বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৫
Shadow

জাহাঙ্গীর না রাসেল, কে হচ্ছেন আ.লীগের স্ট্রাইকার?

নিজস্ব প্রতিবেদক  :

নতুন নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পর বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসছে দেশের ছয়টি সিটি নির্বাচন। রংপুর, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটের সঙ্গে আছে দেশের সবচেয়ে বড় সিটি করপোরেশন গাজীপুরও।

‘দ্বিতীয় গোপালগঞ্জ’ হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের প্রথম নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছিলো ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের। কার্যত প্রার্থী নির্বাচনে ভুল এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের প্রভাবই পড়েছিলো ভোটের ফলে। এবার আর দ্বিতীয় ভুল করতে চায় না দল। তাই আগে থেকেই অতি সাবধানতা থাকছে প্রার্থী নির্বাচনে।

২০১৩ সালের ৭ জানুয়ারি গঠিত হয় গাজীপুর সিটি করপোরেশন। প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সে বছরের ৬ জুলাই। মোট ভোটার ছিলো ১০ লাখ ২৬ হাজার ৯৩৯। ৫৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই সিটির মতো বৃহৎ পরিসর দেশের আর কোনটিই নয়।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনের পরাজিত প্রার্থী আজমত উল্যা খান কি আবারও দলের টিকিটের ভরসা করছেন? নাকি দেখা যাচ্ছে নতুন মুখ? গাজীপুরের দ্বিতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিত্বকারী প্রার্থী কে হচ্ছেন? দিন যত ঘনিয়ে আসছে, এসব প্রশ্নই উঁকি মারছে সর্বস্তরে।

দলীয় উচ্চপর্যায়, স্থানীয় নেতাকর্মী এবং সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে আলাপ করে দুটো নতুন নাম এলো। ফের মেয়র প্রার্থী হিসেবে আজমত উল্যাকে পছন্দের তালিকায় রাখতে রাজি নন অন্তত ৯০ শতাংশ। সে ক্ষেত্রে নতুন যে দুটো নাম আসছে তার মধ্যে চমক একটি। অন্য নামটি বলে সামনে চলে আসে নাটকীয় অনেক ঘটনা।

জাহাঙ্গীর আলমের কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি গাজীপুরের মানুষ। গত নির্বাচনে একেবারে শেষলগ্ন পর্যন্ত ভোটের মাঠে ছিলেন। সবকিছু ছাড়িয়ে ‘বিদ্রোহী’ হয়েও জায়গা করে নিয়েছিলেন মানুষের মনে। শেষপর্যন্ত দলের সিদ্ধান্তে প্রার্থীতা থেকে অশ্রুসজল বিদায় হয়েছিলো জাহাঙ্গীরের। এবার সেই জাহাঙ্গীরেই ভরসা রাখতে চায় মানুষ।

আর, চমকের নামটি কামরুল আহসান রাসেল সরকার। গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের এই আহ্বায়কের ওপরও ভরসা রাখতে চান অনেকে। তরুণ নেতৃত্ব দিয়ে গাজীপুরকে একটি মডেল সিটি করপোরেশন গড়ে তোলার একটি বার্তা ইতোমধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি।

আগামী বছরের শুরুর দিকেই এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার জোর সম্ভাবনা। হাতে আর খুব বেশি সময় নেই। গাজীপুর সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী বাছাইয়ে এখন থেকেই মনযোগ দিতে চায় দল। দলের টিকিট শেষপর্যন্ত কার হাতে ওঠে- সেটি এখনও অনিশ্চিত। তবে ধারণা করা হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ এই প্রতিযোগিতা চলতে পারে দ্বিমুখী। হয় জাহাঙ্গীর আলম, নতুবা রাসেল সরকার- এই দুজনের একজনই পেতে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের টিকিট।

স্থানীয়রা জানান, গত নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলের ভেতরে অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পড়েছেন আজমত উল্লা খান। মূলত ওই নির্বাচনের পর থেকেই জাহাঙ্গীর আলমের জন্যে হা-হুতাশ শুরু করে মানুষ। আফসোস করতে থাকেন, কেন জাহাঙ্গীরকেই বেছে নিলো না দল। পরবর্তী নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হিসেবে জাহাঙ্গীরকেই ভেবে আসছে তৃণমূলের মানুষ।

