শনিবার, জানুয়ারি ১৬
Shadow

বাস্তবায়নই ইসির মূল চ্যালেঞ্জ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলসহ অধিকাংশ অংশীজনদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনারের (ইসি) সংলাপ শেষ। আজ নারী নেত্রী ও আগামীকাল সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে দুটি সংলাপ রয়েছে। এ দুটি হয়ে গেলেই আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে অংশীজনদের কাছে থেকে ইসির পরামর্শ নেওয়ার এই সংলাপ আয়োজন।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে গত ৩১ জুলাই ইসির এবারের সংলাপ শুরু হয়। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের বাইরে বিরোধী দল বিএনপিসহ ইসি নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেছে ইসি। গতকাল অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংলাপ। এর মাঝখানে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করে ইসি।

যদিও সংলাপে আলোচনার জন্য ঘোষিত নির্বাচনী রোডম্যাপ অনুযায়ী সাতটি বিষয় নির্ধারণ করে দিয়েছিল ইসি; কিন্তু সে সংখ্যা ও বিষয়ের বাইরে আরো অনেক বিষয়েও প্রস্তাব রেখেছেন অংশীজনরা। একদিকে যেমন ইসির এখতিয়ারবহির্ভূত অনেকগুলো বিষয়ে প্রস্তাব এসেছে, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কয়েকটি ইস্যুতে বিপরীতমুখী প্রস্তাবও এসেছে। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বলেছেন অংশীজনরা। এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ) তৈরির তাগিদ এসেছে।

বিশেষ করে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দিকেই নজর ছিল সবার। নির্বাচনী নানা ইস্যুতে শুরু থেকেই মুখোমুখি অবস্থান নেওয়া দল দুটি সংলাপেও তাদের পাল্টাপাল্টি অবস্থান অব্যাহত রেখেছে। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বিরোধ রয়েছেই। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইসির এখতিয়ারভুক্ত সেনা মোতায়েন, ইভিএম ব্যবহার ও সীমানা পুনর্নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোও। অথচ বিরোধপূর্ণ নানা ইস্যু সমাধান করে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব করেছে সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন অংশীজনরা।

অবশ্য সংলাপ শেষে এই দুই দল ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি প্রকাশ পেয়েছে। সিইসির বক্তব্য শুনতে শুনতে ক্ষমতাসীন নেতাদের অনেকের মুখে স্বস্তির হাসি দেখা গেছে। নির্বাচন কমিশনের সামনে এগিয়ে যেতে ও সুষ্ঠু ভোট অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সুপারিশ কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সিইসি। একইভাবে বিএনপির সঙ্গে সংলাপ করতে পেরে ‘অত্যন্ত খুশি’ সিইসি। এবার দলটি নির্বাচনে অংশ নেবে বলেও আশা করছেন তিনি। সংলাপকে আশা হিসেবেই দেখছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একইভাবে ২০০৮ সালের পর এটিএম শামসুল হুদা ও কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ নেতৃত্বাধীন ইসির কোনো ডাকে সাড়া না দেওয়া বিএনপির এই সংলাপে অংশগ্রহণকে রাজনীতিতে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। এ নিয়ে নানা প্রশ্ন এখন রাজনীতিতে। সংলাপে উঠে আসা পরস্পরবিরোধী প্রস্তাবগুলো কিভাবে পূরণ হবে এবং এসব প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সব দলকে কিভাবে আস্থায় নেবে ইসি; সেদিকেই তাকিয়ে সবাই। যদিও সবগুলো প্রস্তাবের ব্যাপারেই সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপি না বেঁকে বসে-এমন ভাবনা যেমন রয়েছে; তেমনি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির মতো এখতিয়ারবহির্ভূত সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ক্ষমতাসীনদেরই বা কিভাবে আস্থায় রাখবে, সে নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করাই এখন ইসির মূল চ্যালেঞ্জ। এসব প্রস্তাবের যুক্তিযুক্ত সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে আগামী নির্বাচনের ভবিষ্যৎ।

এমন পরিপ্রেক্ষিতে ইসি কি করতে পারে-জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, ইসির কাজ হবে প্রস্তাবগুলো সমন্বয় করে অভিন্ন প্রস্তাবে রূপ দেওয়া ও বাস্তবায়ন করা। এখতিয়ারভুক্ত প্রস্তাবগুলোর ক্ষেত্রে তেমন বেগ পেতে হবে না। কিন্তু এখতিয়ারবহির্ভূত বলে কোনো প্রস্তাবকে এড়িয়ে গেলেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে ইসিকে। কমিশনের দায়িত্ব হচ্ছে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। সব দলকে, বিশেষ করে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজই ইসিকে করতে হবে। তাদের এখতিয়ারের বাইরে কিছু থাকলে সেটা করিয়ে নিতে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হবে। আলোচনা করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

