চামড়ার দাম

বরাবরের মতো এবারও কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের স্বার্থই সংরক্ষিত হয়েছে। মঙ্গলবার বাণিজ্যমন্ত্রী ও বাণিজ্য সচিবের সঙ্গে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানি এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে চূড়ান্ত হয়েছে চামড়ার দাম, যা মূলত গত বছরের মতোই। গরুর চামড়া প্রতি বর্গফুট ঢাকায় ৪৫-৫০ টাকা, ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকা। খাসির চামড়া সারাদেশে প্রতি বর্গফুট ১৮-২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩-১৫ টাকা। ব্যবসায়ীরা অবশ্য এই দাম আরও কমাতে চেয়েছিলেন। তাদের মতে, গত কয়েক বছর ধরেই চামড়ার বাজারে মন্দা চলছে। বাস্তবে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের দাম বেশি। কেননা, কৃত্রিম চামড়ার কারণে প্রকৃত চামড়াজাত পাদুকাসহ অন্যবিধ পণ্য দ্রব্য বর্তমানে বিলাসপণ্য হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে বরাবরের মতো এবারও সক্রিয় চামড়া সিন্ডিকেট। তাদের দাবি ও চাপের মুখে তাই এবারও চামড়ার দাম বাড়ানো গেল না। অথচ ধান ও চাল বাদে অন্য সব পণ্যের দাম বাড়তির দিকে। বাস্তবে গতবারও কোথাও নির্ধারিত দর মেনে চামড়া বেচাকেনা হয়নি। প্রচুর পশু কোরবানি হয়েছিল। খুচরা বাজারে চামড়ার সরবরাহ ছিল আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু ট্যানারি মালিক, আড়তদার, চামড়া রফতানিকারক ও লবণ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট চামড়ার দাম নিয়ে কারসাজি শুরু করেছিল। ফলে কাঁচা চামড়া নিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের বিপাকে পড়তে হয়েছিল। কয়েক বছর ধরেই ঈদ-উল-আজহায় আগের বছরের চেয়ে কমিয়ে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীরা পানির দরে কাঁচা চামড়া কেনার সুযোগ পাচ্ছেন।

কোরবানির পশুর চামড়া মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাত ঘুরে ঢাকার আড়তে আসে। আড়তদাররা এসব চামড়া কিনে সাভারের ট্যানারি শিল্প নগরীতে সরবরাহ করে থাকেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ঢাকার আড়তদার ও ট্যানারি মালিক এই তিন পক্ষের মধ্যে বড় অঙ্কের লেনদেন হয়ে থাকে। এ বছর লবণ সঙ্কটের কথা শোনা যায়নি। দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয়, তার ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ আসে ঈদ-উল-আজহায়। কোরবানিতে ভাল ও সুস্থ গরু জবাই হয় বলে এই চামড়ার মানও ভাল থাকে। ব্যবসায়ীদেরও এই চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ থাকে। চামড়ার দাম এবারও না বাড়ানোয় ট্যানারি মালিক ও এ শিল্প খাতে সংশ্লিষ্টরা লাভবান হলেও এতিম, অসহায়, এমনকি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। দাম না বাড়ানোর বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, আন্তর্জাতিক বাজার, সাভারে বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর কমপ্লায়েন্স ইস্যু, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার প্রবণতা এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হওয়ায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এই দর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ট্যারিফ কমিশন যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাতে দেখা গেছে, এ বছর বর্গফুট প্রতি বেঁধে দেয়া কাঁচা চামড়ার দাম ট্যারিফ কমিশনের সুপারিশ করা মূল্য থেকে কম। চামড়ার মানও কমে যাচ্ছে বলে ট্যানারি মালিকদের দাবি। কোরবানির চামড়া আমাদের দেশের সম্পদ। সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পের স্বার্থে কোরবানির চামড়া নিয়ে অসাধু বাণিজ্য বন্ধ করা জরুরী। দেশে চামড়ার দাম না পেলে চোরাই পথে পাচার হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। চামড়া শিল্পের সুরক্ষায় চারটি সরকারী ব্যাংক স্বল্প সুদে ১৮০০ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা নিশ্চয়ই এর সদ্ব্যবহার করবেন। বর্ডার গার্ড বিজিবিকেও সতর্ক রাখা হয়েছে। চামড়ার বাজার উন্নত ও স্থিতিশীল রাখা জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই প্রয়োজন।