শুক্রবার, জানুয়ারি ১৫
Shadow

প্রধান বিচারপতি সিনহার পদত্যাগ

নানা নাটকীয় ঘটনার পর অবশেষে পদত্যাগ করেছেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। দুর্নীতি ও অর্থ পাচারসহ ১১ অভিযোগ মাথায় নিয়ে দেশের বাইরে অবস্থানরত প্রধান বিচারপতি সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে তার পদত্যাগপত্র বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পাঠান। শনিবার সিনহার পদত্যাগপত্র পাওয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মোঃ জয়নাল আবেদীন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ নিয়ে ২১ জন প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করলেও পদত্যাগের ঘটনা এটাই প্রথম। ফলে রাষ্ট্রের তিন স্তম্ভের একটির প্রধান ব্যক্তির এই পদত্যাগ ৪৭ বছরের বাংলাদেশকে নতুন একটি অভিজ্ঞতার মুখে দাঁড় করাল।

সিনহাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হলেও তা উড়িয়ে দিয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জল ঘোলা না করার পরামর্শ দেন। সংবিধান অনুযায়ী নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাই প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানান আইনমন্ত্রী। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম জানান, এখন সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন।

২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেয়ার আগেই যুদ্ধাপরাধের একটি মামলার শুনানিতে একাত্তরে নিজের শান্তি কমিটির সদস্য থাকার কথা তুলে ধরে আলোচনায় আসেন বিচারপতি সিনহা। তারপর প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়ে বিচার বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করার অভিযোগ নানা সময় তুলে আলোচনার জন্ম দেন তিনি। নিম্ন আদালতের বিচারক নিয়োগের প্রজ্ঞাপন নিয়ে তার সঙ্গে সরকারের সঙ্গে তার বিরোধ হয় আলোচিত। এরপর সুপ্রীমকোর্ট প্রাঙ্গণে ভাস্কর্য স্থাপন নিয়েও সরকারের সঙ্গে টানাপোড়েন চলে বিচারপতি সিনহার। তার শেষ বিতর্কের শুরু সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে, যা প্রথমে ছুটি এবং শেষে পদত্যাগে গিয়ে শেষ হলো। ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি অবসর গ্রহণের কথা থাকলেও দুর্নীতি ও অর্থ পাচারসহ ১১ অভিযোগ মাথায় নিয়ে তিন মাস আগেই পদ ছাড়লেন তিনি।

চলতি ২০১৭ সালের জুলাই মাসে ষোড়শ সংশোধনীর আপীলের রায় প্রকাশের পর থেকে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনায় ছিলেন বিচারপতি সিনহা। পরের মাসে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর তাতে বিচারপতি সিনহার ৪০০ পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণ দেখে শুরু হয় ব্যাপক বিতর্ক। সাবেক প্রধান বিচারপতি ও বর্তমানে আইন কমিশনের সদস্য বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকও বলেন, এই রায় ‘ভ্রমাত্মক’। ওই পর্যবেক্ষণে সংসদ ও সরকার এবং জাতির জনককে খাটো করা হয়েছে অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগের দাবি তোলেন আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা। তবে বিএনপি প্রধান বিচারপতির পক্ষেই দাঁড়িয়েছিল। সংসদে আলোচনা এবং তীব্র আক্রমণের প্রেক্ষাপটে খবর আসে প্রধান বিচারপতির ছুটিতে যাওয়ার।

সমালোচনার মধ্যেই ১ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের কাছে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা হঠাৎই এক মাসের ছুটির কথা জানিয়ে চিঠি দেন। পরের দিন আপীল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়। আইনমন্ত্রী জানান, প্রধান বিচারপতি ক্যান্সারে আক্রান্ত। পরে ১১ অক্টোবর চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতির এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার ছুটি ১০ নবেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।

গত ১৩ অক্টোবর রাতে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন প্রধান বিচারপতি। দেশ ছাড়ার আগে প্রধান বিচারপতি তার বাসভবনের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি অসুস্থ নই। বিচার বিভাগের স্বার্থে ফিরে আসব। ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে একটি মহল প্রধানমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়েছেন।’ তিনি একটি লিখিত বিবৃতিও সাংবাদিকদের দিয়ে যান। পরের দিন ১৪ অক্টোবর সুপ্রীমকোর্ট প্রশাসন থেকে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ ওঠার পর তার কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে কোন সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এ কারণে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসতে চাননি আপীল বিভাগের বিচারপতিরা। এ অবস্থায় প্রধান বিচারপতির দেশে ফেরা নিয়ে ধূ¤্রজালের সৃষ্টি হয়।

