শুক্রবার, জানুয়ারি ২২
Shadow

রেললাইনে মৃত্যুর মিছিল বন্ধ হইবে কবে

রেললাইনে কাটা পড়িয়া বা ট্রেনের ধাক্কায় হতাহতের সংখ্যা দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বাড়িতেছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালী ও কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার শ্রীনিবাস এলাকার রেললাইনে চার জনের মৃত্যু হইয়াছে। গত সাত মাসে সারা দেশে এই ধরনের মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ছয় শতাধিক। অরক্ষিত রেলক্রসিং, কানে হেডফোন লাগাইয়া বা মোবাইল ফোনে কথা বলিতে বলিতে হাঁটা, রেললাইনে বসিয়া আড্ডা দেওয়া এবং ট্রেন আসিতে দেখিয়াও রেললাইন পার হইবার প্রবণতা বৃদ্ধি পাইবার কারণেই মূলত এই ধরনের প্রাণহানির ঘটনা দিন দিন বাড়িতেছে বলিয়া মনে করেন রেলওয়ে পুলিশ। ঢাকা জিআরপি থানা সূত্রে জানা যায়, গত বত্সর রেললাইনে শুধু মুঠোফোনজনিত দুর্ঘটনায় ৯০ জনের মৃত্যু হইলেও এই বত্সরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাহা শতকের গণ্ডি ছাড়াইয়া গিয়াছে।
রেললাইনে নানা কারণে দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। তবে ইহার জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের চাইতে জনসচেতনতার অভাবই প্রধানত দায়ী।  ইহার মধ্যে লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনায়ই অধিক সংখ্যক প্রাণহানি ঘটে। আর এইসব লেভেল ক্রসিংয়ের বেশিরভাগই রেলওয়ে কর্তৃক অনুমোদিত নহে। দেখা যায়, চালকের অস্থিরতার কারণে প্রায়শ মটরসাইকেল, অটোরিকশা, ছোট-বড় বাস সিগন্যাল অমান্য করিয়া বেপরোয়া গতিতে ক্রসিং পার হয়। ফলে অনেক সময় গাড়ি লেভেল ক্রসিংয়ে উঠিয়া নিয়ন্ত্রণ হারায়। এমনকি ঐ মুহূর্তে ইঞ্জিন বিকল বা বন্ধ হইয়া যাইবার মতো বিপত্তিও দেখা দেয়। তখন অনিবার্য পরিণতি হিসাবে দুর্ঘটনার তালিকায় যুক্ত হয় আরো একটি ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা। জানা যায়, দেশে রেলওয়ের  নেটওয়ার্কে দুই হাজার ৫৪১টি লেভেল ক্রসিং থাকিলেও গেটম্যান রহিয়াছে মাত্র ২৪২টিতে। দেশব্যাপী বহু লেভেল ক্রসিং তৈরি হইয়াছে ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে, যেইগুলির বেশিরভাগই অরক্ষিত। সেখানে কোনো সাইন-সিম্বলও নাই। এই পরিস্থিতিতে গত তিন বত্সরে দেশ জুড়িয়া হাজারটিরও বেশি লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে। ইহাছাড়া কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ও অসাধু উদ্দেশ্যে রেললাইন ঘেঁষিয়া শত শত বস্তিঘর এবং ভ্রাম্যমাণ বাজার বসিবারও ভূরি ভূরি নজির রহিয়াছে। মূলত এই ধরনের অবৈধ স্থাপনার কারণেও রেললাইনে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হইতেছে।
রেলওয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে রেললাইনের দুই পার্শ্বের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদসহ ব্যস্ততম রেলস্টেশন কিংবা জংশন এলাকার রেল লাইনের পার্শ্বে মানুষের অবাধ পারাপার বন্ধ করিতে লোহার বেষ্টনী স্থাপন করা জরুরি। ফুট ওভার ব্রিজও এই ক্ষেত্রে ভালো একটি বিকল্প হইতে পারে। উপরন্তু রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলিতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করাসহ প্রযুক্তিগত সুবিধাগুলি নিশ্চিত করিবার প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে। বিশেষত প্রয়োজন রহিয়াছে ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে দেশের যত্রতত্র রেল ক্রসিং নির্মাণের ব্যাপারে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করিবারও। তবে বিশেষ প্রয়োজনে কেহ তাহা নির্মাণ করিলে সেইক্ষেত্রে  তাহাকে অবশ্যই অত্র ক্রসিংয়ের সুরক্ষার ভার গ্রহণ করিতে হইবে মর্মে বাধ্য-বাধকতা আরোপ করা জরুরি। সর্বোপরি, রেল লাইন ধরিয়া হাঁটা কিংবা পারাপারের ক্ষেত্রে জনসাধারণের সচেতনতার কোনো বিকল্প নাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.