মঙ্গলবার, এপ্রিল ২০
Shadow

বিশ্বের নজর এখন ‘রিয়াদে গৃহবন্দি’ লেবাননের প্রধানমন্ত্রীর দিকে

প্রাইম আন্তর্জাতিক :

এ বছরের নভেম্বরের গোড়ার দিকে আকস্মিকভাবে বিদেশ সফরে যান লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি। প্রথমে এটিকে তার রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক সৌদি আরবে প্রধানমন্ত্রীর রুটিন সফর হিসেবেই দেখা হয়েছিল। কিন্তু একদিনের মাথায় দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে। সৌদি রাজপরিবারে ব্যাপক ধরপাকড়ের মধ্যেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন দেশটিতে সফররত লেবানিজ প্রধানমন্ত্রী। টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে তিনি এ ঘোষণা দেন। এখন পর্যন্ত নিজ দেশে ফেরেননি সাদ হারিরি।

লেবাননে সাদ হারিরি’র জোট সরকারের শরিক দল শিয়াপন্থী সংগঠন হিজবুল্লাহ। শুক্রবার তারা অভিযোগ করেছে, সৌদি সরকার লেবানিজ প্রধানমন্ত্রীকে বলপূর্বক আটকে রেখেছে। তবে এমন বক্তব্য অস্বীকার করে সৌদি আরব বলছে, তারা একটি হত্যার ষড়যন্ত্র থেকে সাদ হারিরি’কে সুরক্ষা দিচ্ছে।

সৌদি আরবে লেবাননের প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে এমন ঘটনা বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির নাগরিকদের লেবানন ছাড়ার নির্দেশ দেয়। একইসঙ্গে নতুন করে কাউকে লেবানন সফরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভ্রমণ সতর্কতার অংশ হিসেবে সৌদি কর্তৃপক্ষের এমন ঘোষণার পর একই রকমের ঘোষণা দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত।

সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, লেবাননের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেশটিতে সফররত বা বসবাসরত নাগরিকদের যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। দেশটিতে আয়োজিত কোনও আন্তর্জাতিক আয়োজনেও সৌদি নাগরিকদের অংশ না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতে এ অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকে। সামরিক সংঘাতের প্রান্তে পৌঁছে যায় মধ্যপ্রাচ্য।

সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে শুক্রবার সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। হিজবুল্লাহ, সৌদি আরব ও ইরানের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, লেবাননের ভেতরের বা বাইরের কোনও পক্ষের বিরুদ্ধে দেশটিতে ছায়া যুদ্ধ লেবাননকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।

এমনকি গত সপ্তাহে সংঘটিত ঘটনাবলীর আগেও এ অঞ্চলের বিশ্লেষকরা একটি আসন্ন অস্থিরতায় ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাদের উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিল উত্তেজনার বশে তরুণ সৌদি যুবরাজ ইরানের হুমকি বা প্রভাব বলয় মোকাবিলায় রগচটা ট্রাম্প প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে পারেন। কেননা, এরইমধ্যে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে হিজবুল্লাহ’র বিরুদ্ধে আরেকটি যুদ্ধের হুমকি এসেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্লেষক এবং কূটনীতিকরা নতুন বাস্তবতা কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন? এরইমধ্যে কিছু বিশ্লেষক একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। এখনকার পরিস্থিতিকে সেই লড়াইয়েরই একটা অংশ বলে মনে করছেন তারা।

আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে সৌদি আরব সফরে গিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া লেবাননের প্রধানমন্ত্রী রিয়াদে পৌঁছানোর আগ পর্যন্তও এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলে কেউ ধারণাও করতে পারেনি। দৃশ্যত সাদ হারিরি’র দিক থেকে অন্তত এমন কোনও পরিকল্পনা দেখা যায়নি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট বলছে, ৩ নভেম্বর ২০১৭ শুক্রবার সন্ধ্যায় লেবানিজ প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানটি রিয়াদে অবতরণের সঙ্গে সঙ্গেই এটি ঘিরে ফেলে সৌদি পুলিশ সদস্যরা। একদল পুলিশ সদস্য বিমানে উঠে তার মোবাইল ফোনটি জব্দ করে। সরিয়ে ফেলা হয় তার দেহরক্ষীদের। পরদিন শনিবার ইরান ও হিজবুল্লাহ’র পক্ষ থেকে নিজের প্রাণনাশের হুমকির কথা জানিয়ে তিনি লেবানিজ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এরপর থেকেই তিনি নিমজ্জিত হয়েছেন পিনপতন নিরবতায়।

আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে সফরে গিয়ে তার এ পদত্যাগের ঘোষণার ঘণ্টাখানেকের মাথায় সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের শিয়াপন্থী হুথি বিদ্রোহীরা। রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে বোরকান এইচ-২ নামের ওই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি নিক্ষেপ করা হয়। ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসন শুরুর পর রিয়াদে হুথিদের এটাই প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। তবে ওই ক্ষেপণাস্ত্রটি মাঝ আকাশে ধ্বংস করার দাবি করেছে সৌদি আরব। রিয়াদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ ঘটনা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।

কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালানো হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের জন্য ইরান এবং দেশটির লেবানিজ মিত্র হিজবুল্লাহকে দায়ী করে রিয়াদ। এ ব্যাপারে সৌদি দাবির প্রতি সমর্থন দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। এ ঘটনায় ইরানে বিরুদ্ধে জাতিসংঘকে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানায় যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিকি হ্যালি বলেন, জুলাইয়ে সৌদি আরবে নিক্ষেপ করা হুথিদের মিসাইলও ইরানের তৈরি ছিলো। সাম্প্রতিক এই হামলার সঙ্গেও তারা জড়িত থাকতে পারে। ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের এই অস্ত্র সরবরাহ করে ইরানের রেভ্যুলশনারি গার্ড জাতিসংঘের নিয়ম ভঙ্গ করছে। আমরা জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সহযোগীদের এই শৃঙ্খলা ভঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানাই।

ইয়েমেন-লেবাননকে ইরানবিরোধী ‘ছায়াযুদ্ধের নাট্যমঞ্চ’বানিয়ে সৌদি আরবের এ খেলা প্রত্যক্ষ করার আগেই দৃশ্যপটে আসে সৌদি রাজপরিবারের সদস্য ও দেশটির শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের ধরপাকড়ের বিষয়টি। ৪ নভেম্বর রাতে রাজপরিবারের অন্তত ১১ সদস্যকে আটক করা হয়। এ পর্যন্ত আটকের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে ধনকুবের  আল-ওয়ালিদ বিন তালাল এবং তার মেয়ে প্রিন্সেস রিম বিনতে আল-ওয়ালিদ’ও রয়েছেন। জব্দ করা হয়েছে সাবেক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। তার ঘনিষ্ঠ স্বজনদের অ্যাকাউন্টও জব্দ করে কর্তৃপক্ষ। ২০১৭ সালের জুনে এই মোহাম্মদ বিন নায়েফ’কে হটিয়ে নতুন যুবরাজের দায়িত্ব নেন বর্তমান রাজার পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমান। গৃহবন্দি হন নায়েফ।

এরমধ্যেই রহস্যজনক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হন রাজপরিবারের প্রভাবশালী সদস্য ও আসির প্রদেশের গভর্নর প্রিন্স মানসুর বিন মাকরিন। সারা দেশে জব্দ করা হয় অন্তত ১২ হাজার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। সবগুলো ঘটনায় সামনে আসে সৌদি আরবে বর্তমানে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচ্চাভিলাষী এবং আক্রমণাত্মক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নাম। যুবরাজের দাবি, তিনি দেশে সংস্কার করতে চান। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, তিনি আসলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চান। নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েমের পথে যাদেরই অন্তরায় বলে মনে করছেন; তাদেরই তিনি সরিয়ে দিচ্ছেন।

সৌদি রাজপরিবারে এই ধরপাকড়ের সপ্তাহখানেক আগেই রিয়াদ সফর করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার। যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল ও সৌদি আরব সংক্রান্ত মিশনের দায়িত্ব দিয়ে তাকে এ সফরে পাঠানো হয়। ইহুদি ধর্মাবলম্বী জ্যারেড কুশনারকে সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরায়েলের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম মনে করা হয়। সফরে ভোর পর্যন্ত সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন জ্যারেড কুশনার। তবে তাদের এ আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, ইসরায়েল-ফিলিস্তিনকে একটি শান্তি চুক্তিতে আনার ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রচেষ্টার বিষয়ে তাদের কথা হয়েছে।

টুইটারে দেওয়া এক পোস্টে সৌদি রাজপরিবারের সদস্যদের ধরপাকড়ের ব্যাপারে নিজের সমর্থনের কথা জানান ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ভাষায়, ‘সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান ও যুবরাজের ওপর আমার ব্যাপক আস্থা রয়েছে। তারা যা করছেন তা যথার্থভাবেই বুঝেশুনে করছেন। যাদের প্রতি তারা এখন কঠোর হয়েছেন ওই লোকগুলো বছরের পর বছর ধরে তাদের দেশকে চুষে খাচ্ছে।’