তবে একপর্যায়ে এই দৌঁড়ে হাজির হয়ে যান কামরুল আহসান রাসেল সরকার। তিনিও মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছেন সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নিজের ভালো কাজের মাধ্যমে। রাসেলের নামটি এসে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচন ঘিরে তৃণমূলের রাজনীতি আরও জমে উঠলো।

স্থানীয়রা আরও মনে করেন, জাহাঙ্গীর বা রাসেল, দুজনই আওয়ামী লীগের জন্যে নিরাপদ প্রার্থী। এদের যে কেউই প্রার্থী হলে দল বড় ব্যবধানে জিতবে।

মেয়র প্রার্থী হিসেবে জাহাঙ্গীর কেন যোগ্য?

গত নির্বাচনের কথা। ২০১৩ সালের জিসিসির প্রথম নির্বাচনে সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে মেয়র পদে দলীয় সমর্থন চেয়েছিলেন সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম। যিনি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে দাঁড়িয়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে নজিরবিহীন ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। সেই জাহাঙ্গীর ভাইস চেয়ারম্যানের পদ ছেড়ে নির্বাচনের মাঠে নামলে দল তাকে সমর্থন দেয়নি।

টঙ্গীর সাবেক পৌর মেয়র আজমত উল্লা খান দলের সমর্থন পেলেও অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আদালতের নির্দেশে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে টিকে ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। অতঃপর প্রার্থী সমস্যা নিরসনের জন্য সে বছরের ১৮ জুন নাটকীয়ভাবে জাহাঙ্গীরকে ঢাকায় তুলে নিয়ে যান ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা। এরপর প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকের পর আওয়ামী লীগের নেতারা ঘোষণা দেন, আজমত উল্লাকে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে গেছেন জাহাঙ্গীর আলম। কিন্তু জাহাঙ্গীরের নেতা-কর্মীরা তখনো নির্বাচনের মাঠে।

সমস্যা সমাধানে নানা দেনদরবারের পর ২৩ জুন জাহাঙ্গীর আলম গাজীপুরে এসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এরপর আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লার পক্ষে কাজ শুরু করেন তিনি।

গাজীপুর সিটির আরেকটি নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থী নিয়ে দলের ভাবনা শুরু হয়েছে। দলের নীতি নির্ধারকের অনেকেই মনে করছেন, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে শেখ হাসিনা আবারও নতুন চমক দেখাবেন। ভোটের মাঠের ষ্ট্রাইকার হিসেবে জনপ্রিয় এবং তরুণ কোন নেতাকে গাজীপুরেও তিনি বেছে নিবেন। আর এ পদে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমের নামটি আলোচিত হচ্ছে বেশি।

গত সিটি নির্বাচনের বছরখানেক পর দলীয় সভানেত্রী গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্বটি দেন জাহাঙ্গীর আলমকে। এমনকি সেই সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে আগামী নির্বাচনের জন্য মাঠ গোছানোর জন্যেও নির্দেশেনা দেন।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর নবীন-প্রবীনদের নিয়ে মহানগরীর ৫৭টি ওয়ার্ডে দলীয় কর্মকাণ্ড চাঙা করার উদ্যেগ নেন জাহাঙ্গীর। ত্যাগী ও ক্লিন ইমেজের নেতাকর্মীর সমন্বয়ে মহানগর আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলেছেন। এতে দারুণভাবে উজ্জীবিত হচ্ছে মহানগর আওয়ামী লীগ। তাঁর কারিশমাটিক এমন কর্মকাণ্ডে বেজায় খুশি দলের তৃণমূলসহ হাইকমান্ড।

মহানগর আওয়ামী লীগের ১ নম্বর সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মহিউদ্দিন আহম্মেদ মহি বলেন, ‘শুধু দলেই নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও জাহাঙ্গীর আলম জনপ্রিয়। গতবারের নির্বাচনে দল থেকে সমর্থন পেলে তিনিই মেয়র নির্বাচিত হতেন বলে নেতাকর্মী মনে করেন। আর আগামী নির্বাচনে জাহাঙ্গীরকেই নিয়ে স্বপ্ন মহানগরের মানুষের।

মনোনয়ন পেলে নির্বাচনে জয়লাভের আশা ব্যক্ত করে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি দলীয় মনোনয়ন পেলে জিতব ইনশাআল্লাহ। আর যদি দলীয় সভানেত্রী আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো ওপর নির্ভর করেন, তাতেও আমার কোনো দ্বিমত নেই। নৌকার পক্ষে কাজ করতে আমি সর্বদা প্রস্তুত।’

মেয়র প্রার্থী হিসেবে রাসেল কেন যোগ্য?

