নুসরাত হত্যার বিচার

স্বল্পতম সময়ের ভেতর আলোচিত নুসরাত হত্যার বিচার সুসম্পন্ন হওয়া এবং হত্যা সংঘটনে যুক্ত আসামি ষোলোজনের মৃত্যুদন্ডের রায় পাওয়া সমাজের জন্য স্বস্তিকর। এতে একদিকে যেমন সমাজ কলঙ্কমুক্ত হলো, অন্যদিকে তেমনি এই বার্তা স্পষ্টভাবে সর্বস্তরে পৌঁছে দেয়া হলো যে, দেশে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত রয়েছে। প্রসঙ্গত আদালতের পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে সেটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আদালত বলেছে, নারীত্বের মর্যাদা রক্ষায় নুসরাতের আত্মত্যাগ তাকে এরই মধ্যে অমরত্ব দিয়েছে। এই অমরত্ব চিরকালের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। পাশাপাশি আসামিদের ঔদ্ধত্য যুগে যুগে মানবতাকে লজ্জিত করবে।

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির ওপর পর্যায়ক্রমে অন্যায় ও নৃশংসতা সংঘটিত হওয়ার বিষয়টি জেনে কেঁপে উঠেছিল সমাজের মর্মমূল। নারীর ওপর নানা স্তরে নানা পদ্ধতিতে নিপীড়ন চলে এ সমাজে। কিন্তু নুসরাতের সঙ্গে যা হয়েছিল তা বোধ করি পূর্বেকার সকল নারী নিপীড়নের ঘটনার সঙ্গে তুলনায় বিশেষ ব্যতিক্রম এবং অত্যন্ত পৈশাচিক। এ কোন বর্বর সময় যখন একটি মেয়ের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়! নুসরাত ছিল প্রতিবাদী এবং আপোসহীন। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদদৌলা তার ওপর যৌন নিপীড়ন চালায়। নুসরাত তার প্রতিবাদ করে এবং পরিবারের অভিভাবক আইনগত ব্যবস্থা নেয়। নুসরাতের ওপর ওই মামলা তুলে নেয়ার প্রবল চাপ ছিল। কিন্তু নুসরাত আপোস করার মতো মেয়ে নয়। সে কঠোর অবস্থান নেয়। কুলাঙ্গারচক্র শেষ চেষ্টা চালায় নুসরাতকে দিয়ে মামলা প্রত্যাহারের। যখন তারা নিশ্চিত হয় যে, নুসরাতকে টলানো যাবে না তখনই তাকে আগুনে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়। অগ্নিদগ্ধ নুসরাতকে ঢাকায় নিয়ে এসে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেয়া হয়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তাকে সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে পাঠানোর নির্র্দেশও দেন। কিন্তু সে অবস্থা ছিল না নুসরাতের। অনেক কষ্ট পেয়ে ১০৮ ঘণ্টা লড়ে শেষ পর্যন্ত নুসরাত মারা যায়। এই মৃত্যুর কোন সান্ত¦না হয় না। তবে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নুসরাতের পরিবার ন্যায়বিচার পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছে। এতে সমাজের ওপর থেকেও পাথরভার কিছুটা লাঘব হলো।

নুসরাত হত্যার সুবিচার দাবিতে আমরা সম্পাদকীয়তে সুস্পষ্ট জোরালো ভাষায় অভিমত রেখে বলেছিলাম, মূল অপরাধী সিরাজউদদৗলা। তবে শুধু তার নয়, বিচার করতে হবে যারা নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়েছে তাদের সবার। কারণ এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকা-। আমাদের জন্য এটি স্বস্তিকর যে, ৩৩ কর্মদিবসে তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে মাত্র ৬১ কার্যদিবসে রায় পাওয়া গেল। অবশ্য প্রাপ্ত রায়ের কার্যকারিতা বিষয়ে চূড়ান্ত রায় দেবে উচ্চ আদালত। আইনমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, উচ্চ আদালতেও এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, সেখানেও ন্যায়বিচার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

নুসরাতের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করেছিলেন। যে কোন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই হয়েছিলেন শোকগ্রস্ত। শুধু শোক প্রকাশ করে নয়, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে এদেশ থেকে নারী নির্যাতন চিরতরে দূর করা চাই। নুসরাতের হত্যাকারীদের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলেই মানুষ স্বস্তি বোধ করবে। আমরা পুনরায় বলতে চাই, একজন শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থী হবেন সন্তানতুল্য। সেই সন্তানের ওপর কুদৃষ্টি যারা দেয় এবং যৌন নিপীড়ন করে, তারা শিক্ষকের মতো মর্যাদাপূর্ণ পদে থাকতে পারে না। দেশের প্রতিটি শিক্ষালয়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শিক্ষার্থী-শিক্ষক সবার সম্মিলিতভাবে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার, যাতে করে অনৈতিক আচরণ করার কোন ধরনের সাহস কেউ না পায়। নুসরাতের আত্মার চিরশান্তির জন্য হত্যাকারীদের শাস্তির সমান্তরালে এই সামাজিক ব্যাধি নিরাময়ের দিকটিতেও আমাদের বিশেষ দৃষ্টি দেয়া চাই।