শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৫
Shadow

অনিশ্চিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে তিন বছর পার হলেও বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টি ঝুলে গেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ নিয়ে বর্তমানে আর সাড়াশব্দ নেই বললেই চলে। বরং সারাবিশ্ব যেন ব্যস্ত হয়ে পড়েছে করোনা মোকাবেলাসহ ভ্যাকসিন আবিষ্কার নিয়ে। যে কারণে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রিত ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য-সহায়তা-অনুদানের পরিমাণও কমছে, যা স্বভাবতই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর সহায়তায় লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটাও হয়ে পড়েছে অনিশ্চিত তাদের অসহযোগিতার কারণে। তবে সর্বশেষ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, শরণার্থী হিসেবে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের কোনভাবেই আত্তীকরণ করা হবে না। চলতি বর্ষা মৌসুমের শেষে তাদের পর্যায়ক্রমে ভাসানচরে স্থানান্তর করা হবে। এর পাশাপাশি চেষ্টা চলবে ইউরোপ-আমেরিকাসহ তৃতীয় কোন দেশে পুনর্বাসনের। এটি সময়সাপেক্ষ ও দুরূহ হলেও অসম্ভব নয়। তাই বলে রোহিঙ্গারা কিন্তু বসে নেই। গত তিন বছরে অন্তত দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির থেকে পালিয়ে গেছে। যে কারণে সেনাবাহিনীর সহায়তায় দেয়া হচ্ছে কাঁটাতারের বেড়া। অবশ্য আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়া কর্তৃক মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও শুনানির বিষয়টি ইতিবাচক অগ্রগতি।

অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের স্মার্টকার্ডসহ বাংলাদেশী পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রিত এগারো লক্ষাধিক রোহিঙ্গার অন্তত কয়েক হাজারকে এনআইডিসহ আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট দেয়ার। পাসপোর্ট পাওয়ার বিষয়টি অতি পুরনো। অভিযোগ আছে রোহিঙ্গারা অনেক আগে থেকেই জাল বা ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশী পাসপোর্ট বাগিয়ে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে এবং সেসব স্থানে নানা অপরাধ-অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছে। সৌদি আরব এসব রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য চাপও দিয়েছে বাংলাদেশকে। এর জন্য পাসপোর্ট অফিস অভিযুক্ত হয়ে আসছে আগে থেকেই। এবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে। গত ১ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় রোহিঙ্গা ডাকাত নূর মোহাম্মদ। তার কাছে পাওয়া যায় বাংলাদেশী স্মার্টকার্ড বা জাতীয় পরিচয়পত্র। উল্লেখ্য, মূল সার্ভারে পরিপূর্ণ তথ্য না থাকলে স্মার্টকার্ড প্রিন্ট হয় না, স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তা আটকে যায়। তার মানে নূর মোহাম্মদের সম্পূর্ণ তথ্য ছিল ইসির কাছে। এরপর ২২ আগস্ট স্মার্টকার্ড তুলতে গিয়ে আটক হয় লাকী আক্তার নামের এক রোহিঙ্গা নারী। গোমর ফাঁস হয় এর পরই। রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের নির্বাচন কমিশনে গড়ে ওঠা একাধিক দুষ্টচক্রের মাধ্যমে কয়েক শ’ রোহিঙ্গা ইতোমধ্যেই বাগিয়ে নিয়েছে কয়েক হাজার স্মার্টকার্ড, যা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, বিপজ্জনকও বটে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট তদন্তে নেমে এই দুষ্টচক্রের বেশ কয়েকজনকে চিহ্নিত করাসহ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে, যাদের মধ্যে আছে নারীও। চট্টগ্রামের ইসি অফিস থেকে অন্তত পাঁচটি ল্যাপটপ খোয়া যাওয়ার অভিযোগ আছে, যেগুলো হাতিয়ে নিয়েছে ইসিতে চাকরিরত ও চাকরিচ্যুত একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কয়েকজন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও। এই চক্রটি রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে বিপুল অর্থের বিনিময়ে বাড়িতে বসেই এনআইডি ও পাসপোর্ট করে দিত বলে প্রমাণ মিলেছে। মনে রাখতে হবে যে, এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত।

স্বদেশ থেকে বিতাড়িত ভাগ্যবিড়ম্বিত শরণার্থীরা পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই এক প্রধান সমস্যা। টেকনাফ-কক্সবাজার উপকূলবর্তী বাংলাদেশে দীর্ঘদিন থেকে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে বলেও প্রমাণিত। রোহিঙ্গা শিবিরগুলো প্রাচীরবেষ্টিত ও সুরক্ষিত নয় বলে সীমিত পুলিশী নজরদারির সুবাদে তারা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের সর্বত্র। শিশু চুরি, ইয়াবা পাচারসহ জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে। বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে অথবা জাল করে পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে। সেখানেও নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে রোহিঙ্গা বিশেষ করে তরুণদের জঙ্গী ও সন্ত্রাসী তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা। সে অবস্থায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আরও জরুরী উদ্যোগ নিতে হবে বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে।