মঙ্গলবার, এপ্রিল ২০
Shadow

দারিদ্র্য বিমোচন

বাংলাদেশে মোট দারিদ্র্যের পাশাপাশি হতদরিদ্রের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। শেখ হাসিনা সরকারের নেয়া নানা উদ্যোগ আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকায় দারিদ্র্য বিমোচন ঘটছে দ্রুত। বিশ্বের সামনে দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশ যে এক অনুকরণীয় অবস্থানে পৌঁছেছে তার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করেছে বহুজাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক। সংস্থার প্রধান জিম ইয়ং কিম দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য দেখতে গত বছর ঢাকায় এসে বলেছিলেন, বিশ্বের অন্য উন্নয়নশীল দেশের উচিত কীভাবে দারিদ্র্য দূর করত হয় তা বাংলাদেশের কাছ থেকে শেখা। টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে দেশটি অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের কাছে অনুকরণীয় হতে পারে। বাংলাদেশের এই ‘উন্নয়ন বিস্ময়’ জাতিসংঘকেও বিস্মিত করেছে। এটাই স্বাভাবিক। ২০১৬ সাল থেকে দেশে দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক তিন শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ২৪ জন এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে। এর আগে ২০১০ সালে এই হার ছিল ৩১ দশমিক ৫০ জন। অর্থাৎ তখন প্রতি ১০০ জনে ৩১ জনের বেশি বসবাস করত দারিদ্র্যসীমার নিচে। ছয় বছরের ব্যবধানে এই হার ৭ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক নয় শতাংশ, যা বর্তমান আন্তর্জাতিক অতি দরিদ্র হার ১৩ দশমিক আট শতাংশের তুলনায় কম। ২০১০ সালে যা ছিল ১৭ দশমিক ছয় শতাংশ। তারও আগে নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় এই হার ছিল ৫৬ শতাংশ। দারিদ্র্য বিমোচনে মূলত বাংলাদেশের অগ্রগতি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ভাল। ষোলো কোটি বাংলাদেশী জনগণের মধ্যে এখন মাত্র ১২ দশমিক ৯ শতাংশ তথা দুই কোটি আশি লাখ এখন হতদরিদ্র। ২০০৫ সালে এ হার ছিল ৪৩ দশমিক তিন শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রায় অর্ধেক জনগণই ছিল হতদরিদ্র। বাংলাদেশে এখন হতদরিদ্র তারাই, যাদের দৈনিক আয় ১৪৮ টাকার কম। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০১৮ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ২৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার কথা। কিন্তু তার আগেই ২০১৬ সালে তা ১২ দশমিক নয় শতাংশে নেমে এসেছে। বাংলাদেশ এখন যে হারে জিডিপির প্রবৃদ্ধির অর্জন করছে তাতে ২০৩০ সাল নাগাদ হতদরিদ্রের হার তিন শতাংশের কাছাকাছি দাঁড়াবে বলে আশা করা যায়। জিডিপির হার বেড়ে গেলে এই অবস্থান আরও কমবে। এটা ঠিক যে, একটি দেশের অর্থনীতির বৃদ্ধির ওপর দারিদ্র্য হার কমার বিষয়টি নির্ভর করে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, গরিব মানুষ এর সুফল বেশি পায়, তাহলে দ্রুত দারিদ্র্য হ্রাস পায়। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সরকার ২০২০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৮ দশমিক ছয় শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে। ওই সময়ে হতদরিদ্রের হার আট দশমিক নয় শতাংশে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো যে জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তাতে দুটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে সামগ্রিকভাবে দারিদ্র্যের হার তাৎপর্যপূর্ণভাবে কমছে এবং ভোগের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। আর দুটি নেতিবাচক দিক হচ্ছে, দারিদ্র্য বিমোচনের গতি কমেছে এবং আয় বৈষম্য বেড়েছে। বর্তমানে প্রতিটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ২০১০ সালের তুলনায় চার হাজার ৪৬৬ টাকা বেড়েছে। ২০১৬ সালে জরিপভুক্ত প্রতিটি পরিবারের মাসিক আয় ১৫ হাজার ৯৪৫ টাকা। ২০১০ সালে এর পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৪৭৯ টাকা। এ সময়ে স্বাভাবিকভাবে বেড়েছে ব্যয়ের পরিমাণও। বিশ্বে এখন হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৭৭ কোটি। যাদের দৈনিক আয় এক দশমিক ৯০ ডলারের কম। তাদের মধ্যে ৫১ শতাংশের বাস সাব-সাহারা অঞ্চলে। আর ৩৪ শতাংশের বাস দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে। ঠিক এর বিপরীত অবস্থানে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও ভুটানের চেয়েও এগিয়ে বাংলাদেশ। বিশ্বের খুব কম দেশই বাংলাদেশের মতো এমন দ্রুত সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে। তাই বাংলাদেশ আজ এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দারিদ্র্য এখন আর কবির ভাষার মতো মহীয়ান করে তোলে না বরং দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। তবে শুধু দারিদ্র্যের হার হ্রাস নয়। দারিদ্র্যের সংখ্যা যেমন কমানো প্রয়োজন, তেমনি ধনী-দরিদ্র ব্যবধান হ্রাসে সকল ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা জরুরী।

Leave a Reply

Your email address will not be published.