গত সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়া থেকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসার জন্য আসেন বিচারপতি সিনহা। সেখান থেকে সিঙ্গাপুর হয়ে শুক্রবার কানাডায় ছোট মেয়ের বাড়িতে যাওয়ার আগে সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে তার পদত্যাগের খবর আলোচনায় এলেও সরকারের পক্ষ থেকে তা নিশ্চিত করা হচ্ছিল না। শনিবার সকালে সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিচারপতি সিনহার পদত্যাগপত্র দেশে না পৌঁছার কথা বলেন। দুপুরে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও সাংবাদিকদের প্রশ্নে বলেন, তার কাছে কোন খবর নেই। তার কিছুক্ষণের মধ্যে বঙ্গভবন থেকে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার পদত্যাগপত্র পাওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়। দুপুর সোয়া ১টায় রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মোঃ জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘উনার পদত্যাগপত্র আজই (শনিবার) বঙ্গভবনে এসেছে।’

নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগে বিলম্ব হতে পারে : প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগের পর নতুন করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে কয়েক দিন বিলম্ব হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। সূত্র জানায়, নিয়ম অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির পদত্যাগপত্র সুপ্রীমকোর্ট থেকে আইন মন্ত্রণালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে যাওয়ার কথা। তবে বিচারপতি সিনহা তার পদত্যাগপত্রটি সরাসরি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন। সূত্র জানায়, এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় প্রধান বিচারপতির পদত্যাগপত্রটি বিষয়ে পরামর্শের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাবেন। প্রধানমন্ত্রী তার পরামর্শ দিয়ে একইভাবে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমেই রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পাঠাবেন। এরপর রাষ্ট্রপতি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন।

ওয়াহ্হাব মিঞাই দায়িত্বে: আইনমন্ত্রী : সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাই এখন প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী এ্যাডভোকেট আনিসুল হক। শনিবার বিকেলে গুলশানে তার নিজ বাসায় সাংবাদিকদের এ কথা জানান তিনি। প্রধান বিচারপতির পদত্যাগে কোন শূন্যতা সৃষ্টি হয়নি বলেও মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত দায়িত্বে আছেন অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা। প্রধান বিচারপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার পরও যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি নতুন একজনকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ না দিচ্ছেন, ৯৭ অনুচ্ছেদ বলে ততক্ষণ পর্যন্ত অস্থায়ী প্রধান বিচারপতি থাকবেন মোঃ আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা।’ আইনমন্ত্রী বলেন, পদ যদি শূন্যও হয়ে থাকে, রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রয়োগ করবেন ততক্ষণ পর্যন্ত ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কাজ হবে, কোন শূন্যতার সৃষ্টি হয়নি। পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে করা প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে, কেউ আইনের উর্ধে নয়।

প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রধান বিচারপতি নিজে অসুস্থতার কারণে প্রথমে ছুটি নিয়েছেন। তারপরে আমিও হতভম্ব হয়েছি যে তিনি বললেন, সুস্থ আছেন। আইনমন্ত্রী বলেন, তিনি বিদেশ চলে গেলেন। বিদেশ থেকে তিনি (পদত্যাগ) পত্র পাঠিয়েছেন সেখানে আমরা তাকে জোর করব কোত্থেকে? বিদেশে তো আমরা পিস কিপিং ফোর্স পাঠাইনি, পাঠিয়েছি? সুতরাং এগুলো হচ্ছে অবাস্তব বক্তব্য। যারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চান তারা হয়ত এসব কথা বলেন। আমি তাদেরকে শুধু বলব- পানি অত্যন্ত স্বচ্ছ, সেখানে মাছ শিকার করার কোন উপায় নেই।

সংবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন রাষ্ট্রপতি: এ্যাটর্নি জেনারেল ॥ রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম বলেছেন, এখন সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন। সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হইলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে প্রধান বিচারপতি তাহার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ বলিয়া রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হইলে ক্ষেত্রমত অন্য কোনো ব্যক্তি অনুরূপ পদে যোগদান না করা পর্যন্ত কিংবা প্রধান বিচারপতি স্বীয় কার্যভার পুনরায় গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপীল বিভাগের অন্যান্য বিচারকের মধ্যে যিনি কর্মে প্রবীণতম, তিনি অনুরূপ কার্যভার পালন করিবেন।’

এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘প্রধান বিচারিপতি নিয়োগ হলে তো শপথ নিতেই হবে। ভারপ্রাপ্ত যিনি আছেন বা যিনি আসবেন, তাকে শপথ নিতে হবে না।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সংবিধানে এটা নাই যে, প্রধান বিচারপতি পদত্যাগ করলে কত দিনের মধ্যে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে।’

সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সংবাদ সম্মেলন : প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা কিভাবে পদত্যাগ করলেন, তা জানতে চান সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যানও। শনিবার সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে সাংবাদিকদের মাধ্যমে সরকারের কাছে এর জবাব চেয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা শনিবার সকালে সংবাদমাধ্যমে জেনেছি প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়া থেকে কানাডা গেছেন। এ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, আমরা (সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতি) রাজনৈতিক মতাদর্শের উর্ধে থেকে সব সময় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছি। বিচার বিভাগের সম্মান রক্ষার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকেই স্বাধীন বিচার বিভাগের ওপর বারবার হস্তক্ষেপ করা হয়েছে, যা বিচার বিভাগের প্রতি দেশবাসীর আস্থা ও বিশ্বাসকে দুর্বল করছে। উল্লেখ্য, সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটিতে বিএনপি-জামায়াত সমর্থকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।

ষোড়শ সংশোধনীর পর্যবেক্ষণ নিয়ে সমালোচনা : উচ্চ আদালতের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিয়ে করা সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় প্রকাশিত হয় ১ আগস্ট। ওই রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও সরকার সমর্থক আইনজীবীরা প্রধান বিচারপতির তীব্র সমালোচনা শুরু করেন। তার পদত্যাগের দাবি ওঠান কেউ কেউ। সরকার সমর্থক আইনজীবীরা পদত্যাগের আল্টিমেটামও দেন। পাশাপাশি রায়ে প্রধান বিচারপতির দেয়া পর্যবেক্ষণও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রত্যাহারের দাবি জানান। তবে বিএনপিসহ কিছু দল এ রায়কে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য দেয়।

হঠাৎ ছুটির আবেদন : ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর্যবেক্ষণ নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই সুপ্রীমকোর্টের অবকাশ চলাকালে ৮ সেপ্টেম্বর রাতে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা কানাডার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন। সেখানে তার ছোট মেয়ের বাসায় ছিলেন। এর পর ১৮ সেপ্টেম্বর জাপানের টোকিওতে অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার রাষ্ট্রগুলোর প্রধান বিচারপতিদের সম্মেলনে যোগ দেন। সম্মেলন চলে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এর পর ২৪ সেপ্টেম্বর প্রধান বিচারপতি দেশে ফেরেন। এর পর অবকাশ শেষে ৩ অক্টোবর থেকে সুপ্রীমকোর্ট চালু হওয়ার আগের দিন ২ অক্টোবর হঠাৎ করেই এক মাসের ছুটিতে যান। তিনি আবেদনে ৩ অক্টোবর থেকে ১ নবেম্বর পর্যন্ত ছুটিতে যাওয়ার কথা জানান রাষ্ট্রপতিকে। পরে ৪ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি অসুস্থ, ক্যান্সারে আক্রান্ত। এটা নিয়ে রাজনীতির কিছু নেই। আসুন আমরা সবাই মিলে প্রধান বিচারপতির সুস্থতার জন্য দোয়া করি।’

এর পর ১০ অক্টোবর প্রধান বিচারপতির ব্যক্তিগত সহকারীর বরাত দিয়ে সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগের রেজিস্ট্রার জাকির হোসেন আইন মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি লেখেন। তাতে বলা হয়, প্রধান বিচারপতি বিশ্রামের জন্য ১৩ অক্টোবর থেকে ১০ নবেম্বর পর্যন্ত বিদেশে থাকতে চান। ১১ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ওই ছুটি বৃদ্ধির আবেদনে সই করেন। পরদিন আইন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার ১০ নবেম্বর দেশে ফেরা অথবা স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত আপীল বিভাগের কর্মে প্রবীণতম বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির কার্যভার পালনের দায়িত্ব প্রদান করেন।

অসুস্থ নই, আবার ফিরে আসব : ১৩ অক্টোবর রাতে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। ওই দিন রাতে তার হেয়ার রোডের বাসভবনের সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি অসুস্থ নই। আমি চলে যাচ্ছি। আমি পালিয়ে যাচ্ছি না। আবার ফিরে আসব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি একটু বিব্রত। আমি বিচার বিভাগের অভিভাবক। বিচার বিভাগ যাতে কলুষিত না হয় সেজন্যই সাময়িকভাবে যাচ্ছি। বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকুক এটাই আমি চাই। কারও প্রতি আমার বিরাগ নেই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সরকারকে ভুল বোঝানো হচ্ছে। আমি আর কিছু বলব না। আমি লিখিত বক্তব্য দিচ্ছি। ’

১১ অভিযোগ ও একসঙ্গে বসতে বিচারপতিদের অস্বীকৃতি : দেশ ছাড়ার পরের দিন সুপ্রীমকোর্ট প্রশাসন থেকে একটি বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ছুটি ভোগরত প্রধান বিচারপতি ১৩ অক্টোবর বিদেশ গমনের প্রাক্কালে একটি লিখিত বিবৃতি উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের নিকট হস্তান্তর করেন। বিবৃতিটি সুপ্রীমকোর্টের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বিবৃতিটি বিভ্রান্তিমূলক।’

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুপ্রীমকোর্টের বক্তব্য নিম্নরূপ : ‘গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ব্যতীত আপীল বিভাগের অন্য পাঁচ বিচারপতিকে বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ জানান। বিচারপতি মোঃ ইমান আলী দেশের বাইরে থাকায় ওই আমন্ত্রণে উপস্থিত থাকতে পারেননি। অপর চারজন অর্থাৎ বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী এবং বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাত করেন। দীর্ঘ আলোচনার একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার বিরুদ্ধে ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগসংবলিত দালিলিক তথ্য হস্তান্তর করেন। এর মধ্যে বিদেশে অর্থপাচার, আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈতিক স্খলনসহ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

বিচারপতি মোঃ ইমান আলী ঢাকায় ফেরার পর ১ অক্টোবর আপীল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি এক বৈঠকে মিলিত হয়ে ১১টি অভিযোগ (সংযুক্তিসহ) বিশদভাবে পর্যালোচনা করেন। এর পর সিদ্ধান্ত নেন, ওই সব গুরুতর অভিযোগ প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহাকে অবহিত করা হবে। তিনি যদি ওই সব অভিযোগের ব্যাপারে কোন সন্তোষজনক জবাব বা সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হন তাহলে তার সঙ্গে বিচারালয়ে বসে বিচারকার্য পরিচালনা সম্ভব হবে না। ওই সিদ্ধান্তের পর ওই দিনই বেলা সাড়ে ১১টায় প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার অনুমতি নিয়ে পাঁচজন বিচারপতি তার হেয়ার রোডের বাসভবনে তার সঙ্গে সাক্ষাত করে অভিযোগগুলো নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। দীর্ঘ আলোচনার পরও তার কাছ থেকে কোন গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বা সদুত্তর না পেয়ে আপীল বিভাগের পাঁচজন বিচারপতি তাকে সুস্পষ্ট করে জানিয়ে দেন, অভিযোগগুলোর সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে একই বেঞ্চে বিচারকার্য পরিচালনা সম্ভব হবে না। এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা বলেন, সেক্ষেত্রে তিনি পদত্যাগ করবেন। তবে এ ব্যাপারে পরের দিন ২ অক্টোবর তিনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন। ২ অক্টোবর তিনি আপীল বিভাগের বিচারপতিদের কোনকিছু না জানিয়েই রাষ্ট্রপতির কাছে এক মাসের ছুটির দরখাস্ত দিলে রাষ্ট্রপতি তা অনুমোদন করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.