সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে?


প্রাইম ডেস্ক :

হৃদয় কাদামাটির কোনো মূর্তি নয় আঘাত দিলে ভেঙে যাবে, মন উড়ন্ত কোনো বেলুন নয় হুল ফোটালেই চুপসে যাবে। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, মনের মানুষ ছেড়ে চলে যাওয়া, ভঙ্গ হৃদয়- এরকম ঘটনা প্রায় সবার জীবনেই ঘটে। আর তখন মনে হয় ‘নিঃস্ব’, পৃথিবীটা আমার নয়।

হৃদয় ভঙ্গের কষ্টের মতো ব্যাপার কমই আছে। আমার সর্বশেষ হৃদয় ভঙ্গের ঘটনাটি ঘটেছিল ঠিক এক বছর আগে। আমার ক্ষেত্রে, সারাজীবন কাটানোর মতো প্রতিশ্রুতি থাকা একটি ভালোবাসার হঠাৎ করেই পরিসমাপ্তি হয়ে যায়। আমি যাকে ভালোবাসতাম তার সঙ্গে একত্রে থাকার কথা ছিল। কিন্তু সেই সময় তার মন বদলে যায়। এ ঘটনায় আমি এতটাই আঘাত পেয়েছিলাম যে, মনে হয়েছিল আর কখনো আমি আগের মতো হতে পারবো না।

সম্পর্ক ভঙ্গ
সম্পর্ক ভেঙ্গে যাওয়া আমার জন্য নতুন নয়। এ ধরণের ঘটনায় আমি যা করি তাও নতুন কিছু নয়: বাইরে যাওয়া, মদ্যপান করা, পুরনো স্মৃতি ভোলার চেষ্টা করা ইত্যাদি।

কিন্তু সবসময়েই এসব ব্যর্থ ওষুধ প্রমাণিত হয়েছে, কারণ আপনি আসলে কখনোই স্মৃতিগুলো ভুলতে পারবেন না। পুরোপুরি নয়।
সুতরাং গত বছর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম ভিন্ন কিছু করার। ৩২ বছর বয়সে আমি লন্ডন ছেড়ে – যেখানে আমি আমার জীবনের গত ২৭টি বছর কাটিয়েছি- গ্রামের দিকে চলে গেলাম। যখন আমি পুরনো সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার লড়াই করছি, তখন আমার ভয় হচ্ছিল যে, এই শহরে থাকলে হয়তো বাস, রাস্তা, যেকোনো মোড়ে হয়তো আমার সাবেক প্রেমিকের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে- যা মেনে নেয়া অসম্ভব হবে। খবর বিবিসি বাংলা

আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, এই শহরের বাইরে গিয়ে নতুন করে শুরু করতে পারলে আমি ঠিক হয়ে উঠতে পারবো। আমার হয়তো তত বেশি টাকা নেই (একটি সঞ্চয়ী হিসাবে কয়েক হাজার মাত্র পাউন্ড রয়েছে), কিন্তু আমার একটি পরিকল্পনা আছে এবং হিসাব করে খরচ করতে পারি, সুতরাং আমি চাইছিলাম যত বেশি দিন সম্ভব এটার ব্যবহার করতে।

পরের আট মাস ধরে আমি নিজেকে নিয়ে এমন একটি কাজে মগ্ন হয়ে ছিলাম-যাকে অন্য কথায় বলা যেতে পারে- ‘হৃদয়ের চিকিৎসা।’

আমি মাইলের পর মাইল হাঁটতাম। সাগরে সাঁতার কাটতাম। একা একা কাঁদতাম। আগের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতাম। তারপরেও এখনো সব কষ্ট কাটিয়ে উঠতে পারি নি। আমি উপলব্ধি করতে পারলাম, আমার মতো পুরোপুরি শহরে বড় হয়ে ওঠা একজন মানুষের কাছে গ্রামীণ জীবন একেবারেই আলাদা একটা ব্যাপার।

আমি ভাগ্যবতী যে, পরিবারের সমর্থন পেয়েছি। কিন্তু অনুভব করতে শুরু করলাম যে, আমার বন্ধুদের সঙ্গ পেতে ইচ্ছা করছে।