অল্প সময়ের মধ্যে মানুষের মন জয় করে পেয়েছেন গরীবের বন্ধু খেতাব। রাজনীতির মাঠেও সফল বিচরণ। মহানগর যুবলীগের আহ্বায়কের দায়িত্ব পেয়ে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে চাঙা করেছেন ঝিমিয়ে পড়া সংগঠনকে।

মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বনভোজন, গরীর দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানো, গাজীপুর মহানগরের ৫৭টি ওয়ার্ডে ঘুরে ঘুরে দলের খোঁজ নেওয়া, সফলভাবে কমিটি গঠন, ক্ষমতাসীন দলের সকল রাজনীতিক অনুষ্ঠান সফলভাবে বাস্তবায়নসহ গাজীপুরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে উর্বর করার লক্ষে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। যার ফলে এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে বেশ সুনাম কুড়িয়ে নিয়েছেন কামরুল আহসান রাসেল সরকার।

২০১২ সালে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন গঠন হওয়ার পর কামরুল আহসান সরকার রাসেলকে আহ্বায়ক করে ২১ সদস্যের গাজীপুর মহানগর যুবলীগ কমিটির অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি। সেই থেকে রাসেলের নতুন পরিচয়। ছাত্র রাজনীতিতে দীর্ঘদিন তিনি ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন। ওই সময় থেকেই তিনি কেন্দ্রীয় নেতাদের নজরে আসেন।

স্থানীয় নেতাকর্মীরা মনে করেন, সমস্যায় জর্জরিত এই মহানগরকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে রাসেল সরকারের বিকল্প কাউকে চিন্তা করলে বড় ভুল হবে। সে ক্ষেত্রে ভোটের ফল গত নির্বাচনের মতোও হতে পারে বলে অনেকের শংকা।

মহানগরের ২৪ (শিমুলতলী) নাম্বার ওয়ার্ডের বাসিন্দা প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন আলী বেপারী বলেন, গাজীপুর আওয়ামী লীগের দূর্গ। কিন্তু দলীয় সমস্যার কারণে গত নির্বাচনে আমাদের পরাজয় হয়েছে। তাই এবার আর ভুল করা যাবে না। জনপ্রিয়তার কথা চিন্তা করে প্রার্থী দিতে হবে।অবশ্য জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে রাসেল সরকার অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। মাঠপর্যায়ে জরিপ করলেই আশা করি যোগ্য নেতৃত্ব বের হয়ে আসবে।’

গাজীপুর মহানগরের ৩৫ নম্বর (বোর্ড বাজার) ওয়ার্ডের মহিলা নেত্রী জামিনা বেগম বলেন, অনিয়ন্ত্রিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ আরও নানা সমস্যায় জর্জরিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন। যেন দেখার কেউ নেই। তাই আগামীতে অবশ্যই শিক্ষিত, দক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে বাছাই করতে হবে।

মেয়র কে হতে পারে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, গাজীপুরে অনেক রাজনৈতিক নেতা আছেন। তবে রাসেল সরকার একটু ভিন্ন। তাই সে হলে ভালোভাবে নগর চালাতে পারবে বলেও তিনি বিশ্বাস করেন।

১৯ নম্বর (সালনার পূর্ব) ওয়ার্ডে নুরুল ইসলাম নামে এক দোকানদার  বলেন, অনেক সময় নেতাদের উৎপাতে দোকানদারি করা কঠিন হয়ে যায়। গাজীপুরে নেতাদের মধ্যে রাসেল ভাই একটু আলাদা।

মেয়র পদে নির্বাচন প্রসঙ্গে  রাসেল সরকার বলেন, এখনো এমটা চিন্তা করিনি। তবে জনগন ও উর্ধ্বতন নেতারা যদি চান, তাহলে অবশ্যই নির্বাচন করবো। দায়িত্বশীল মানুষেরা দায়িত্ব নিতে ভয় পায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.