শুক্রবার, এপ্রিল ২৩
Shadow

আত্মপক্ষ সমর্থনে আদালতে যা বললেন খালেদা জিয়া

প্রাইম ডেস্ক :

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি এবং চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন পেয়েছেন। বৃহস্পতিবার তিনি পুরান ঢাকার বকশীবাজারস্থ অস্থায়ী আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন প্রার্থনা করেন। ঢাকার ৫ নম্বর বিশেষ জজ ড. মো. আখতারুজ্জামান শুনানি শেষে প্রত্যেক মামলায় এক লাখ টাকা বন্ডে এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া বিদেশ না যাওয়ার শর্তে তার এই জামিন মঞ্জুর করেন। পরে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী আত্মপক্ষ সমর্থনে আদালতে ঘন্টাব্যাপী বক্তব্য দেন।

খালেদা জিয়া বলেন, মাননীয় আদালত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে কেন্দ্র করে আমিসহ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ মিথ্যা, উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে। সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ কাল্পনিক, বানোয়াট, স্ববিরোধী বক্তব্যে ভরপুর। এই ট্রাস্টের অর্থ পরিচালনা বা অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে আমার নিজের ব্যক্তিগতভাবে বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রধানমন্ত্রীর কোনো সম্পর্ক ছিল না, এমনকি এখনও নেই। দুদক আইনগত কর্তৃত্ব এবং এখতিয়ারের বাইরে এ মামলা দায়ের করেছে। আর এমন একটি ভিত্তিহীন অভিযোগ দায়ের করে এ মামলায় বিচারের নামে দীর্ঘদিন ধরে আমি হয়রানি, পেরেশানি ও হেনস্থার শিকার হচ্ছি। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে উল্লেখ করে খালেদা বলেন, এ মামলার কারণে বিঘ্ন হচ্ছে আমার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম। দেশ-জাতি ও জনগণের জন্য, তাদের স্বার্থে ও কল্যাণে নিয়োজিত আমার প্রয়াস ও পরিকল্পনা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। এমন সব মিথ্যা মামলার কারণে আমার দলের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভাকাঙ্ক্ষী ও জনগণের বিরাট অংশকে থাকতে হচ্ছে উৎকণ্ঠার মধ্যে। কারণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন ধারণা প্রবল যে, দেশে ন্যায়বিচারের উপযোগী সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি এখন নেই। বিচার বিভাগ স্বাধীন, স্বাভাবিকভাবে বিচারকাজ পরিচালনা করতে পারছেন না। শাসক মহলের নানামুখী তৎপরতা, হস্তক্ষেপের প্রভাবে বিস্তারের কারণে বিচারকগণ আইন অনুযায়ী বিবেগ শাসিত হয়ে বিচারকাজ করতে পারছেন না।  রায়, সিদ্ধান্ত, নির্দেশ প্রদানের ক্ষেত্রে বিচারকগণকে তোয়াক্কা করতে হচ্ছে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। ক্ষমতাসীনেরা কিসে তুষ্ট এবং কিসে রুষ্ট হবেন, সেকথা মাথায় রেখে বিচারকদের চলতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বিচারকদের পদোন্নতি, নিয়ম, হয়রানি ও বদলীর ক্ষমতা বিপুলভাবে রয়ে গেছে ক্ষমতাসীনদের হাতে। এই ক্ষমতা অপপ্রয়োগের ভয়। তাই বিচারকদের মনে থাকাটাই স্বাভাবিক। নিম্ন আদালতে এ পরিস্থিতি ও পরিবেশ নেতিবাচক প্রভাব আরো বেশি প্রকোপ। আমি একটি উদাহরণ উল্লেখ করতে চাই। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, প্রয়াত জিয়াউর রহমান এবং আমার পুত্র তারেক রহমানকে অর্থ পাচারের একটি বানোয়াট অভিযোগ থেকে তার অনুপস্থিতিতে একজন বিচারক বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন। এ অপরাধে শাসকমহল উক্ত বিচারককে হেনস্থা ও হয়রানির উদ্দেশে এমন সব তৎপরতা শুরু করে যে- তাতে ওই বিচারককে আত্মরক্ষার জন্য দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে। এ একটি মাত্র উদাহরণই ন্যায়বিচার ব্যাহত করতে এবং ব্যক্তি বিচারকদের নিজস্ব নিরাপত্তাবোধের ব্যাপারে শঙ্কিত করার জন্য যথেষ্ট। এমন সব ঘটনা সরবে ও নীরবে অহরহ ঘটছে। এসব