তীরন্দাজের স্বর্ণপদক

রোমান সানার স্বর্ণপদক প্রাপ্তির গল্পটি আর দশটি খেলাধুলা কিংবা ক্রীড়াবিদের সঙ্গে ঠিক তুলনীয় নয়। রোমান সোনা জয় করেছেন আর্চারিতে, তীর-ধনুকের খেলায়। যেটি বাংলাদেশে তেমন জনপ্রিয় অথবা প্রচলিত নয়। বিশ্বের খুব কম দেশেই তীর-ধনুক বা আর্চারি জনপ্রিয় খেলা। বড়জোর গোটা পঞ্চাশেক দেশে খেলাটি জনপ্রিয়। তো সেই তীরন্দাজ হিসেবে প্রথম বাংলাদেশী শুক্রবার ফিলিপিন্সে অনুষ্ঠিত এশিয়ান আর্চারিতে সোনার পদক ছিনিয়ে নিয়েছেন রোমান সানা, তাও আবার শক্তিশালী প্রতিপক্ষ চীনের শি ঝেনকিকে ৭-৩ ব্যবধানে পরাজিত করে। এর জন্য তরুণ তীরন্দাজ রোমান সানা অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য। এর পাশাপাশি গত জুনে হল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্ব আর্চারিতে ব্রোঞ্জ পদক জেতার কৃতিত্বে আগামী বছর টোকিও অলিম্পিকে সরাসরি খেলার যোগ্যতাও অর্জন করেছেন তিনি। এখন রোমানের জন্য প্রয়োজন আরও উন্নত প্রশিক্ষণ-পরিচর্যাসহ যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা।

বর্তমান সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে নানাবিধ খেলাধুলার ব্যাপারে অত্যন্ত আন্তরিক ও উদার হস্ত। সরকারের উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় এখন আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় পর্যায়ের খেলা যেমন ফুটবল ও ক্রিকেট খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং হচ্ছে রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, রাজশাহী ও অন্যত্র। খেলাধুলার উন্নয়নে জাতীয় বাজেট বরাদ্দও বেড়েছে। অন্তত ৫০টি জেলায় ৫০টি মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ে ক্রিকেটার, ফুটবলার তৈরির লক্ষ্যে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজন করা হচ্ছে বিভিন্ন বয়সী ফুটবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। এ দুটি ক্ষেত্রে দেশে তরুণদের সাফল্য, বিশেষ করে মেয়েদের অবশ্যই উল্লেখ করার মতো। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) বিল-২০১৯। বিলের তফসিলে আরও ব্যাপক উন্নয়নের জন্য হাডুডু, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, কানামাছিসহ ৪২টি দেশীয় লোকজ খেলা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এসবই সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে।

অধুনা ক্রমশ সঙ্কুুচিত হয়ে পড়ছে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও মনোজগত, বিশেষ করে রাজধানী ও বড় বড় শহর-নগরে। খেলাধুলা, বিশেষত বাইরের খেলাধুলার সঙ্গে পরিচয় ও চর্চা না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে তাদের শারীরিক বৃদ্ধি ও উচ্চতা। দখলদারদের দৌরাত্ম্যে রাজধানীর ফুসফুস বলে খ্যাত পার্কগুলো এবং ধমনী ও শিরা হিসেবে বিবেচিত খালগুলোর অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। আগে ছোট-বড় সব স্কুলে অন্তত একটি করে খেলার মাঠ ছিল। সেসব স্থানে এখন গড়ে উঠেছে বড় বড় বিল্ডিং। শিক্ষাঙ্গন সম্প্রসারিত হলেও সঙ্কুচিত হয়েছে খেলাধুলা ও বিনোদনের জগত। বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই। ফলে স্কুলগামী শিশুরা নিতান্তই ঘর তথা ফ্ল্যাটবন্দী হয়ে পড়েছে। একদিকে পিঠে ভারি বইয়ের বোঝা, অন্যদিকে প্রবল কোচিংয়ের চাপ। পড়ালেখা ও নিয়মিত ক্লাস পরীক্ষার বাইরে যেটুকু সময় পায় শিশুরা তাদের সে সময় কাটে টেলিভিশন দেখে অথবা কম্পিউটার কিংবা সেলফোনে গেম খেলে। কিন্তু সেখানেও কি শিশুরা প্রকৃতপক্ষে বিনোদন কিংবা শিক্ষামূলক কিছু আদৌ পাচ্ছে? দেশের ৪০ শতাংশ শিশু এহেন প্রতিকূল পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে বেড়ে উঠছে প্রায় বিকলাঙ্গ একটা গোষ্ঠী হিসেবে।

অথচ ফুটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, হকি, এমনকি হ্যান্ডবল খেলার জন্য তেমন ব্যয়বহুল উপকরণের প্রয়োজন পড়ে না। তদুপরি গোল্লাছুট, হাডুডু, ডাংগুলি, কানামাছি ইত্যাদি চিরায়ত লোকায়ত খেলাধুলা তো আছেই। উদ্যোক্তার অভাবও তেমন নেই। অনেক গ্রামেই ছোট-বড় শিল্পপতি এবং প্রবাসী আয়-উপার্জন আছে। গণমানুষকে নিয়মিত বিভিন্ন খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করা গেলে নির্মল আনন্দ-বিনোদনের পাশাপাশি সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদ-মাদক ইত্যাদির ছোবল থেকে সুরক্ষা সম্ভব হবে তরুণদের। এতে করে নতুন নতুন প্রতিভাও উঠে আসবে সুনিশ্চিত।