বুধবার, জুন ৩
Shadow

আদিবাসী মিজানের ঔদ্ধত্য, নিরব আন্তঃসংগঠন

বিনোদন প্রতিবেদক : গত রবিবার গোপনে আদিবাসী মিজান নামক এক নাট্যপরিচালক শুটিং করতে গিয়ে ধরা খাওয়ার পর আন্তঃসংগঠনের চাপে ফিরে আসায় নাট্যপাড়ায় স্বস্তি ফিরে এসেছিলো।

তবে মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এই নির্মাতার একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাসে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। স্ট্যাটাসে আন্তঃসগঠনকে পাশ কাটিয়ে করোনা প্রকোপে প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া স্বাস্থ্য সচেতনমূলক সিন্ধান্তগুলোকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন এই নির্মাতা। এ ঘটনাকে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর চক্রান্ত বলে সংশ্লিষ্ঠরা মনে করছেন। তার পোস্টটি মঙ্গলবার রাতে আপ করা হলেও সেটি বুধবার সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর সরিয়ে নেওয়া হয়।

জানা গেছে, রবিবার ছোট পর্দার জাহিদ হাসান এবং কুশলী চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন বুলুকে নিয়ে একটি ঈদের নাটকের দুটি সিন শুট করতে ঢাকার অদূরে পূবাইল হাসনাহেনায় যান। এরমধ্যে আন্তঃসংগঠন থেকে নির্মাতা মিজানের কাছে ফোন যায়। ফোনে এই নির্মাতাকে ঢাকায় ফেরার চাপ দিলে তিনি ‘সরি’ বলে ঢাকায় ফিরে আসেন। এ ঘটনা জানাজানি হলে গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সেখানে তিনি (মিজান) সরি বলেছেন এবং আন্তঃসংগঠনের নেতৃবৃন্দ ঘটনাকে সহানুভূতির সঙ্গে দেখার জন্য সবার কাছে আহ্বান জানান। ঘটনা যখন সমাধানের পথে ঠিক সে মহুর্তে আদিবাসী মিজান তার শুটিংয়ে যাওয়া এবং ফিরে আসা নিয়ে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন। শুরুতে তিনি ‘ভুল’ করেছেন উল্লেখ করে ‘সরি’ বলার পর লিখেছেন “আমি কোনো ‘অন্যায়’” করি নাই।

নিজের পক্ষে সাফাই করতে গিয়ে এই নির্মাতা যা লিখেছেন সেটার গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো- একজন ডিরেক্টর হিসাবে একজন প্রডিউসারের ভালো-মন্দ দুটোই দেখতে হয়। কারণ প্রডিউসার বাঁচলে নাটক বাঁচবে আর নাটক বাঁচাতে আর্টিস্ট ডিরেক্টর রাইটার এবং সকল কলাকুশলী সবাই বাঁচবে। আমার এক প্রডিউসার রাজনীতির সাথে জড়িত তাই সে কখনো সামনে আসে না বিভিন্ন নাম দিয়ে তার নাটক চালায় এই ঈদের তার দুইটা সাত পর্বের নাটক প্রচার হবে। যাই হোক আমরা এক বছর আগে নেপালে দুইটা সাত পর্বের সিন বাকি ছিল। গল্পটা এমন যে সে মার ব্যবহার করে নেপাল চলে যায় শুটিং করতে কিন্তু এই শুটিং করতে গিয়ে পরে নানান সমস্যায় পরে সে উপলব্ধি করে মার অভিশাপ লাগছে তাই সে নেপাল থেকে এসে মার কাছে ক্ষমা চায় এবং বলে মার মনে কষ্ট দিলে কোনদিন কোন কাজে সফল হওয়া যায় না। এই যে মার সাথে খারাপ ব্যবহার এবং এসে মাফ চাওয়া এই দুইটা সিনের জন্য নাটকটি এতদিন আটকানো। প্রডিউসার এতদিন কিছু বলে নাই কারণ আমিও তার কাছে টাকা পেতাম তাই আমিও বাকি শুটিংটুকু করি নাই। ঐ দিন হঠাৎ সে আমার বাসা নিচে এসে মা এবং তার চাচী দুজন খুব অসুস্থ তার টাকার দরকার। এ অবস্থায় আমি তাকে উল্টো প্রশ্ন করি আমি কি করতে পারি তখন সে বলল ভাই আমার যে নাটকটা আটকে আছে এইটা এই ঈদে বিক্রি করে দেন। তারপর ফোন দেয় জাহিদ হাসান ভাইকে উনি কিছুতেই রাজি হন নাই। তারপর ভাইকে বুঝিয়ে বলি। তখনও জাহিদ হাসান ভাই রাজি হন নাই। আবার ঘন্টা খানিক পরে জাহিদ হাসান ভাই ফোন করে শুটিং করার অনুমতি দেয়। কিন্তু বলে দুইটা সিন যেহেতু তাহলে তুই আমি আর ক্যামেরাম্যান শুধু তিনজন। ভাই বলল সাংগঠনিক অনুমতি নিতে হবে। আমি বললাম ভাই আমরা তো শুটিং করছি না। শুটিং মানে লাইট, জিবআর্ম, ট্রলি, প্রডাকশন বয়, মেকআপম্যান,গাড়ি, সহকারী পরিচালক, ক্যামেরা ক্রু, আরো নানান কিছু। সব মিলিয়ে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট লাগবে। ভাই রাজি হল। আমরা তখন শুটিং এ যাচ্ছি বুলু ভাই উনার গাড়িতে আমি আমার গাড়িতে এবং জাহিদ হাসান ভাই তার গাড়িতে।