২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে সৌদি আরব। এ যুদ্ধে ১০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের খাদ্য এবং কৃষি সংস্থা বলছে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন এখন দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। দুই বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের কারণে দেশটির অন্তত ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের হুমকির মুখে পড়েছেন। এ যুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি আর সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির বাইরে এখন পর্যন্ত সৌদি আরবের উল্লেখযোগ্য কোনও অর্জন নেই বললেই চলে। ফলে তারা নতুন করে এখন লেবাননের সঙ্গে আরেকটি জড়িয়ে পড়ুক-এটা কেউই চাইবে না।

লেবাননের শিয়াপন্থী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ’র সঙ্গে যুদ্ধের অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে ইসরায়েলের। ২০০৬ সালের ওই যুদ্ধে তেল আবিবের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর ছিল না। ইসরায়েলের উদ্বেগের জায়গা হচ্ছে তাদের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তে হিজবুল্লাহ’র অস্ত্রাগার তথা ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি জোরদারের বিষয়টি।

১০ নভেম্বর শুক্রবার এক ভাষণে হিজবুল্লাহ মহাসচিব হাসান নাসরুল্লাহ বলেন, লেবাননে সামরিক আগ্রাসন চালাতে সৌদি আরব ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে তারা কোটি কোটি ডলার খরচ করতে প্রস্তুত রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হিজবুল্লাহ’র বিরুদ্ধে যুদ্ধের অজুহাতে সৌদি আরব লেবাননকে ধ্বংস করতে চায়। এই সৌদি আরবই ছিল ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রধান কারিগর। আমাদের কাছে এ সংক্রান্ত তথ্য আছে।

হিজবুল্লাহ মহাসচিব তার এ বক্তব্যের সমর্থনে সুনির্দিষ্ট কোনও প্রমাণ দেননি। তবে পশ্চিমা ও আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ইতোপূর্বে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যেই হিজবুল্লাহ’র সঙ্গে দেশটির আরেকটি যুদ্ধে জড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। একইসঙ্গে তারা সংঘাত এড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছিলেন।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই পারমাণবিক শক্তিধর ইরানকে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মনে করেন। সিরিয়া বা লেবাননের হিজবুল্লাহ’র ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা নিয়েও তেল আবিবের ওপর কৌশলগতভাবে চাপ তৈরির সুযোগ রয়েছে ইরানের। মধ্যপ্রাচ্যে এই ইরানের প্রভাব বলয় কমাতে দীর্ঘদিন ধরেই সোচ্চার সৌদি আরব। সাম্প্রতিক সময়ে তারা লেবাননে তেহরানের প্রভাব কমাতে আরও উদ্যোগী হয়েছে। ইসরায়েলের জন্য নিঃসন্দেহে এটি রীতিমতো উচ্ছ্বসিত হওয়ার মতো একটি খবর।

এই উচ্ছ্বাসের অবশ্য উল্টো পিঠও রয়েছে। কারণ অনেক ইসরায়েলি নাগরিক চান না তেল আবিব নতুন কোনও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক। তাদের আশঙ্কা, উচ্চাভিলাষী সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের আগ্রাসী কর্মকাণ্ড শেষ পর্যন্ত হয়তো ইসরায়েলকেও এই যুদ্ধের দিকে ধাবিত করবে।

ইসরায়েলি নিযুক্ত একজন সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শাপিরো। তিনি বলেন, ইসরায়েল ও সৌদি আরব লক্ষ্য এক হলেও সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে দুই দেশের গতি এবং দক্ষতা মাত্রার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কৌশলগতভাবে তারা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত কিনা; সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই।  তবে এক্ষেত্রে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে অতিমাত্রায় উৎসাহী মনে হচ্ছে।

ইসরায়েল যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে; এমন কোনও লক্ষণ এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তে তাদের কোনও সেনা সমাবেশ করতেও দেখা যায়নি। রিজার্ভ সেনাদেরও ডাক পড়েনি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এমন কোনও ইঙ্গিত দেননি।

ইসরায়েলি যুদ্ধ পরিকল্পনাবিদ বা সমর বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হিজবুল্লাহ’র সঙ্গে তাদের পরবর্তী লড়াই হবে একটি সর্বনাশা যুদ্ধ। বিশেষ করে যুদ্ধ যদি কয়েকদিনের বেশি সময় পর্যন্ত গড়িয়ে যায়; সেটা হবে বিপদজনক। এই মুহূর্তে হিজবুল্লাহ’র হাতে এক লাখ ২০ হাজারের বেশি রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। ইসরায়েলের আশঙ্কা, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে এটিই যথেষ্ট। কেননা এসব ক্ষেপণাস্ত্রের অনেকগুলোই খুব মানসম্পন্ন ও দীর্ঘ পাল্লার। এসব ক্ষেপণাস্ত্র তেল আবিবের বহুতল ভবনগুলোকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে সক্ষম। উপকূলীয় অঞ্চলের গ্যাস লাইনগুলোকেও তারা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে। ঝুঁকিমুক্ত নয় তেল আবিবের বেন গুরিয়েন বিমানবন্দরও। আর দীর্ঘমেয়াদে পুর্ণ মাত্রার যুদ্ধ বাধলে পুরো ইসরায়েলকেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে হিজবুল্লাহ। সেটা তারা করতে পারলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও অনেক বেশি হবে।