অবশ্য প্রথম সংলাপ শেষেই সিইসি করণীয় বর্ণনা করেছেন। সুশীল সমাজের সঙ্গে সংলাপ শেষে সেদিন তিনি জানান, সংলাপে উঠে আসা বিষয়গুলো নিয়ে ইসি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবে। এখতিয়ারের মধ্যে যেগুলো পূরণ করা যায় করবে; বাকিগুলো নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করবে। সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া পদ্ধতি অনুযায়ীই নির্বাচন করবে ইসি। তবে সংলাপ চলাকালে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মধ্যস্থতা করার দায়িত্ব ইসির নয়; সিইসির এমন মন্তব্য আলোচনার ঝড় তোলে নানা মহলে। অবশ্য সংলাপের শেষে বিএনপি নির্বাচনে আসবে-সিইসির এমন মন্তব্য আশা জাগিয়েছে সুষ্ঠু নির্বাচনে।

সংলাপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান পরিষ্কার হয়েছে। সীমানা পুনর্নির্ধারণ, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণ, নির্বাচনকালীন সরকার, সংসদ বহাল বা ভেঙে দেওয়া এবং সেনা মোতায়েন ইস্যুতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ দলগুলো বিপরীতমুখী প্রস্তাব দিয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েনের পক্ষে প্রস্তাব করেছে বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন না করার প্রস্তাব করেছে আওয়ামী লীগসহ ছয়টি দল। নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির স্বার্থে সংসদ ভেঙে ভোট গ্রহণের দাবি করেছে ১৮টি দল। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনের পক্ষে মত দিয়েছে নয়টি দল।

ইভিএমে ভোটগ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছে আওয়ামী লীগসহ বেশ কয়েকটি দল। অন্যদিকে বিএনপিসহ মিত্র দলগুলো ইভিএমে ভোট গ্রহণের বিপক্ষে অবস্থান জানিয়েছে। সংসদ নির্বাচনের সময় অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক সরকার থাকার প্রস্তাব করেছে জাতীয় পার্টিসহ ১২টি রাজনৈতিক দল। ওই সরকারে আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপির প্রতিনিধিত্ব রাখার পক্ষে মত দিয়েছে কয়েকটি দল। অন্যদিকে বিএনপিসহ ১১টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি জানিয়েছে। এ ছাড়া সংলাপে নির্বাচন আইন আরপিও সংশোধন, নির্বাচনের সময়ে স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ দফতরগুলো ইসির অধীনে রাখার প্রস্তাব করেছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল। অন্যদিকে সংলাপে সবার আস্থা অর্জনে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করে নির্বাচন কমিশনের ভাবমর্যাদা পুনরুদ্ধারের পরামর্শ দেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। ভোটে কালোটাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার ঠেকাতে ইসির ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার করে একাদশ সংসদ নির্বাচন ভয়মুক্ত ও সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

এমন অবস্থায় কী করতে পারে ইসি-জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, কিভাবে নির্বাচন হবে, সেটি কিন্তু সংবিধানের ১১৮ থেকে ১২৬ অনুচ্ছেদের মধ্যে রয়েছে। নির্বাহী বিভাগ ইসিকে সহযোগিতা করবে। এটি তাদের দায়িত্ব নয়, কর্তব্য। করতেই হবে। নতুবা অপরাধ বলে গণ্য হবে। ইসি স্বাধীনভাবে তার দায়িত্ব পালন করবে। সংবিধানেই বলা আছে, নির্বাচনের সময় কী ধরনের সরকার হবে। সেনা মোতায়েন হবে কি না-তা বর্তমান আরপিওতে উল্লেখ রয়েছে। সুতরাং সংলাপে যেসব প্রস্তাব এসেছে, সেগুলো পরস্পরবিরোধী হতে পারে, কিন্তু সংবিধানবহির্ভূত নয়। সুতরাং উদ্বেগের কিছু নেই। তবে সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। মনে রাখতে হবে, নির্বাচনের সময় সরকার হবে ছোট ও ইসি হবে বড়। ব্যস, তবেই সব সমাধান।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দীর্ঘ এ সংলাপের ফলাফল নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের ওপর। অংশীজনরা প্রস্তাব দিয়েছেন। ইসি তাদের কথা শুনেছে। এখন তাদেরই দায়িত্ব সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন করা। তার পরিপ্রেক্ষিতে এখন তারা (নির্বাচন কমিশন) সিদ্ধান নেবে কোনগুলো তারা গ্রহণ করবে, কোনগুলো করবে না। সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু পরিবর্তনের জন্য সরকারকে অনুরোধ করতে পারে। যেগুলো তারা নিজেরা কিছু পরিবর্তন করতে পাওে, সেগুলো তাদের করতে হবে। কোনগুলো গ্রহণ করলে, কোনগুলো পরিবর্তন করলে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে; এ ব্যাপারে তাদের (নির্বাচন কমিশন) সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নির্বাচন কমিশনের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে ও নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া তাদের এখতিয়ারে না। আবার সেনা মোতায়েনে আরপিও ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ আইন সংশোধনের দায়িত্ব সংসদের। এসব ব্যাপারে ইসি কিছু করতে পারবে না। কিন্তু ইসি যদি মনে করে এগুলো ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হবে না, তাহলে তারা সরকারকে বলতে পারে। বাকিটা সরকারের দায়িত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published.