কারণে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। আবার এসব কারণে মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার এসব কারণে সর্বোচ্চ আদালতের সাথে শাসক মহলের সাথে বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এসব কারণেই বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান বিচারপতি সম্প্রতি প্রকাশ্যেই বলেছেন যে বিচার বিভাগের হাত-পা বাঁধা। তিনি আরও বলেছেন, বিচারকগণ স্বাধীন নন। এসব কারণে আমাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে কি না তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। আর বাসা বেঁধেছে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার। প্রাক্তন এ প্রধানমন্ত্রী বিচারককে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি কোথায় বসে এ মামলার বিচারকাজ পরিচালনা করছেন। কোথায় স্থাপন করা হয়েছে আপনার এজলাস। এটা কি বিচারের কোনো প্রাঙ্গণ? এটা কি কোর্ট-কাচারি এলাকা। আমরা বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিচারের জন্য বিশেষ আদালত বসেছে আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে। এ মাদ্রাসা প্রাঙ্গণের সাথে বিচার ও কোর্ট-কাচারির কোনো সম্পর্ক আছে কি? তিনি বলেন, এখানে এলেই আমার মনে পড়ে ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিনের কথা। দেশের নেতা-নেত্রী ও রাজনীতিবিদদের হেনস্থা ও হয়রানির উদ্দেশে আইন আদালত প্রাঙ্গণের বাইরে পৃথক এলাকা জাতীয় সংসদ ভবনে স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল ও এজলাস বসিয়েছিল। গণতন্ত্র, সংসদ ও জনপ্রতিনিধিদের অসম্মান, অপমান ও হেয় করাই ছিল তাদের সেইদিনের কার্যকলাপের উদ্দেশ্য। কিন্তু আজও তারই ধারাবাহিকতা চলছে। পিলখানা হত্যাকাণ্ড, বিডিয়ার বিদ্রোহের বিচার করার জন্য এই আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে এজলাস বসানো হয়। বাংলাদেশের বিচারের ইতিহাসে বিদ্রোহ, ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ওই মামলাটি একটি অভূতপূর্ব ও বিশেষ মামলা। শতশত অভিযুক্ত ও সাক্ষীর উপস্থিতিতে সেই মামলা পরিচালনা, উপযুক্ত কাঠামো কোর্ট-কাচারির প্রাঙ্গণে নেই। এজন্য আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে মামলাটির বিচারকাজের জন্য এজলাস স্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রদ্রোহ, হত্যা বিচারের জন্য এজলাস স্থাপন করা হয়েছিলো। আর সেখানে এখন আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিচার কেন করা হবে বলে প্রশ্ন রাখেন তিনি। তিনি আরও বলেন, একই ধরনের অভিযোগে দায়ের করা অন্যান্য মামলা আপনি (বিচারক) কোর্ট-কাচারির প্রাঙ্গণে বসেই পরিচালনা করছেন। কেবল আমার বেলায় কেন এই ন্যাক্কারজনক ব্যতিক্রম। সকলে জানে এবং আপনি জানেন, এর জন্য আপনি দায়ী নন। এ সিদ্ধান্ত আপনি দেন নি। আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার বিচারকাজ কোথায় বসে পরিচালনা হবে, এজলাস কোথায় স্থাপিত হবে সেটা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে শাসক মহলের ইচ্ছে। অভিপ্রায়ে জড়িত তারাই এখানে এজলাস বসিয়েছে আমার মামলার বিচারের জন্য। শৃঙ্খলা ভঙ্গ, বিদ্রোহ, রাষ্টদ্রোহ ও খুন ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্তদের যেখানে বিচার হয়, সেখানে এজলাস বসিয়ে আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় বিচারের আয়োজন তারাই করেছে। সেখানে আমাকে হাজির হতে হচ্ছে। আমাকে জনসম্মুখে হেয় করা, অপমান করা এবং হেনস্থা করা ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশ্য। এটাও বিচার প্রক্রিয়ায় এক ধরনের হস্তক্ষেপ। খালেদা জিয়া বলেন, এ পদক্ষেপ এমন একটি বিকট পরিবেশের জন্ম দিয়েছে যার কারণে জনমনে ন্যায় বিচার সম্পর্কে চরম সংশয়, সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। এর মাধ্যমে আমাকে বিচারের আগেই এবং বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এক