কিছুদিন পরে অনেকেই ফোন করা বন্ধ করে দিয়েছিল, কারণ সবার নিজেদের জীবনের ব্যস্ততা আছে, তাই না? অনেকে আসার কথা বললেও, পরে আর আসতে পারে নি। আগের চেয়েও আমি যেন বেশি একাকীত্ব বোধ করতে শুরু করলাম। তখন আমার একটি প্রশ্ন মনে হলো, ভালো ভাবে সম্পর্ক ছেদ করার মতো কিছু কি আছে? হৃদয় ভঙ্গের মতো ঘটনা ইতিবাচকভাবে সামলানোর কোন পন্থা কি আছে?

তখন আমার কাছে কোন পথ নির্দেশনা ছিল না। কিন্তু একবছর পরে, আমি এই লেখাটি লিখছি সেটাই খুঁজে বের করার জন্য।

হৃদয় ভঙ্গ কী?
”সহজ কথায় বলতে গেলে, এটা বিধ্বংসী আবেগী ক্ষতির মতো একটা ব্যাপার”,ব্যাখ্যা করছেন আচরণ বিষয়ক মনোরোগবিদ এবং সম্পর্ক বিষয়ক প্রশিক্ষক জো হেমিংস। ”আমাদের সবার জন্য আলাদা আলাদা হলেও, এটা হচ্ছে খারাপ লাগার তীব্র অনুভূতি, বিষাদ এবং এই কষ্ট কখনোই আর কাটিয়ে ওঠা যাবে না। এমন অনুভূতি প্রায় সবার হয়ে থাকে।”

”মস্তিষ্কের দিক বিবেচনা করলে, যে অংশটিতে শারীরিক কষ্টের অনুভূতি হয়ে থাকে, যখন কেউ সত্যিকারের ব্যথা পান, সেখানেই ঠিক একই রকম অনুভূতির তৈরি হয়। মাদকসেবীরা যখন মাদক না পায় (উইথড্রয়াল সিনড্রোম), তখন ঠিক এখানেই এ ধরণের অনুভূতির জন্ম হয়ে থাকে।”

আমার ক্ষেত্রে মনে হয়েছিল যে, আমার শরীরের ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে।

এ ধরণের অনুভূতি সামলানো সত্যিকারের একটা লড়াই। তখন এক ধরণের প্রলোভন বা উস্কানির মতো অনুভূতি হয়- যেমন সাবেক প্রেমিক বা প্রেমিকাকে আরেকবার ফোন করা, তার কাছে মিনতি করা, আপনি তার জন্য কি করেছেন বা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা মনে করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা- এ ধরণের অদম্য ইচ্ছা তৈরি হয়।

”আবেগের বিষয়গুলো চিন্তা করলে, একটি খারাপ সম্পর্ক ভঙ্গ আপনাকে বিষাদের পাঁচটি স্তরে নিয়ে যেতে পারে- মানতে না চাওয়া, রাগ, দর কষাকষি করা, বিষণ্ণতা এবং সবশেষে, মেনে নেয়া,” বলছেন জো।

কীভাবে হৃদয় ভঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসা যাবে

হৃদয় ভঙ্গের মতো ঘটনা সামলানো, আমার মতে, একটা শিল্প। কিন্তু এর মানে এই নয় যে আমাদের বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হতে হবে। বেশ কয়েকটি গবেষণায় বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে যে, আসলে কী ঘটে আর কীভাবে আমরা সেটি সামলাতে পারি। এক্সপেরিমেন্টাল সাইকোলজি জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে তিনটি পন্থা অনুসরণের চেষ্টা করা যেতে পারে: সাবেক সঙ্গীর খারাপ দিকগুলো নিয়ে চিন্তা করা, সাবেক সঙ্গীর জন্য ভালোবাসা থাকার ব্যাপারটি মেনে নেয়া আর সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক নেই, এমন ভালো কিছু চিন্তা করে নিজের মনোযোগ সরিয়ে রাখা।

