গভীর ষড়যন্ত্র

ভোলার বোরহানউদ্দিনের ঘটনাটি অনাকাক্সিক্ষত ও দুঃখজনক। মূলত রাতারাতি গজিয়ে ওঠা ‘সাধারণ তৌহিদী জনতার’ ব্যানারে বিশাল সমাবেশকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে এবং অকস্মাৎ পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা থেকে এর সূত্রপাত। আরও যা দুঃখজনক ও অগ্রহণযোগ্য তা হলো, এটিও শুরু হয়েছে ফেসবুকে নবীকে (সা.) অবমাননার অভিযোগে, যা পরে প্রমাণ হয়েছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভুয়া হিসেবে। স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক যুবক বোরহানউদ্দিন থানায় তার ফেসবুক একাউন্ট হ্যাকড হয়েছে বলে অভিযোগ করতে যায়। এ সময় থানায় অবস্থানরত যুবকটির সেলফোনে কল আসে, যেটির মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্ল্যাকমেল করা। এ সময় তার কাছে টাকা তথা চাঁদা দাবি করা হয়। অন্যথায় ফেসবুকে ধর্ম অবমাননাসহ হুমকি-ধমকি দেয়া হয়। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে শনাক্ত করে একাধিক হুমকিদাতাকে গ্রেফতার করে। এই ঘটনাটি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে পড়ে ফেসবুকের মাধ্যমে। স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীও মসজিদের মাইকে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালায়, যার পেছনে ছিল জামায়াত-বিএনপি-ছাত্রদল-শিবির। অতঃপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তৌহিদী জনতার ব্যানারে সভা ডাকা হয় স্থানীয় ঈদগাহ মাঠে। সেখানে এসপিসহ পুলিশও উপস্থিত ছিল। সভা মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হলেও হঠাৎ একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতা মারমুখী হয়ে ওঠে এবং আক্রমণ করে পুলিশের ওপর। প্রাণভয়ে ভীত পুলিশ স্থানীয় মসজিদ-মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েও স্বস্তি পায়নি। অতঃপর শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে গুলিবর্ষণ করলে নিহত হয় চারজন এবং আহত হয় ১০ পুলিশসহ শতাধিক। তবে দু’জনের মাথা ছিল ভোতা কিছু দিয়ে থেঁতলানো। অর্থাৎ এটা পুলিশের নয়, অন্য কারও অপকর্ম। উত্তেজনাসহ জনতার ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রশমনে জরুরীভিত্তিতে বিজিবি মোতায়েনসহ র‌্যাব-পুলিশ পাঠানো হয়েছে ঘটনাস্থলে। পাশাপাশি শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় আলাপ-আলোচনাও চলছে। ছয় দফা দাবি আদায়ে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে সর্বদলীয় মুসলিম ঐক্য পরিষদ। থানায় মামলাও হয়েছে অজ্ঞাত কয়েক হাজার ব্যক্তিকে আসামি করে।

ফেসবুকে ধর্ম অবমাননা করার গুজব রটিয়ে দেশে এর আগেও বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, লুটপাটসহ বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের রামুতে ব্যাপক হামলা চালিয়ে ১২টি বৌদ্ধ মন্দির ও একটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে একদল দুর্বৃত্ত। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংখ্যালঘু এক মৎস্যজীবীর বিরুদ্ধেও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ এনে লোকজনকে খেপিয়ে তুলে স্থানীয় মন্দির ও বাড়িঘরে হামরা চালানো হয়। বোরহানউদ্দিনের ঘটনাটি বলা যায় অনুরূপ। প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং প্রশ্ন তুলেছেন, একজন সংখ্যালঘুর আইডি হ্যাক করে টাকা না পেয়ে মুসলিম হয়েও কীভাবে মহানবী সম্পর্কে খারাপ কথা লিখে অন্যকে ফাঁসায়? ঘটনাটি যথাযথ তদন্তসাপেক্ষে প্রকৃত দোষীদের গ্রেফতারসহ শাস্তির দাবি রাখে অবশ্যই। হাইকোর্ট এ ঘটনাকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছে।

ফেসবুকের ভাল-মন্দ উভয়ই আছে। প্রযুক্তির সুফলই বেশি কুফলের তুলনায় এ কথা স্বীকার করতে হবে। তবে কিছু অপব্যবহারকারী ও অপরাধীর কারণে প্রযুক্তির কুফল তথা নেতিবাচক প্রচার-প্রচারণাই বেশি লক্ষ্য করা যায় দেশে। এর পাশাপাশি ভুয়া খবর, গুজব ছড়ানো, ছবি ও অপপ্রচার তো আছেই। এরকম কয়েকজনকে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে পুলিশ। ভোলার ঘটনায়ও পুলিশ তৎপর হয়েছে সঙ্গে সঙ্গেই। তদন্তের স্বার্থে ফেসবুকের কাছে আরও তথ্য চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুয়া আইডির ব্যাপারে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের নিকট রিপোর্ট করার সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তিকে প্রযুক্তি দিয়েই মোকাবেলা করা বাঞ্ছনীয়। তদুপরি দেশে বর্তমানে আইসিটি আইনের পর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রয়েছে। প্রয়োজনে তা প্রয়োগ করতে হবে। সাবধান ও সতর্ক থাকতে হবে ভুয়া খবর এবং ছবি সম্পর্কে, যাতে সমাজ এবং রাষ্ট্রে কোন অস্থিরতা সৃষ্টি না হতে পারে। আমরা ভোলার বোরহানউদ্দিনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই না।