জাপানের শ্রমবাজার

মধ্যপ্রাচ্য-মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার যখন সঙ্কুচিত হয়ে আসছে তখন জাপানের মতো দেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার সংবাদটি নিঃসন্দেহে সুখবর। মনে রাখতে হবে যে, জাপান একটি অত্যন্ত উন্নত, সমৃদ্ধ ও সভ্য দেশ। পারমাণবিক শক্তিধর না হয়েও দেশটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক পরাশক্তি। অথচ জাপান একটি ছোট-বড় দ্বীপপুঞ্জ সন্নিবেশিত ছোট দেশ, জনসংখ্যাও সীমিত। কনজারভেটিভও বটে। সে অবস্থায় দেশটির শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগের সর্বাত্মক ও সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার অবশ্যই করতে হবে বাংলাদেশকে। বিষয়টি অবারিত হয় চলতি বছরের মে মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফরের মাধ্যমে। সে সময় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে জাপানে দক্ষ জনশক্তি প্রেরণ ও নিয়োগের প্রস্তাব করা হলে জাপান অনুকূল মনোভাব পোষণ করে। উল্লেখ্য, জাপান বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভবত প্রধানতম উন্নয়ন সহযোগী বন্ধুপ্রতিম দেশ এবং জাইকা এক্ষেত্রে প্রভূত সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকে নানাভাবে ও উপায়ে। সুতরাং সে দেশে দক্ষ কর্মী প্রেরণকারী নবম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি নিঃসন্দেহে শ্লাঘার বিষয়। এ বিষয়ে সম্প্রতি দু’দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষর হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে যে, জাপান সে দেশে ১৪টি খাতে কেবল যোগ্য ও দক্ষ কর্মীদেরই সুযোগ দেবে এবং তাদের জন্য জাপানী ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক। এ ক্ষেত্রে যেন কোন অবস্থাতেই নয়-ছয় না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে। নিকট অতীতে এই মন্ত্রণালয় মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োগ ও প্রেরণের ক্ষেত্রে আদৌ কোন সাফল্য দেখাতে পারেনি। এমনকি এজেন্ট-দালালসহ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকেও সামলাতে ব্যর্থ হয়েছে। যে কারণে বাংলাদেশ থেকে যে বা যারাই যাচ্ছেন, তারাই বিভিন্নভাবে ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়মসহ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। জাপানের ক্ষেত্রে যেন এমনটি না ঘটে কোন অবস্থাতেই।

মনে রাখতে হবে, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজারের সুদিন আর নেই। বরং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেরাই এখন সমূহ সঙ্কটে। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশীদের জন্য সর্ববৃহৎ ও আকর্ষণীয় শ্রমবাজার সৌদি আরব বর্তমানে নানা সমস্যার সম্মুখীন। অনুরূপ অবস্থা বিরাজ করছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও ক্ষতবিক্ষত অর্থনীতি কবলিত মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই। অথচ এসব হতভাগ্য শ্রমিক সব হারিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হলে দেশের অবস্থা কী হবে, সে বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের তেমন চিন্তাভাবনা আছে বলে মনে হয় না।

বিশ্বব্যাপী রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধির সুসংবাদ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। গত বছর সারা বিশ্বে প্রবাসী আয় বেড়েছে সাড়ে ৮ শতাংশ, যার পরিমাণ ৪৬৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি বছর এর পরিমাণ বাড়তে পারে আরও চার শতাংশ। এর ফলে দরিদ্র ও অনুন্নত দেশগুলো উপকৃত এবং উন্নত হচ্ছে। এও সত্য যে, উন্নত বিশ্বে দক্ষ ও প্রযুক্তিভিত্তিক জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। যেমন জাপান। অনেক ক্ষেত্রে উন্নত শিল্প কারখানাগুলোতে শ্রমিকের স্থান দখল করে নিচ্ছে রোবট ও কম্পিউটার। সেই পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশকে যথাযথ প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই। দেশেই তৈরি করতে হবে দক্ষ মানবসম্পদ। এক্ষেত্রেও জাপান সহায়ক হতে পারে বাংলাদেশের জন্য।