যেহেতু কোনটাই পুরোপুরি আদর্শ নয়, দেখা গেছে এই তিনটি পন্থায় গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের সাবেক সঙ্গীকে নিয়ে আবেগ অনেকটাই কমে এসেছে। সুতরাং এই তিনটি পন্থা দিয়ে আবেগ সামলানোর কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে।

আপনি বলুন, ”আপনার সাবেক সঙ্গীর মুখ থেকে সকালে বাজে গন্ধ আসতো এবং অসভ্যের মতো গলা দিয়ে গরগর করে আওয়াজ করতো।”

এরপরে বলুন: ”ভালোবাসার মতো কেউ থাকা ভালো-এমনকি যদি সেই ব্যক্তি একজন অসভ্যও হয়।” এবং সবশেষে: “দেখুন তো আজকের আবহাওয়াটা এই মুহূর্তে চমৎকার না?”

সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডি হোমসের পরামর্শ অনুযায়ী আরেকটি ভালো উপায় দিয়ে শুরু করা যেতে পারে: ”নিজের জন্য খানিকটা বাজে সময় বরাদ্দ করুন। আমার মতে, কাজ থেকে একদিন ছুটি নেয়া খারাপ নয়- বিশেষ করে আপনি যদি মনঃকষ্টের ভেতর থাকেন, তাহলে সেটা অনেক নিরাপদ হবে, যদিও বিষয়টা আপনার কাজের ধরণের ওপর নির্ভর করে।”

”আপনার বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলুন এবং একটি ডায়রিতে লিখে রাখুন আপনার কেমন বোধ হচ্ছে,” তিনি বলছেন। ”কিন্তু এই আবেগকে আপনার জীবন নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ দেবেন না। এবং খুব তাড়াতাড়ি কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না।”

”আপনি হয়তো ভাবতে পারেন যে, আপনি এই ঘরে সাবেক সঙ্গীকে ছাড়া আর বেঁচে থাকতে পারবেন না। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, ঘরে জিনিসপত্র কিছুটা এদিক ওদিক করা বা দেয়ালে রঙ করলে আপনার মনে হতে পারে, না এখানে থাকা যায়।” জো পরামর্শ দিচ্ছেন, সাবেক সঙ্গীকে সামাজিক মাধ্যমে আন ফলো করে ফেলা: ”পুরনোর স্মৃতিগুলোকে মনে করিয়ে দেয়, এমন সব কিছু সামাজিক মাধ্যমে থেকে সরিয়ে ফেলুন। সেটা ছবি অথবা বার্তা যাই হোক।”

“এটা হয়তো নিষ্ঠুর শোনাতে পারে, কিন্তু মনকে সুস্থ করে তোলার জন্য এটা সত্যিই কাজ করে।” ”ফোন বা বার্তা পাঠাবেন না, বিশেষ করে রাতের বেলা। বার্তার খসড়া করতে পারেন, এবং সেটা মুছে ফেলুন। কিন্তু আপনার অনুভূতি গোপনে কোথাও লিখে রাখুন। কিন্তু সেটা পাঠাবেন না।”

বিষাদ বা বেদনার নানা স্তরের মধ্যে রাগ একটি বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। এটা ঠিক, প্রথমে রাগটা হয়তো আগ্নেয়গিরির মতো মনে হতে পারে। কিন্তু এই রাগের কিছু সুবিধাও আছে। যখন আপনি সিদ্ধান্ত নেবেন যে কাউকে সহ্য করতে পারছেন না, তখন তার শূন্যতাও কম মনে হবে। যদিও কোন কোন বিশেষজ্ঞ এর বিপরীত মনে করেন।

‘কীভাবে কাউকে ভুলবেন’ শিরোনামের একটি পরামর্শমূলক ভিডিওতে বলা হয়েছে, কাউকে ভোলার জন্য এটা ভাবা ঠিক নয় যে, তাকে আপনি কখনোই পছন্দ করেননি। বরং এটা বিশ্লেষণ করা যেতে পারে যে, তার ভেতর কী এমন ছিল যেটা আপনি পছন্দ করেছিলেন।

