সোমবার, জুন ১
Shadow

বঙ্গবন্ধুর আদর্শ

জাঁকজমকপূর্ণ ও বর্ণাঢ্য লেজার শোর মাধ্যমে এবার দেশব্যাপী পালিত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। অবশ্য এর যৌক্তিক কারণও আছে বৈকি। চলতি বছরের ১৭ মার্চ সাড়ম্বরে দেশে ও বিশ্বব্যাপী পালিত হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। এ উপলক্ষে সেদিন থেকে আয়োজন করা হবে নানা উৎসব আয়োজন-অনুষ্ঠান। এর পরের বছরই পালিত হবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অমল ধবল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব। এ বিষয়ে দ্বিমতের কোন অবকাশ নেই যে, বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ সর্বোপরি স্বাধীনতা এক সূত্রে গাঁথা, মূলত এক ও অভিন্ন, অবিচ্ছিন্ন ও চিরকালীন। বিশ্বের বুকে যতদিন বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতি সগর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে, ততদিন বৈশ্বিক ইতিহাস থেকে জাতির পিতার নাম-ঠিকানা মুছে ফেলা যাবে না। বরং লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে, যা জ্বল জ্বল করে প্রজ্বলিত থাকবে চিরদিন, চিরকাল, অনন্তকালব্যাপী। আর তাই বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে উপলক্ষ করে বছরব্যাপী নানা পরিকল্পনাসহ ব্যাপক উৎসব আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আরও যেটি শ্লাঘার বিষয় তা হলো, জাতিসংঘের অঙ্গ সংস্থা ইউনেস্কো বছরব্যাপী এই আয়োজনে আনুষ্ঠানিকভাবে একেবারে প্রস্তাব পাস করে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ যুগপৎ বাংলাদেশসহ পালিত হবে বিশ্বব্যাপী ১৯০টি সদস্যভুক্ত দেশে। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গৌরবের ও গর্বের। উল্লেখ্য, ইউনেস্কো ইতোমধ্যেই বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ তথা স্বাধীনতার ঘোষণাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম স্মারক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।

সঙ্গত কারণেই এবার বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনটিকে উপলক্ষ করে শুরু হয় আসন্ন জন্মশতবর্ষের ক্ষণগণনা। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ল্যাপটপের বোতাম টিপে সারাদেশে স্থাপিত ৮৩টি ডিজিটাল ঘড়ির মাধ্যমে শুরু করেন কাউন্টডাউন। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস পাকিস্তানের সামরিক জান্তার কারাগারের অন্ধকার নির্জন প্রকোষ্ঠে বন্দী ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁকে প্রতি মুহূর্তে নিশ্চিত অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে ইতিহাসে কুখ্যাত সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়ার তথাকথিত কোর্ট মার্শালের নামে ক্যামেরা ট্রায়াল তথা ফাঁসির রজ্জুর। তবে বঙ্গবন্ধু বরাবরই ছিলেন নির্ভীক, অকুতোভয়, দুঃসাহসী ও মৃত্যু ভয়হীন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পরাজয় ও বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষরের পর ভারত- সোভিয়েত ইউনিয়ন-যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক মহলের প্রবল চাপে বঙ্গবন্ধুকে শর্তহীন মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সামরিক জান্তা। আর বঙ্গবন্ধু সদর্পে-সগর্বে বিজয়ীর বেশে লন্ডন-দিল্লী হয়ে দেশের মাটিতে অবতরণ করেন ঐতিহাসিক ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে। স্বদেশে বাংলাদেশে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু কিন্তু তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যাননি। বরং উপস্থিত হয়েছিলেন ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে, যেখানে তিনি দিয়েছিলেন ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ তথা স্বাধীনতার ডাক। স্বদেশে ফিরেও তাই বঙ্গবন্ধু সর্বাগ্রে ফিরে গিয়েছিলেন আম জনতার দরবারে। তিনি ডাক দিয়েছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের। সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে আহ্বান জানিয়েছিলেন রাস্তাঘাট-বাড়িঘর পুনর্নির্মাণের। তিনি গরিব কৃষক, শ্রমিক দিনমজুর সর্বোপরি সাধারণ মানুষের কথা ভেবেছেন। তাদের দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীভূত করার কথা বলেছেন। বন্ধ কলকারখানায় শিল্প উৎপাদনের আহ্বান জানিয়েছেন। সর্বোপরি দেশ ও জাতিকে স্বল্পকালের মধ্যেই উপহার দিয়েছেন একটি সংবিধান। যার মূলমন্ত্র গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। তবে দুঃখজনক হলো দেশ ও স্বাধীনতাবিরোধী একটি কুচক্রী মহলের কারণে বঙ্গবন্ধু তার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। খুনী মোশতাক-জিয়ার প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের কারণে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে জীবন দিতে হয় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট। দেশের ইতিহাস ও ভবিষ্যত নিক্ষিপ্ত হয় প্রায়ন্ধকারে। তবে বঙ্গবন্ধুর চির আকাক্সক্ষা ও অভিলাষ ছিল সর্বদাই আলোর পথে অভিযাত্রা। আর তাই ইতিহাসের আমোঘ নিয়মে কুচক্রী মহল খুনী মোশতাক-জিয়া-খালেদার দুঃশাসন তথা অমানিশার অনিবার্য অবসান ঘটে। বঙ্গবন্ধু প্রজ্বলিত ইতিহাসের আলোর মশাল হাতে তুলে নেন তারই সুযোগ্য কন্যা তিন তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়নে যিনি আন্তরিক ও বদ্ধপরিকর। বর্তমানে বৈশ্বিক মানচিত্রে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃত। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মশাল হাতে নিয়েই স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা- জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী যার চলার পথের পাথেয়।