সোমবার, জুন ১
Shadow

স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা

তোফায়েল আহমেদ :

আগামী বছর পালিত হবে মহান স্বাধীনতা দিবসের সুবর্ণ জয়ন্তী। এ বছর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ তথা ‘মুজিববর্ষ’ দেশব্যাপী সগৌরবে পালিত হচ্ছে। এরই মধ্যে দেখা দিয়েছে ‘করোনাভাইরাস’-এর প্রাদুর্ভাব! ফলত, ‘মুজিববর্ষ’ ও ‘স্বাধীনতা দিবস’-এর বহু অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে। ‘করোনাভাইরাস’ বিশ্বজুড়ে মহামারী আকার ধারণ করে মানব সভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এমনই এক ভয়াবহ বিপর্যয় আর নির্বিচার গণহত্যার কবলে আমরা পড়েছিলাম ১৯৭১-এর পঁচিশে মার্চ। তখন দৃশ্যমান ঘাতকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাঙালী জাতি ছিল ঐক্যবদ্ধ; আজ দৃশ্যমান নয়, এমন নীরব এক ঘাতক ‘করোনা ভাইরাস’-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সমগ্র মানবজাতি ঐক্যবদ্ধ। শত্রুকে পরাস্ত করতে ঐক্যের বিকল্প নেই।

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। বাইশে মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে প্রাক্তন বাঙালী সৈনিকদের সঙ্গে বৈঠকে কর্নেল ওসমানী সাহেব বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘ডু ইউ থিংক দ্যাট টুমরো উইল বি এ ক্রুসিয়াল ডে?’ বঙ্গবন্ধু জবাবে বলেন, ‘নো, আই থিংক, ইট উইল বি টুয়েন্টি ফিফথ্।’ তখন ওসমানী সাহেব পুনরায় প্রশ্ন করেন, ‘কাল তো তেইশে মার্চ। পাকিস্তান দিবস। সে উপলক্ষে ওরা কী কিছু করতে চাইবে না?’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ওরা যেকোন মুহূর্তে যেকোন কিছু করতে পারে। তার জন্য কোন দিবসের প্রয়োজন হয় না।’ নিখুঁত হিসাব করেই বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন পঁচিশে মার্চেই পাকিস্তানীরা ক্র্যাকডাউন করবে।

পঁচিশে মার্চ রাতে মণি ভাই (শেখ ফজলুল হক মণি) ও আমি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নেই। বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যখন যাচ্ছি, তখন রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড। সেগুনবাগিচার একটি প্রেসে মণি ভাই লিফলেট ছাপতে দিয়েছিলেন। সেগুনবাগিচা থেকে হেঁটে মণি ভাইয়ের আরামবাগস্থ বাসায় যাই। রাত বারোটায় জিরো আওয়ারে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী পূর্বপরিকল্পিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ অনুযায়ী শুরু করে বাঙালী নিধনে গণহত্যা। যা অখ- পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুঁকে দেয়। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবিকে সশস্ত্রপন্থায় নিশ্চিহ্ন করতেই এই গণহত্যা। চারদিকে প্রচ- বিস্ফোরণের শব্দ ছাপিয়ে আমার কানে তখন বাজছে বিদায় বেলায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ, ‘তোমাদের যে দায়িত্ব আমি দিয়েছি, সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন কর। আমার জন্য ভেব না। আমি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, আমার স্বপ্নের সেই বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই হবে। ওরা অত্যাচার করবে, নির্যাতন করবে। কিন্তু আমার বাংলাদেশের মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলার মানুষকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। যুদ্ধ শুরু হলে আমরা কোথায় যাবো কী করবো সে-ব্যাপারে করণীয় নির্দেশ করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘প্রস্তুত থেকো’; আঠারোই ফেব্রুয়ারি ঠিকানা মুখস্থ করিয়েছিলেন, ‘সানি ভিলা, ২১ নম্বর রাজেন্দ্র রোড, নর্দার্ন পার্ক, ভবানীপুর, কলকাতা।’ এখানেই তিনি আমাদের জন্য সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন।

একাত্তরের ছাব্বিশে মার্চ ছিল শুক্রবার। রাতে মণি ভাইয়ের বাসায় ছিলাম। সেখানেই শুনলাম বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সকালে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বেতার ভাষণে ইয়াহিয়া খান রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘সপ্তাহ খানেক আগেই আমার উচিত ছিল শেখ মুজিবুর রহমান ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কেননা কয়েকটি শর্ত দিয়ে সে আমাকে ট্র্যাপে ফেলতে চেয়েছিল। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সে আক্রমণ করেছে, এই অপরাধ বিনা শাস্তিতে যেতে দেওয়া হবে না।’ সাতাশে মার্চ দু’ঘন্টার জন্য কারফিউ প্রত্যাহৃত হলে, আমরা গুলিস্তান দিয়ে নবাবপুর রোড ধরে সদরঘাট গিয়ে কেরানিগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করি। পেছনে পড়ে থাকে ধ্বংস আর মৃত্যু উপত্যকাসম রক্তাক্ত ঢাকা নগরী। যাওয়ার সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দফায় দফায় প্রচারিত এমএ হান্নান সাহেবের ভাষণ শুনি, ‘কে বলে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়েছে? তিনি আমাদের মধ্যেই আছেন।’ সকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে হান্নান সাহেব এবং অন্যান্য নেতারা বিরামহীনভাবে ঘোষণা দিতে থাকেন, ‘বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে আমাদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।’ কেরানীগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা বোরহানউদ্দিন গগনের যিনি পরে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন-বাড়িতে আশ্রয় নেই। কেরানীগঞ্জে দু’রাত থাকার পর ঊনত্রিশে মার্চ আমি, মণি ভাই, জাতীয় নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামান সাহেব, এবং আমাদের বন্ধু ’৭০-এ নির্বাচিত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ডাঃ আবু হেনাসহ যিনি অসহযোগ আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে কলকাতা গিয়েছিলেন এবং এসেছিলেন, সেই পথে আমরা প্রথমে দোহার-নবাবগঞ্জ, পরে মানিকগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, সারিয়াকান্দি, বগুড়া হয়ে বালুরঘাট দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে চৌঠা এপ্রিল ‘সানি ভিলা’য় আশ্রয় গ্রহণ করি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এটিই ছিল বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট সংক্ষেপে বিএলএফ তথা মুজিব বাহিনীর আশ্রয়স্থল। উল্লেখ্য যে, সমগ্র বাংলাদেশকে চারটি বৃহৎ অঞ্চলে বিভক্ত করে রাজনৈতিকভাবে অগ্রসর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে সংগঠিত ছিল মুজিববাহিনী। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রধান সেনাপতি আতাউল গণি ওসমানীর নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর (এফএফ) সঙ্গে একত্রে যুদ্ধ করে শত্রু বাহিনীকে মোকাবেলা করাই ছিল মূলত মুজিব বাহিনীর কাজ। মুজিববাহিনীর অন্যতম প্রধান শ্রদ্ধেয় নেতা শেখ ফজলুল হক মণি ভাইয়ের দায়িত্বে ছিল তৎকালীন চট্টগ্রাম ডিভিশন ও বৃহত্তর ঢাকা জেলা; রাজশাহী বিভাগ (পাবনা ও সিরাজগঞ্জ বাদে) ও উত্তরাঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান; আবদুর রাজ্জাকের দায়িত্বে ছিল বৃহত্তর ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল এবং সিরাজগঞ্জসহ এক বিরাট অঞ্চলের আর আমার দায়িত্বে ছিল পাবনা, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল এবং পটুয়াখালী জেলা। মুজিববাহিনীর ট্রেনিং হতো দেরাদুনে। দেরাদুনে ট্রেনিং শেষে আমার সেক্টরের যারা তাদের প্লেনে করে ব্যারাকপুর ক্যাম্পে নিয়ে আসতাম। মুজিববাহিনীর সদস্যদের বাংলাদেশে প্রবেশের আগে বুকে টেনে, কপাল চুম্বন করে বিদায় জানাতাম। মুজিববাহিনীর ট্রেনিং ক্যাম্পে বক্তৃতায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মুজিবকে উদ্দেশ করে আমরা বলতাম, ‘প্রিয় নেতা, তুমি কোথায় আছো, কেমন আছো জানি না! যতদিন প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে হানাদার মুক্ত করতে না পারবো, ততদিন আমরা মায়ের কোলে ফিরে যাবো না।’