এরপরে নিজেকে জিজ্ঞেস করুন, ভবিষ্যৎ কোন সঙ্গীর ভেতর কি এই গুণগুলো পাওয়া যেতে পারে? তখন আমিও ভাবলাম, আমার সঙ্গীর ভেতরের কোন গুণটি আমি সবচেয়ে পছন্দ করতাম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, সে ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। কিন্তু এরকম আন্তরিক মানুষ কী পৃথিবীতে আর নেই? অবশ্যই আছে।

আমি দেখতে পেলাম এসব পন্থা আমার সাবেক সম্পর্কটি কাটিয়ে উঠতে খুব সহায়তা করছে। তবে সম্পর্ক ভাঙ্গার প্রথম দিকে ”সাগরে আরো অনেক মাছ আছে” থিওরি খুব বেশি কাজ করে না। যখন আপনাকে এটা কেউ বোঝানোর চেষ্টা করবে, তখন মনে হতে পারে যে, সে আসলে আপনার অনুভূতি বুঝতে পারছে না।

কিন্তু সময়ে সঙ্গে সঙ্গে এই ধারণাটি আরো বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হতে থাকবে যে, আমার সাবেক সঙ্গী আদর্শ ছিল না এবং তার যে বিষয়গুলো আমার কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল, সেটা অন্যদের মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে।

এসব পরামর্শকে একসাথে করলে একটি পরিকল্পনা দাঁড়াবে: আপনার অনুভূতির ব্যাপারটা মেনে নিন, নিজেকে শোক করতে দিন, পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করুন এবং যদি দরকার হয়, কাউন্সিলিং নিন।

একটি ডায়রি লিখুন, সামাজিক মাধ্যম এড়িয়ে চলুন, পুরনো কষ্টের ছবি বা বার্তাগুলো মুছে ফেলুন, নিজের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে রাখুন। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন না, সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে কোন যোগাযোগ করবেন না, তার খারাপ দিকগুলো নিয়ে ভাবুন। কিছুদিন পরে তার ভালো দিকগুলো ভাবুন এবং বিবেচনা করুন যে, এসব গুণ অন্য কারো মধ্যে পাওয়া যাবে কিনা। এবং সেটা পাওয়া আসলে কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে কতদিন লাগতে পারে?
“আপনি প্রেমের জন্য তাড়াহুড়ো করতে পারেন না” এটা হচ্ছে সুপ্রিমেসের একটি গান। কিন্তু দুঃখজনক হলো, সেই প্রেম কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রেও তাড়াহুড়া করা যাবে না।

একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, সম্পর্ক ভঙ্গের বিষয়টিকে ভালো ভাবে দেখার জন্য একজন ব্যক্তির প্রায় তিনমাস সময় লাগতে পারে।

আমি যেমনটা বলেছি, হৃদয় ভঙ্গ কোন বিজ্ঞানের বিষয় নয়। ব্যক্তিগতভাবে, আমার ক্ষেত্রে সামনে এগোনোর জন্য প্রস্তুত হতে ছয় মাস সময় লেগেছে। এ সময়ের মধ্যে আমি পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে গিয়েছি। অবাক করার ব্যাপার হলো – ভাগ্যও বলা যেতে পারে- নিজের ভেতর যে ব্যক্তিকে আমি খুঁজে পেয়েছি, সে অর্থবহ একটি সম্পর্কে বিশ্বাস করে। এরপর থেকে আমি সাবেক সঙ্গীর জন্য এর একফোঁটাও চোখের পানি ফেলি নি।

ব্যক্তিগত এই ঘটনায় আমি আমার মতামত হলো: হৃদয় ভঙ্গের বেদনা কাটিয়ে ওঠা একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং কঠিন বিষয়, যার কারণ এর সরলতা। তবে মজার ব্যাপার এবং এর সারাংশ হলো: এটা মনে করা যে আপনি ভালোবাসার যোগ্য একজন এবং কিছু সময়ের ভেতরেই আপনি আবার প্রেম খুঁজে পাবেন।