আন্তঃসংগঠনের নেতা এস এ হক অলিকের ফোন প্রসঙ্গে এই নির্মাতার বক্তব্য ‘অলিক ভাই আমার ফোন বন্ধ পেয়ে বুলু ভাইকে ফোন দেয় তখনও আমরা রাস্তায়। তারপর বুলু ভাই আমাকে অনলাইনে ফোন দেয় এবং বলে সংগঠন চায় না তুমি দুটি সিনও করো। আমি বললাম তাহলে চলেন আমরা চলে যাই। আমরা চলে আসি এবং আমি সংগঠন কে সরি বলি কারণ আমার বুঝার ভুল ছিল।

ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারতো। গোল বেঁধেছে মিজানের নিম্নবর্ণিত অংশে। ফেসবুকে তার বিরুদ্ধে কিছু পাল্টা মন্তব্যকে ঘিরে। তিনি লিখেছেন ‘এইবার আসি অন্য কথায়-যারা অনেক বড় বড় কথা ফেইসবুকে লিখছেন আমাদের ত্রান দেওয়া উচিত। বাটপারের বাচ্চা তুই আজকে এত বড় কথা লেখিস বাসায় যখন চাল থাকে না, বাসা ভাড়ার টাকা থাকে না, মার চিকিৎসার রিপোর্ট আনার টাকা থাকে না তখন তো টাকার জন্য রাত ৯ থেকে ১ পর্যন্ত বসে থাকিস আমার বাসার নিচে তখন মনে থাকে না তর বাপ ত্রানের যোগ্য।

