শুক্রবার, এপ্রিল ২৩
Shadow

বিদেশমুখী উচ্চশিক্ষায় উদ্বিগ্ন ইউজিসি

প্রাইম ডেস্ক :

উচ্চশিক্ষার জন্য মেধাবী শিক্ষার্থীদের দেশত্যাগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সেই সঙ্গে মেধাবীদের ধরে রাখতে দেশীয় শিক্ষার মানোন্নয়নে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির সুপারিশ করেছে কমিশন। ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে এটা জানা গেছে। ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার শীর্ষ পছন্দ মালয়েশিয়া। ‘গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টস’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরে ২৪ হাজার ১১২ জন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাড়ি জমান। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ২৭১ জন যান মালয়েশিয়ায়। যুক্তরাজ্যে চার হাজার ৮৬৮, যুক্তরাষ্ট্রে চার হাজার ৫৬৫, অস্ট্রেলিয়ায় তিন হাজার ৯১৫, কানাডায় এক হাজার ৬১৪, জাপানে এক হাজার ৫৪, জার্মানিতে ৯৯৩, ভারতে ৭৭৪, সৌদি আরবে ৭৩২ ও ফিনল্যান্ডে যান ৫৩৫ জন শিক্ষার্থী।

এ প্রসঙ্গে ইউজিসি চেয়ারম্যান প্রফেসর আবদুল মান্নান  বলেন, বাংলাদেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস বা স্ট্যাডি সেন্টার খোলার একটি নীতিমালা আছে। কয়েকটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় সে অনুযায়ী আবেদনও করেছিল। কিন্তু এ পর্যন্ত কাউকেই অনুমোদন দেওয়া হয়নি। বুঝেশুনে নির্বাচিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিলে হয়তো শিক্ষার্থীদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা হলেও কমত। সরকার হয়তো মনে করে থাকতে পারে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়কে বাংলাদেশে আসতে সুযোগ করে দিলে দেশের টাকা বাইরে চলে যাবে। অথচ শিক্ষার্থীরা যে হারে উচ্চশিক্ষার নামে দেশের বাইরে পাড়ি দিচ্ছেন, তাতে আরও বেশি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। এটি বন্ধ করার ক্ষমতা কারো তেমন একটা আছে বলে মনে হয় না। একই সঙ্গে যারা চলে যাচ্ছেন, তাদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দেশে ফিরছেন না। তাই টাকাও যাচ্ছে, মেধাও পাচার হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, শ্রীলংকা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া এমনকি ভারতেও অন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বা স্টাডি সেন্টার খুলেছে। যেখানে সেসব দেশের শিক্ষার্থী লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। আমাদের দেশ থেকেও সেখানে অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছেন। তাই এসব বিষয় নিয়ে নীতি-নির্ধারকদের এখনই চিন্তা করা প্রয়োজন। কমিশনের ভাবনার সঙ্গে অনেকটা মিল খুঁজে পাওয়া যায় গত ২২ অক্টোবর রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে হওয়া ‘আন্তর্জাতিক এডুকেশন এক্সপো’-তে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উপচেপড়া ভিড় দেখে। এক্সপোতে আগত কয়েকজন অভিভাবক এ প্রতিবেদককে বলেন, দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় লেখাপড়ার চেয়ে রাজনৈতিক চর্চা বেশি হয়। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লেখাপড়ার চেয়ে ফ্যাশনেবল বেশি। এখানকার ডিগ্রির মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষ করার পরও নেই চাকরির নিশ্চয়তা। এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, বিদেশে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ভালো তা বলা যাবে না। সার্টিফিকেট বাণিজ্যের দোকান আছে যুক্তরাষ্ট্র অথবা যুক্তরাজ্যেও। ফলে অনেকে অর্থ ব্যয় করেও প্রকৃত শিক্ষা পাচ্ছেন না। ওইসব দেশে বেনামী বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজও থাকে। দেশ ছেড়ে ওইসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে প্রতারিত হওয়ার ঘটনাও আছে। কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবরও তিনদিনের জন্য আয়োজন করা হয় মালয়েশিয়া উচ্চশিক্ষা মেলার। সেখানে দেখা গেছে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিরা এসে তাদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি নিতে সার্ভিসের ওপর বিশেষ ছাড়, স্পট অ্যাডমিশন, ফাইল ওপেনিংয়ে আকর্ষণীয় গিফটের প্রলোভন দেয়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুর্বলতা জেনে লেখাপড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়ারও আশ্বাস দিচ্ছে কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে এতেই ঝুঁকছেন অভিভাবকরা। তবে এ ধরনের মেলা সম্পর্কে কিছুই জানেন না প্রফেসর আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়া দোষের কিছু নয়। তবে সেই যাওয়ার মধ্যে কিছু যৌক্তিক কারণ তো থাকতে হবে। যেমন একজন শিক্ষার্থী যদি পরমাণু বিজ্ঞানে গবেষণা অথবা জ্বালানিতে উচ্চশিক্ষা নিতে চান তাকে তো বিদেশে যেতেই হবে। আমাদের সরকার পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে। এতে প্রচুর দক্ষ জনবল লাগবে। তাই এ বিষয়ে পড়তে হলে যারা এ খাতে ভালো করছে ওইসব বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীদের যেতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিবছরই অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন ধরনের বৃত্তি অথবা সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সহায়তা নিয়ে বিদেশে যাচ্ছেন। তারা পড়ালেখার পাশাপাশি গবেষণাও করছেন। কেউ কেউ দেশে ফিরে এলেও বেশিরভাগই থেকে যাচ্ছেন ওই দেশে। বিশ্বায়নের এ যুগে কেউ অন্য দেশে বৈধভাবে থাকতে চাইলে তা বন্ধ করারও কোনো উপায় নেই। মেধাবীদের বিদেশমুখিতার কারণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দা তাহমিনা আখতার  বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো চেষ্টা করছে কাক্সিক্ষত মানে পৌঁছতে। কিছু কিছু দুর্বলতা রয়েছে। তবে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড এডুকেশনের জন্য এখনো আমাদের সামর্থ্যবানরা চলে যাচ্ছেন বিদেশে। তিনি বলেন, আগে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোয় যেত। কারণ সেখানে পড়ালেখার পাশাপাশি উপার্জনের বড় একটি সুযোগ ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের তুলনায় মালয়েশিয়া এবং শ্রীলঙ্কায় শিক্ষা ব্যয় অনেক কম হওয়ায় সেদিকেই বেশি ঝোঁক। তবে জেনেশুনে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ এই শিক্ষাবিদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published.