প্রবাসীদের ভোট

সিঙ্গাপুরে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের ভোটার করার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) উদ্যোগ প্রশংসাযোগ্য। তবে ইসির জনবল যে সিঙ্গাপুরে গিয়ে কাজ করবে সে বিষয়ে দেশটির কাছ থেকে এখনও কোন সবুজ সঙ্কেত পাওয়া যায়নি। সে কারণেই বিষয়টির সুরাহা হয়নি। অর্থাৎ সেখানকার বাংলাদেশী নাগরিকদের ভোটার হওয়ার আশা পূরণ হয়নি। শুধু সিঙ্গাপুর নয়, বিশ্বের বহু দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের এখন পর্যন্ত ভোটার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। এটি প্রবাসীদের জন্য মনোপীড়ার কারণ। প্রাথমিকভাবে ইসি দশটি দেশের প্রবাসীদের ভোটার করার কাজ শুরু করেছে।

চলতি বছরের শুরুতে দিল্লীতে ‘নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহজগম্যকরণ’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অবশ্য আশার বাণী শুনিয়েছিলেন। প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর জন্য সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাতে অফিস স্থাপন করা হবে, এমন বক্তব্য আশাজাগানিয়া। বিশ্বের ১৬০টি দেশে সোয়া কোটির মতো প্রবাসী বাংলাদেশী রয়েছেন, যাদের ভোটার তালিকা এবং জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে এখনও বিশেষ সাফল্য আসেনি। গত বছর প্রবাসীদের ভোটার কার্যক্রমের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ইসির একাধিক প্রতিনিধিদল সিঙ্গাপুর সফর করেন। সিদ্ধান্ত ছিল এ বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ভোটার করার কাজ শুরু হবে। কিন্তু সিঙ্গাপুর সরকারের অনুমতি না মেলায় তা এখনও শুরু করা সম্ভব হয়নি। এজন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। ইসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের পর সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশে গিয়ে সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের ভোটার করা হবে। তবে এটি যেন মশা মারতে কামান দাগা না হয়। প্রবাসীদের সুবিধা বিবেচনা করে ভোটার হওয়ার জন্য অনলাইনেও আবেদনপত্র নেয়া হবে। দেশে আসার পর ১০ আঙ্গুলের ছাপ ও চোখের মণির ছবি নেয়ার পর তারা স্মার্ট কার্ড নিতে পারবেন। আর যারা অনলাইনে আবেদন করবেন না তাদের সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে গিয়ে ভোটার হতে হবে। প্রবাসীদের ভোটার করার জন্য এটিই হতে পারে ব্যয়সাশ্রয়ী উত্তম পদ্ধতি। জাতীয় সংসদের ৩০০ নির্বাচনী এলাকায় গড়ে প্রায় ২৫ হাজার করে প্রবাসী রয়েছেন, পুরো জনসংখ্যার ৫-৬ শতাংশ। নোয়াখালী, কুমিল্লা, সিলেট, শরীয়তপুরসহ কিছু জেলায় প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা বিপুল। ওই সব এলাকার নির্বাচনকে অধিকতর প্রতিনিধিত্বশীল করতে প্রবাসীদের নির্বাচনে সম্পৃক্ত করা জরুরী। এতে নির্বাচন অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও জবাবদিহিমূলক হবে বলেই পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা। তাছাড়া এটা সংবিধানসম্মতও।

বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রবাসীদের অংশভাগ এখন প্রায় ৮ শতাংশ। সর্বশেষ অর্থবছরে প্রবাসীরা প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন। আমরা গৌরবের সঙ্গে উচ্চারণ করে থাকি, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রাণভোমরা প্রবাসীদের আয়। প্রায় অধিকাংশ প্রবাসীর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ বিনিয়োগও আছে দেশে। যাদের রক্ত-ঘামে একটি দেশের অর্থনৈতিক সুরক্ষা, নীতিনির্ধারণেও তাদের অভিমত থাকাই সঙ্গত। আর দেরি নয়, এখন থেকেই সক্রিয় হতে হবে যাতে বিদেশে অবস্থানকারী প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ প্রবাসে অবস্থান করেও সংসদ নির্বাচনসহ অন্যান্য নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রসরতার এই যুগে বিষয়টি ঝুলে থাকা এবং দীর্ঘসূত্রতায় পর্যবসিত হওয়া মোটেও কাজের কথা নয়। এ বিষয়ে আমরা নির্বাচন কমিশনের আন্তরিক সক্রিয়তা প্রত্যাশা করছি।