ইসরায়েলের একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এবং দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাবেক প্রধান গিয়োরা এইল্যান্ড। তিনি বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে হিজবুল্লাহ’র সংঘাত অপরিহার্য নয়। সিরিয়ায় তারা এখনও লড়াই করছে এবং সেখানে দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে। আহত সদস্যদের চিকিৎসার ব্যয় বহন, নিহতদের পরিবারকে সুযোগ সুবিধা দেওয়ার মতো বিষয়গুলো নিয়ে তারা এমনিতেই অর্থনৈতিকভাবে বিপাকে আছে। তাদের এখন মারাত্মক রকমের অর্থনৈতিক দুর্দশা যাচ্ছে। কিন্তু একইসঙ্গে এটাও ঠিক যে, হিজবুল্লাহ যতটা দুর্বল হচ্ছে সেটা তাদের ইরানের প্রতি আরও নির্ভরশীল করে তুলছে। ফলে তাদের ইরানের নির্দেশ মেনে চলতে হবে।

হিজবুল্লাহ নিয়ে ভয়ের আরেক কারণ সিরিয়ার দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধে আসাদের উতরে যাওয়ার নেপথ্যে একটা বড় কারণ এই হিজবুল্লাহ। তারা সেখানে নিজেদের যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো জায়গায় নিয়ে গেছে। ফলে তাদের প্রভাব বাড়ছে। হাতে আসছে বাড়তি ক্ষমতা, বাড়তি অস্ত্র।

শুক্রবার দেওয়া ভাষণে সিরিয়া পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন হিজবুল্লাহ মহাসচিব হাসান নাসরুল্লাহ। তিনি বলেন, সিরিয়ার হিজবুল্লাহ’র যুদ্ধ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সৌদি আরবের উদ্দেশ্য যদি হয় সিরিয়া থেকে আমাদের বিতাড়িত করা তাহলে কোনও সমস্যা নেই। কারণ ইতোমধ্যে সেখানে আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে।

উত্তেজনা নিরসনে কাজ করছেন বিশ্বনেতারা

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা কমাতে অনির্ধারিত সফরে হঠাৎ করেই বৃহস্পতিবার সৌদি আরব সফরে যান ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। দুই ঘণ্টার এই সফরে তিনি সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। এ বৈঠকের বিষয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্টের দফতর থেকে বিস্তারিত জানানো হয়নি। তবে তারা জানিয়েছে, লেবাননের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার গুরুত্বের বিষয়টি ফ্রান্স পুনর্ব্যক্ত করছে। সাদ হারিরি’র পদত্যাগ পরবর্তী লিবিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট কথা বলেছেন।

দুবাইয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ বলেছেন, ইরানের ব্যাপারে সৌদি আরবের কঠোর মনোভাব সম্পর্কে তিনি কথা বলতে আগ্রহী নন।

লেবাননের স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করে এমন দেশগুলোর একদল প্রতিনিধি শুক্রবার দেশটির প্রেসিডেন্ট মিশেল আউনের সঙ্গে দেখা করেছেন। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, রাশিয়াসহ ইন্টারন্যাশনাল সাপোর্ট গ্রুপ ফর লেবানন-এর সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা এই বৈঠকে অংশ নেন। এক বিবৃতিতে তারা লেবাননের বর্তমান পরিস্থিতি এবং বিদ্যমান অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ সময় তারা এ অঞ্চলের উত্তেজনা থেকে লেবাননের পরিত্রাণ কামনা করেন।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ-এর সামরিক প্রতিবেদক আমোস হ্যারেল। তিনি বলেন, এখনকার পরিস্থিতি খুবই মারাত্মক। এক পক্ষ উস্কানি দিলেই অন্যপক্ষও তাতে সাড়া দেয়। হঠাৎ করে এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সৌদি আরব স্পষ্টতই ইরানে হামলা চালাতে চায়। আপনি যখন তাদের সঙ্গে যোগ দেবেন তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে। সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, ইন্ডিপেনডেন্ট।

Leave a Reply

Your email address will not be published.