একাত্তরের তেসরা জানুয়ারি, রেসকোর্সে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ অনুষ্ঠান। শপথ গ্রহণ করান স্বয়ং বঙ্গবন্ধু। সেদিন বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, ‘ছয় দফা ও এগারো দফা আজ আমার নয়, আমার দলেরও নয়। এ-আজ বাংলার জনগণের সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। কেউ যদি এর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে বাংলার মানুষ তাঁকে জ্যান্ত কবর দেবে। এমনকি আমি যদি করি আমাকেও।’ সেদিন বক্তৃতায় আরও বলেছিলেন, ‘আন্দোলনে যাঁরা শহীদ হয়েছেন তাঁদের কাছে দেনা হয়তো আবারও রক্তেই পরিশোধ করতে হবে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়কে নস্যাৎ করার জন্য চক্রান্ত চলছে, এর বিরুদ্ধে আসন্ন সংগ্রামের জন্য সকলেই প্রস্তুত থাকবেন।’ চক্রান্তের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য বঙ্গবন্ধু সদা-সচেতন ছিলেন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান একাত্তরের এগারোই জানুয়ারি ঢাকা এসে বারো ও তেরোই জানুয়ারি দু’দিন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দু’দফা আলোচনায় মিলিত হন। ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে তেজগাঁ বিমানবন্দরে জেনারেল ইয়াহিয়া খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব তাঁর সঙ্গে আলোচনা সম্পর্কে যেসব কথা বলেছেন তা পুরোপুরি সঠিক।’ ঢাকা থেকে ফিরে ইয়াহিয়া খান লারকানায় ভুট্টোর বাসভবনে যান এবং সেখানে জেনারেলদের সঙ্গে গোপন বৈঠকে মিলিত হন। মূলত লারকানা বৈঠকেই নির্বাচনী ফলাফল বানচাল ও গণহত্যার নীল নকশা প্রণীত হয়। তেরোই ফেব্রুয়ারি এক সরকারী ঘোষণায় জানানো হয়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় প্রাদেশিক পরিষদ ভবনে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনার জন্য তেসরা মার্চ বুধবার ৯টায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন। চৌদ্দ ও পনেরোই ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভায় বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। ওয়ার্কিং কমিটি আলোচনা অনুমোদন করে এবং বঙ্গবন্ধুকে ‘জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ও অধিকার আদায়ের জন্য যেকোন পন্থা গ্রহণের পূর্ণ অধিকার প্রদান করে।’ পনেরোই ফেব্রুয়ারি ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু চক্রান্তকারীদের হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘ফ্যাসিস্টপন্থা পরিহার করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংখ্যাগুরুর শাসন মেনে নিয়ে দেশের ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখুন। জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ব্যবস্থা বানচাল করার যেকোন উদ্দেশ্যে তৎপর গণতান্ত্রিক রায় নস্যাৎকারীগণ আগুন নিয়ে খেলবেন না। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের দেওয়া অধিকার বলে আমরা ছয় দফার ভিত্তিতেই শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করবো। সাত কোটি বাঙালির বুকে মেশিনগান বসিয়েও কেউ ঠেকাতে পারবা না।’ ভুট্টো জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদানে অস্বীকৃত হলে ইয়াহিয়া খান গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়াদি নিয়ে আলোচনার জন্য ভুট্টোকে আমন্ত্রণ জানান। ঊনিশে ফেব্রুয়ারি ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকেই গণহত্যার নীলনক্সা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।

একাত্তরের শহীদ দিবস ছিল সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এদিন মধ্য রাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এই বাংলার স্বাধিকার, বাংলার ন্যায্য দাবিকে বানচাল করার ষড়যন্ত্র চলছে। এখনও চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে। কিন্তু বাংলার সাত কোটি মানুষ আর বঞ্চিত হতে রাজি নয়। আমরা আমাদের অধিকার আদায়ের জন্য প্রয়োজন হলে আরও রক্ত দেব। আর শহীদ নয়, এবার গাজী হয়ে ঘরে ফিরব। বাংলার ঘরে ঘরে আজ দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে হবে আমাদের সংগ্রাম। মানুষ জন্ম নেয় মৃত্যুর জন্য; আমি আপনাদের কাছে বলছি এই বাংলার মানুষ রক্ত দিয়ে আমাকে আগরতলা মামলা থেকে মুক্ত করে এনেছে, আমিও আপনাদের জন্য নিজের রক্ত দিতে দ্বিধা করবো না। বাংলার সম্পদ আর লুট হতে দিবো না।’ আটাশে ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদের পশ্চিম পাকিস্তানী সদস্যদের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের জন্য পরিষদ অধিবেশনে যোগদানের আহ্বান জানান। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের নীলনক্সা অনুযায়ী বাংলার মানুষকে তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে অবশেষে পহেলা মার্চ দুপুর ১টা ৫ মিনিটে জেনারেল ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে তেসরা মার্চ তারিখে ঢাকায় আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন একতরফাভাবে স্থগিত করেন।