আরেকটি অংশের জবাব দিতে গিয়ে নেতৃবৃন্দকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে শেষ লাইনে অশ্লীল শব্দ লিখেছেন- আপনারা টিভি চ্যানেল বড় বড় কথা বলে সাক্ষাৎকার দেন তখন তো ঠিকেই ঘর থেকে বেড়িয়ে যান টিভি স্টুডিতে তখন কোথায় থাকে লক ডাউন…হ্যাঁ আমরা লক্ষ করেছি সাক্ষাৎকারের সময় হাতে আবার গ্লাভস পরেছেন এইটা কি শুটিং না? এইখানে লাইট ছিল মানে লাইট ম্যান ছিল ক্যামেরা ছিল মানে ক্যামেরা ম্যান ছিল তবে মেকআপটা ভালো হয় নাই ওহ তার মানে মেকআপটাও ছিল। আপনি তো প্রেগ্রাামটা করলেন আমাদের কেউ অনুমতি দেন। দুইটা সিন মানবিক কারনে করার সিদ্ধান্তও ভুল ছিল তার জন্যও সরি বলেছে সেটা জানার পরেও কেন আপনার অভিনেত্রীরা জাহিদ হাসান ভাই, আনোয়ার হোসেন বুলু ভাই এবং আমাকে নিয়ে অনেক আজেবাজে কথা বলেছেন তাদের কি বিচার হবে? তাহলে কি আপনাদের ওরা চালায়? জয় ভাইয়েরা কিন্তু শুটিং করে সেটা ভাইরালও করেছে আমরা কিন্তু শুটিং না করেই শাস্তি পেলাম। জয় ভাইদের চুল (..) ফেলতে পারবেন না।

পরবর্তীতে পোস্টটি কিছু সংশোধন আনা হয়।

আদিবাসী মিজানের এমন স্ট্যাটাসের পর বেশ কিছু মন্তব্য করেছেন তার ঘনিষ্টমহল। এদের একজন জাহিদুল ইসলাম মিন্টু। যতদূর জানা গেছে সম্পর্কে তিনি জনপ্রিয় অভিনেতা জাহিদ হাসানের খালাতো ভাই। তিনি সংগঠনকে একহাত নিয়েছেন। লিখেছেন- ‘এর পরের ডেটে শুটিং হবে জাহিদ হাছান (হাসান) বুলু (আনোয়ার হোসেন বুলু) ভাই আমি আমরা সবাই থাকবো পারলে যে পারো বন্ধ করতে আসুক কোনো ফোকিন্নির (ফকিন্নি) বাচ্চা আমাদের ভাইদের ত্রান (ত্রাণ) দিতে চায় জেনে রাখা উচিত (উচিৎ) আমাদের যা আছে বসে খেলে ফুরাবে না।

কে কি বোলছো (বলেছো) তারা মিডিয়া কি (অপ্রকাশযোগ্য শব্দ) আমাদের জানা আছে দেখা যাবে খেলার মাঠে। সেস (শেষ) সংলাপটা বোলি (বলি) সালা (শালা) মারবো এখানে লাশ পরবে (পড়বে) সসানে (শ্বশানে)।

এমন স্ট্যাটাসের এমন মন্তব্য ঘিরে যখন শোরগোল। তখন আন্তঃসংগঠনের পক্ষ থেকে ডিরেক্টর গিল্ডির সাধারণ সম্পাদক এস এ হক অলিককে দায়িত্ব দেওয়া হয় আদিবাসী মিজানের সঙ্গে কথা বলার। তিনি বুধবার ইফতারের আগে তাকে ফোনে স্ট্যাটাস সরিয়ে ফেলার অনুরোধ করলে মাগরিবের পর সেটিকে আর দেখা যায় নি।

এ নিয়ে মিজানের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ মহুর্তে তিনি এ নিয়ে কথা বলবেন না। যেটা হয়েছে সেটা ডিলিট করেছি। আমার যা বলার ফেসবুকেই সেটা দেখতে পাবেন বলে ফোন রেখে দেন।

তিনি কথা জলতে না চাইলেও গুঞ্জন রয়েছে আদিবাসী মিজান বলে বেড়াচ্ছেন সংগঠনের নেতারা তার পকেটে এবং তাদের অনেক গোপন বিষয় তার জানা। তাকে (আদিবাসী মিজান) নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে তিনি সংগঠনগুলোর নেতাদের গোপন কথাবার্তার স্ক্রিন শট ফাঁস করবেন বলেও হুমকি দিয়েছেন।

বিষয়টি জানতে ডিরেক্টর গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক এস এ হকের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যা হয়েছে সেটা খুবই দুঃখজন। আমরা চেয়েছিলাম অল্পতেই সমাধান করতে কিন্তু কেন কার কথায় যে ওই স্ট্যাটাস দিতে গেলো তা জানি না। তবে এটা কারো জন্য মঙ্গলদায়ক হয় নি। বিশেষ করে এ অবস্থায়। কারণ আমরা সরকারের নির্দেশিত পথে চলছি। সরকার বিব্রত হবে এমন কিছুই আমরা করবো না বা করা উচিৎ হবে না। এ বোধটা আমাদের না থাকলে চলবে কেন?