ধরনের চরম হেনস্থা ও অসম্মানিত করা হচ্ছে। এর প্রতিবিধান আমি কার কাছে চাইবো, কোথায় পাবো এর প্রতিকার। বিএনপির এ চেয়ারপারসন বলেন, বিএনপি বাংলাদেশের জনগণের রায় নিয়ে বারবার এবং দীর্ঘসময় দেশ পরিচালনা করেছে। দায়িত্বশীল একটি বৃহত্তম দল বিএনপির সারাদেশে বিপুল জনসমর্থন রয়েছে। অথচ আমাদের রাজধানীতে সমাবেশ করতে দেয়া হয় না। পক্ষান্তরে শাসক দল রাস্তাঘাট বন্ধ করে, জনগণের চলাচল নিভৃত করে, জনজীবন বিপর্যস্ত করে সভা-সমাবেশ করছে। গত ১০ জানুয়ারি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দীতে জনসভা করে করে আওয়ামী লীগ। ওই জনসভায় বিনাভোটে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তৃতা করেন। ১১ জানুয়ারি দৈনিক একটি পত্রিকার একটি প্রতিবেদন তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতিমের টাকা চুরি করে খেয়েছেন। এতিমের নামে টাকা এসেছে আর সে টাকা মেরে খেয়েছেন। অর্থ আত্মসাতের ওই মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে যান না।একদিন যান তো দশদিন যান না। পালিয়ে বেড়ান। ব্যাপারটা কি? এতেই ধরা পড়ে যে, চোরের মন পুলিশ পুলিশ। খালেদা জিয়া বলেন, বিচারাধীন মামলা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এমন মানহানিকর, জঘন্য উক্তির কি জবাব দিব। তিনি প্রকাশ্যেই এসব জঘন্য উক্তি করেছেন। তার বিরুদ্ধেও দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের মামলা ছিল। তার নিকট আত্মীয় শেখ সেলিম, দলের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জবাবে তারা সব দুর্নীতির কথা অনর্গল বলেছিলেন। সেগুলো মানুষের স্মৃতিতে ও মুখে মুখে আছে। ইউটিউবে সে সবের ভিডিও এখনো আছে। অথচ শেখ হাসিনা ক্ষমতায় বসার পর তার বিরুদ্ধে সেই দুর্নীতির মামলাগুলো একে একে প্রত্যাহার ও নিষ্পত্তি করা হয়েছে। আমরা কখনো তার বিরুদ্ধে এমন কুৎসিত উক্তি করিনি। খালেদা জিয়া বলেন, আমি বিশ্বাস করতে চাই, আপনার এই আদালত আইনের দ্বারা পরিচালিত, এই আদালতে আমার উপস্থিতি ও হাজিরা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আপনি স্বাধীনভাবে গ্রহণের অধিকার রাখেন বলে মনে করি।   তিনি বলেন, এ দেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ছিল আমাদের স্বাধীনতার লক্ষ্য। জিয়াউর রহমান সেই সব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই সকল লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানুষ অকাতরে জীবন দিয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে। স্বাধীনতার সেই সব লক্ষ্য আজ পদদলিত। সারা জাতি আজ লাঞ্ছিত ও নির্যাতিত। সমগ্র বাংলাদেশকেই আজ এক বিশাল কারাগার বানানো হয়েছে। সবখানেই চলছে অস্থিরতা ও গভীর অনিরাপত্তা বোধ। মিথ্যা ও সাজানো মামলায় বিরোধীদলের হাজার হাজার নেকাকর্মী এ মুহূর্তে কারাগারে বন্দি। বিএনপির প্রায় ৭৫ হাজার নেতাকর্মী বিভিন্ন মেয়াদে কারা নির্যাতন ভোগ করেছে। আমাদের দলের ৪ লাখের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ২৫ হাজারের মত মামলা দায়ের করা হয়েছে। নির্যাতন গ্রেপ্তার, হয়রানি ও গ্রেপ্তারের ভয়ে বহু নেতাকর্মী ঘরে থাকতে পারছে না, পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। গুম, খুন, অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বিরোধী দলের অসংখ্য নেতাকর্মীরা। তাদের ঘরে ঘরে আজ কান্নার রোল। এখন সংবিধান ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বড় বেশি বলা হয়। কিন্তু কোথায় আজ সাংবিধানিক শাসন। আমাদের সংবিধান নাগরিকদের যেসব অধিকার দিয়েছে কোথায় আজ সেই সব অধিকার। কোথায় আজ সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। নিজেকে একজন সামান্য মানুষ উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, তবে দেশ জাতির স্বার্থে ও কল্যাণে আমার জীবন, সীমিত শক্তি সামর্থ এবং মেধাকে আমি উৎসর্গ করেছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.