শনিবার, জানুয়ারি ১৬
Shadow

সবুজ অরণ্যে আলী পেপারের থাবা

আ. আজিজ :

ভাওয়াল পরগনার শ্রীপুর উপজেলার টেংরা, সাইটালিয়া, সাতখামাইর, পেলাইদ ও তেলিহাটি মৌজার প্রায় হাজার একর জমি নিয়ে সমৃদ্ধ ছিল সাইটমনিগড় (স্থানীয় নাম)। সংরক্ষিত এই বনাঞ্চল জুড়ে ছিল বিভিন্ন প্রানীর অভয়াশ্রম। বনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল বিভিন্ন জাতের উদ্ভিদ। এদের তালিকায় অনেক ছিল আবার বিলুপ্ত। উপজেলা জুড়েই বিশুদ্ধ অক্সিজেন সরবরাহের কারখানা ভাবা হত এই সংরক্ষিত বনকে। তবে কালের স্বাক্ষী এই বনের বিশুদ্ধ পরিবেশের হুমকী হয়ে উঠেছে স্থানীয় আলী পেপার মিলস নামের এক কারখানার কারনে।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের তালতলী পূর্বপাড়া এলাকায় আলী পেপার মিলের কালো ধোঁয়ায় পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। কালো ধোঁয়ায় কারখানার আশপাশে গাছপালা নষ্ট হয়ে গেছে, কমে গেছে পশুপাখির আনাগোনা, পরিবেশ হারাচ্ছে তার ভারসাম্য।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জৈনা বাজার থেকে পূর্ব দিকের ১৪কিলোমিটারের পাঁকা সড়কটি বরমী বাজারে গিয়ে মিলেছে। সড়কটিতে প্রবেশ করলেই দু’পাশের অসংখ্য সবুজ গাছগাছালির বিশুদ্ধ ঠান্ডা বাতাস ও পাথির কলরবে মন ছুঁয়ে যায়। তালতলী বাজার থেকে দরগারচালা পর্যন্ত চার কিলোমিটার এলাকা জুড়েই রয়েছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এই সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে আলী পেপার মিল নামের একটি কারখানা।

কারখানায় কাগজ উৎপাদনে ব্যবহৃত বয়লারের কারনে সৃষ্টি হয় কালো ধোঁয়ার। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কারখানা হতে অনবরত বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া ও হাওয়ায় বর্জ্য(ছাই)। এতে কারখানার আশপাশে গাছগুলোতে মরক ধরেছে।সম্প্রতি কমে গেছে বন্য প্রাণী ও পাখির উপস্থিতি। কমে গেছে আশপাশের কৃষকের ফসল উৎপাদন। কৃষিকাজে আগ্রহ হারাচ্ছে অনেকেই।

সাইটালিয়া গ্রামের গৃহবধু আমেনা আক্তার জানান, শুনছি একটা এলাকায় মিল-কারখানা হলে এলাকা উন্নত হয়। আর এই কারখানাটি আমাদের এলাকাকে ধ্বংস করছে। কারখানার কালো ধোঁয়া ও ধোঁয়ার সাথে নির্গত কালি আমাদের ঘরে ঢুকে। এতে বিছানার চাদর ও ঘরের জিনিসপত্র নষ্ট হয়। ঠিক মত আমরা খাওয়া দাওয়া করতে পারিনা।

তালতলী মুরগীর বাজার এলাকার কৃষক আব্দুল কাদের লালমিয়া জানান, কারখানার ধোঁয়ার সাথে নির্গত কালি আমাদের খেত ও ফসলের উপর গিয়ে পড়ে। কোন ধরনের সবজি চাষ করতে পারি না। যখন ধোঁয়া পরিবেশে ছাড়া হয় তখন ঠিক মতো নি:শ্বাস নেয়া যায় না। এছাড়াও কারখানার নির্গত ধোঁয়ার সাথে ছাই বের হয়ে কয়েক কিলোমিটার এলাকা বিবর্ন হয়ে পড়েছে। গবাদি পশুর খাবারও সংকট তৈরী হয়েছে।

তালতলী পূর্বপাড়া গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘাষের উপর কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত ক্যামিকেল ছড়িয়ে পড়ায় গবাদি পশুর জন্য বিপদজনক পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। ঘাষের উপর জমে থাকা ছাই খেয়ে তার একটি গাভী সম্প্রতি মারা যায়। এলাকার অনেক গবাদি পশু অসুস্থ হচ্ছে আলী পেপারের থাবায়। স্থানীয়ভাবে বসবাসকৃত সাধারন মানুষও নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

তেলিহাটি ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নং ওয়ার্ড সদস্য নাসির উদ্দিন জানান, এই পেপার মিলের কারনে কয়েক কিলোমিটার এলাকার পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের। একসময়ের সবুজ অরন্য এখন বিবর্ন হয়ে স্থানীয় পরিবেশ বিষাক্ত হয় পড়ছে কারখানা হতে নির্গত কালো ধোঁয়া ও বর্জ্যরে কারনে। আমরা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে মৌখিক ভাবে সতর্ক করলেও তারা কর্নপাত করেনি, তাই এখন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নোটিশ দেয়ার প্রক্রিয়া চালাচ্ছি।

সংরক্ষিত বনের পাশে গড়ে উঠা এই কারখানা হতে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া ও হাওয়াই বর্জ্য সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছাড়াও স্থাানীয় পরিবেশের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন শ্রীপুর ফরেস্ট রেঞ্জার আনিছুর রহমান। তিনি আরো জানান,এই বিষয়টি দেখার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। আমরা তাদের বিষয়টি অবহিত করেছে।

গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষনা কর্মকর্তা (রিসার্চ অফিসার) আশরাফ উদ্দিন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে পরিবেশ তার ভারসাম্য হারাচ্ছে, আবার কেউ কৃত্তিমভাবে পরিবেশ ধ্বংস করছে। পরিবেশের উপর হুমকী তৈরী করা এই কারখানায় শিগ্রই অভিযান পরিচালনা করা হবে।

পরিবেশের উপর হুমকী তৈরী করা আলী পেপার মিলস নামের কারখানার ব্যবস্থাপক অমিত সাহা জানান, ধানের খোসা থেকে নির্গত তুষ দিয়ে কারখানার বয়লার চালানো হয়্, এতে তৈরী হয় ধোঁয়া। তবে স্থানীয় কেউ আমাদের সমস্যা হওয়ার বিষয়টি এখনও অবহিত করেনি। তাছাড়া বয়লার চালাতে গেলে ধোঁয়ার সৃষ্টি হবেই। তবে তার দাবী কারখানাটি গড়ে তোলার জন্য ছাড়পত্র দিয়েছে খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরই।