুরোর পঞ্চম উপন্যাস ‘হয়েন উই অয়ার অরফ্যান্স’ এর ব্যাপারে সমালোচকরা বলেন, পুরো উপন্যাসে আমরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রথম পুরুষের মাধ্যমে পুরো ঘটনা জানতে পারি। আর এ ধরনের প্রতিটি উপন্যাসে আমরা দেখি, ইশিগুরো আমাদের পরাশক্তিদের সঙ্গে আঁতাত করে চলার গল্প বলছেন। কিন্তু তার এ উপন্যাসে তার আত্মনিয়ন্ত্রণ, না বলা বাস্তবতা, জাপানি ও ইংরেজ হিসেবে যে দ্বিমুখী আচরণ যেন এক ঔদ্ধত্য দাম্ভিক মানুষের চরিত্র গঠনে তাকে সহায়তা করছে। সমালোচকরা এ বইয়েও ইশিগুরোর সীমাহীন রম্য, হাসিঠাট্টার খোরাক উপস্থাপনা ও বর্ণনাভঙ্গির ব্যাপক প্রশংসা করেন। যদিও তার এ উপন্যাসে কপটতা, হতাশা ও নিষ্ঠুরতার ঘটনায় ভরপুর; কিন্তু তা অদ্ভুত ও আনন্দময়। অন্যদিকে তার উপন্যাস ‘নেভার লেট মি গো’ ব্রিটিশ বোর্ডিং স্কুলের একটি কাল্পনিক প্রেমের গল্প নিয়ে লেখা। ২ বছর আগেও তিনি সমালোচকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সায়েন্স ফিকশনের যে আদল তিনি ‘নেভার লেট মি গো’তে সৃষ্টি করেছেন, তা আসলে বইয়ের বাজার ভাবনায় রেখে করা।
তারপর প্রকাশনা সংস্থার নির্দিষ্ট শ্রেণীর পাঠকের কথা বিবেচনা করে লেখায়ও কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। তিনি আরও বলেন, যে কোনো বই লেখার সময় তার মূল থিম প্রথমে মনে হয়। এরপর তিনি গল্পের কাঠামো কী হবে, তার ব্যাপারে সীদ্ধান্ত নেন। এরপর লিখতে শুরু করেন। তার মতো গল্প লেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গল্পকে উড়তে দেয়া পাঠকের কল্পনায় গল্প লেখার প্রধান কৌশল।
তিনি তার গল্পে একই ধরনের থিম, স্মৃতিভ্রম, মৃত্যু ও সময়ের কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেন। যদি জেন অস্টিন, ফ্রাঞ্জ কাফকাকে একসঙ্গে করা হয়, তবে সারাংশে পাওয়া যাবে ইশিগুরোকে। তবে এক্ষেত্রে সবশেষে তার লেখার ধরনে একটু মার্সাল প্রাউস্টের প্রভাব আছে বলে মনে করেন সুইডিশ নোবেল একাডেমির স্থায়ী সচিব সারা ড্যানিয়াস। উপন্যাসে বড় ধরনের আবেগী শক্তি, প্রতিদিনকার দৃশ্যমান পৃথিবীর অতল থেকে আমাদের সঙ্গে পৃথিবীর যে বিদ্বেষপূর্ণ সম্পর্ক তা তিনি উন্মোচন করেন। ৩৫ বছর ধরে কর্মজীবনে ইশিগুরো তার আবেগী নিয়ন্ত্রণমূলক গদ্যের জন্য ব্যাপক স্বীকৃত। তার উপন্যাসগুলো প্রায়ই প্রথম পুরুষের বর্ণনায় লেখা হয় যে সত্যকে অস্বীকার করে আর এ বাস্তবতা ধীরে ধীরে পাঠকদের সামনে প্রকাশিত হয়।
তার গল্পের কাঠামোয় অনুরণন সৃষ্টি হয় ‘আমি’ শব্দ থেকে। বর্ণনাকারীর অনুধাবন ও বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে তিনি সৃষ্টি করেন পাঠকের ভাবনার খোরাক। তাই বলা যায়, ইশিগুরোকে এবার নির্বাচন করে নোবেল কমিটি কিছুটা হলেও তাদের সম্মান রক্ষা করতে পেরেছে। বিশেষত কয়েক বছর রাজনৈতিক বিবেচনায় পুরস্কার দেয়ার অভিযোগ থেকে কিছুটা হলেও তারা রক্ষা পেয়েছে। কারণ বড়গল্পের প্লট নির্মাণেও তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্মৃতি ও স্মৃতিভ্রম, যুদ্ধ ও ভালোবাসার মতো বড় ক্যানভাসকে সহজেই সমন্বয় করতে পারেন। তিনি পৃথিবীকে স্মরণ করাতে পারেন, অতীতে ও ভবিষ্যতে পৃথিবীর প্রতি আমাদের যে বৈরী আচরণ ও বিশ্বশান্তির প্রতি আমাদের যে অনীহা  তা শুধু আমাদের ধ্বংসের বীজই বপন করতে উৎসাহিত করবে, সৃষ্টির নয়।
এ কারণে তিনি বলতে পারেন, আমার সবসময় আগ্রহ কীভাবে আমরা একই সময়ে নিজস্ব ছোট পৃথিবী এবং বিশ্বজগতের বড় পৃথিবীতে বাস করি। এখানে আমাদের একটি ব্যক্তিগত  জায়গা আছে, যেখানে আমরা  নিজস্ব সন্তুষ্টি ও প্রেম পেতে চেষ্টা করি। কিন্তু এটি বড় জগতের সঙ্গে অপরিহার্যভাবে জড়িত  যেখানে রাজনীতি, এমনকি  কাল্পনিক পৃথিবীও অবস্থান করে। আমরা একই সময়ে  নিজস্ব জগৎ ও বিশ্বজগতে বাস করতে গিয়ে একের জন্য অন্যকে ভুলে যেতে পারি না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.