মিজানের স্ট্যাটাস সংগঠনকে এড়িয়ে সরকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর সুপরিকল্পিত কোনো ষড়যন্ত্র কি না এমন প্রশ্নের জবাবে এই নেতা বলেন, আসলে এটা বলা মুশকিল। আমি যদি সহজভাবে দেখি তাহলে প্রত্যেকের দায়িত্বের জায়গা থেকে কাজ করলেই কিন্তু জটিলতা আসতো না। সংগঠন বা সরকারের যেখান থেকেই দিক নির্দেশনা আসুক সেটাকে মানা উচিৎ। তিনি যে স্ট্যাটাস দিয়েছেন বা যাই করেছেন সে ভাবনাগুলো ভেবে প্রকাশ করা উচিৎ ছিল।

মিজানের ওই স্ট্যাটাসে অনেকগুলো প্রতিক্রিয়াশীল মন্তব্য চোখে পড়েছে যা প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া লকডাউন সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধের সামিল বলে অনেকে মন্তব্য করছেন। একইভাবে সংগঠনকেও। সহজভাবে বললে ঘটনাকে উস্কে দিয়েছেন এদের মধ্যে অভিনয় বা নির্মাণের সঙ্গে জড়িত অনেকেই রয়েছেন এদের ব্যাপারে ভাবনা কি প্রশ্নের জবাবে অলিক বলেন, এটা সত্যি ভাবনার বিষয়। তবে আমি বলবো প্রত্যেকে প্রত্যেকের দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে বললে হয়তো ঘটনা শুরুতেই থামিয়ে দেওয়া যেতো।

মুঠোফোনে অভিনয় শিল্পী সংঘের সভাপতি শহীদুজ্জামান সেলিম পুরো ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন এ ঘটনাতো শেষ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু সরি বলে ফিরে আসার যে বিশদ বিবরণ আর কৈফিয়ত মিজান চাইলেন তাতে তিনিই হয়তো না বুঝেই ঝামেলা তৈরি করেছেন। সত্যি কথা বলতে দিনশেষে সবাই আমরা এক কোনোভাবেই চাই না এ অবস্থায় ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হোক। মিজান নিজে ভুল করেছেন সঙ্গে জাহিদ হাসান এবং আনোয়ার হোসেন বুলু ভাইয়ের মতো দুই গুণীকে বিব্রত করেছেন এটা মেনে নেওয়া কষ্টকর।

অভিনেতা জাহিদ হাসান বিব্রত হয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা নিয়ে বলতে চাই না। যা হবার হয়ে গেছে। একটা কথা কি যে যে পেশার হোক না কেন এমন কিছু করা যাবে না। যদি করি তবে সেটাতো সবার জন্য বিব্রতকর হবেই। ভুলে গেলে চলবে না দিন শেষে সবাই আমরা এক।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নাট্যনির্মাতা ও অভিনেতা বলেছেন, নির্মাতা আদিবাসী মিজান যেভাবে সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দকে গালমন্দ করেছেন এবং যেভাবে মিজানের ওই স্ট্যাটাসে কিছু শিল্পী ও পরিচালকসহ একটি শ্যুটিং স্পটের মালিক অশালীন মন্তব্য করেছেন, এতে বিনোদন জগতের সবাই বিস্মিত হয়েছেন। অনেকেই বলছেন, একজন নির্মাতা কিভাবে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্টদের সম্পর্কে এমন অশালীন মন্তব্য করতে পারেন। এ বিষয়ে সংগঠনগুলো যদি ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয় তাহলে অনেকেই ভাববে, এ ধরনের সংগঠন থাকার কোন যুক্তিই নেই।