জেনারেল ইয়াহিয়া খানের পূর্ব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বক্তব্যে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষোভ-বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে ঢাকা নগরী। এদিন হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় ছয় দফা ভিত্তিক শাসনতন্ত্রের খসড়া প্রণয়নের কাজ চলছিল। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণায় বিক্ষুব্ধ মানুষ হোটেল পূর্বাণীর সামনে সমবেত হয়ে স্লোগানে স্লোগানে চারদিক প্রকম্পিত করে তোলে। বঙ্গবন্ধু হোটেলের সামনে এসে সবাইকে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অধিবেশন বন্ধ করার ঘোষণায় সারাদেশের জনগণ ক্ষুব্ধ। আমি মর্মাহত। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। আমি সংগ্রাম করে এ পর্যন্ত এসেছি। সংগ্রাম করেই মুক্তি আনবো। আপনারা ঐক্যবদ্ধ থাকুন।’ বিকাল তিনটায় ছাত্রলীগের উদ্যোগে পল্টন ময়দানে প্রতিবাদ সভা। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পল্টন ময়দানের স্বতঃস্ফূর্ত জনসভায় জনসমুদ্রের উদ্দেশে বলি, ‘আর ছয় দফা ও এগারো দফা নয়। এবার বাংলার মানুষ এক দফার সংগ্রাম শুরু করবে। আর এই এক দফা হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। আজ আমরাও শপথ নিলাম, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ সুশৃঙ্খল সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।’ প্রতিবাদ সভায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মতো আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাই। সমগ্র জাতিসহ গোটা বিশ্ব তখন জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকিয়ে। বঙ্গবন্ধু ছয় দফা না দিলে, ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য’ মামলা হতো না; এই মামলা না হলে এগারো দফার ভিত্তিতে ঊনসত্তরের গণআন্দোলন-গণঅভ্যুত্থান হতো না; ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান না হলে ‘এক মাথা এক ভোট’-এর ভিত্তিতে সত্তরের নির্বাচন হতো না; আর সত্তরের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কিছুই হতো না, কিছুই সম্ভব ছিল না। অনেকেই সেদিন নির্বাচনের বিরোধিতা করে ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো’ বলে স্লোগান তুলেছিলেন, ‘ভোটের আগে ভাত চাই।’ কিন্তু বঙ্গবন্ধু নির্বাচনে অংশগ্রহণের দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বাংলার মানুষের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আস্থা ও বিশ্বাস ছিল গগনচুম্বী। তিনি সর্বস্তরের জনসাধারণের নিকট আহ্বান রেখেছিলেন এই নির্বাচনকে রেফারেন্ডামে পরিণত করতে। বাংলার মানুষ বঙ্গবন্ধুর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সত্তরের নির্বাচনকে গণভোটে পরিণত করেছিল।
বাংলার মানুষের অধিকার বিসর্জন দিয়ে বঙ্গবন্ধু কখনোই ভাবেননি তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন। বিশ^খ্যাত সাতই মার্চের ঐতিহাসিক বক্তৃতায় সে-কথা স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না; আমরা এ-দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ একাত্তরের সতেরোই মার্চ ৫২-তম জন্মদিনে পরিষ্কার অক্ষরে বলেছিলেন, ‘আমার জীবন আমি জনগণের জন্য উৎসর্গ করেছি।’ সত্যিকার অর্থেই বঙ্গবন্ধুর জীবন জনগণের জন্য উৎসর্গিত ছিল এবং জীবন দিয়েই তিনি তা প্রমাণ করেছেন। সবসময় লক্ষ্য করেছি, বাংলার স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর অনমনীয় মনোভাব। তিনি মৃত্যুকে ভয় পেতেন না। মৃত্যুর জন্য নিজকে প্রস্তুত রাখতেন। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে গণহত্যা শুরুর প্রাক্কালে জীবনানন্দ দাশের কবিতা উদ্ধৃত করে বলেছিলেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে এই বাংলায়…’। একাত্তরের ষোলোই ডিসেম্বর ত্রিশ লক্ষাধিক প্রাণ আর চার লক্ষাধিক মা-বোনের সুমহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার পর, বিশ্ব জনমতের চাপে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে যেদিন বাহাত্তরের দশই জানুয়ারি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলার মাটিতে ইতিহাসের মহানায়কের বেশে প্রত্যাবর্তন করেন, সেদিন আমাদের স্বাধীনতা পূর্ণতা লাভ করে।

লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

tofailahmed69@gmail.com