শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৫
Shadow

টাঙ্গাইলে জাল সনদে দেড় যুগ ধরে চাকরি

গোপালপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি :

জাল সনদে দেড় যুগ ধরে কলেজে শিক্ষকতা করছেন তিনি। এর মধ্যে প্রভাষক পদে চৌদ্দ বছর, আর ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবে দেড় বছর। এ শিক্ষকের নাম খাদেমুল ইসলাম। তিনি উপজেলার হেমনগর ডিগ্রী কলেজে এখন কর্মরত রয়েছেন। হেমনগর ইউনিয়নের ভোলারপাড়া গ্রামের আজাহার আলীর পুত্র তিনি। জানা যায়, খাদেম ২০০৫ সালের ১ জানুয়ারী হেমনগর ডিগ্রী কলেজে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ের প্রভাষক পদে যোগদান করেন। তার ইনডেক্স নাম্বার এলইসি ডি-৩০৭৩৫১৬, সাবজেক্ট কম্পিউটার। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় ফাঁসির দন্ডাদেশ প্রাপ্ত আসামী সাবেক উপমন্ত্রী এডভোকেট আব্দুস সালাম পিন্টু গভর্নিংবডির সভাপতি থাকাকালিন বিএনপি কর্মী পরিচয়ে ওই কলেজে খাদেমুলের চাকরি হয়। সময় পাল্টানোর সাথে সাথে খাদেমুল নিজের রাজনৈতিক পরিচয় বদলে ফেলেন। এখন তিনি খোলনলচে পাল্টে হাইব্রীড আওয়ামীলীগার। অনুসন্ধানে দেখা যায়, খাদেমুল ইসলাম বগুড়ার তদান্তিন ন্যাশনাল ট্রেনিং এ্যান্ড রিসার্চ একাডেমি ফর মাল্টিলিঙ্গুয়াল শর্টহ্যান্ড (সংক্ষেপে‘নট্রামস’) নিয়ন্ত্রণাধীন টাঙ্গাইলের ঘাটাইল কম্পিউটার ট্রেনিং ইন্সস্টিটিউট থেকে ২০০০ সালে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে ‘ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার সাইন্স এন্ড টেকনোলজি’ বিষয়ে সনদ লাভ করেন। সনদের সিরিয়াল নং ২৮৯১ এবং রেজিস্ট্রেশেন ২৯৩৭। এ সনদ সংগ্রহের আগেই নিয়ম বহির্ভূত ভর্তি ও রেজাল্ট সহ নানা অনিয়মের অভিযোগে ঘাটাইলের ওই প্রতিষ্ঠানটির স্বীকৃতি বাতিল করেন বগুড়ার নট্রামস।

ট্রেনিং সেন্টারটি গুঁটিয়ে নেয়ার পর বিপুল অঙ্কের উৎকোচ নিয়ে গণহারে সনদ বিতরণ করেন ঘাটাইলের ওই শাখা প্রতিষ্ঠানটি। খাদেমুল ঘাটাইল থেকে এ রকম একটি সনদ সংগ্রহ করে হেমনগর কলেজে প্রভাষক পদে আবেদন করেন। কিন্তু চাকরিতে যোগদানের পর এমপিও ভূক্তিকরণের জন্য তিনি আবার একই সিরিয়াল এবং একই রেজিস্ট্রেশন নম্বর সম্বলিত নট্রামসের আরেকটি পৃথক সনদ সংগ্রহ করেন। দ্বিতীয় দফায় সংগৃহিত সনদ ডিজি ও বেনবেইসে জমা দিয়ে তিনি প্রভাষক পদে এমপিও করান। উভয় সনদের রেজিস্ট্রেশন ও রোল নম্বর অভিন্ন হলেও শিক্ষা বর্ষে ভিন্নতা রয়েছে। একটিতে নট্রামস এর পরিচালকের দস্তখত নেই। অপরটিতে কর্তৃপক্ষের দস্তখত থাকলেও তা ঘষামাজা এবং পেস্টিং করার ছাঁপ সুস্পষ্ট। একই ব্যক্তির একই সিরিয়াল ও রেজিস্ট্রেশনে দুটো পৃথক সনদ নিয়ে সকলের মধ্যে বরাবর কৌতূহল ছিল। হেমনগর কলেজ পরিচালনা পরিষদের সাবেক সদস্য এবং হেমনগর ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার আব্দুল সালাম জানান, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রভাষক পদের ইন্টারভিউ বোর্ডের সদস্য ছিলেন তিনি। ইন্টানভিউ বোর্ডে খাদেমুল রেজাল্ট খারাপ করলেও গোপালপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সম্পাদক সোহরাব হোসেনের সুপারিশে বিএনপির কর্মী হিসাবে খাদেমুলকে সিলেকশন দেয়া হয়। ভোলারপাড়া গ্রামের শিক্ষাবিদ আলীম হোসেন জানান, দলীয় পরিচয়ে খাদেমুল চাকরি বাগিয়ে নেয়। কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর খাদেমুল ভোল পাল্টে হাইব্রীড আওয়ামীলীগার বনে যায়। গভর্নিং বডির সদস্য নুরুল ইসলাম জানান, খাদেমুলের জাল সনদের বিষয়টি আলোচনায় আসে গত ২০১৯ সালের জুন মাসে ভারপ্রাপÍ অধ্যক্ষ পদে দায়িত্ব গ্রহন নিয়ে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর কলেজের অধ্যক্ষ বীরেন্দ্র চন্দ্র গোপ অবসরে গেলে উপাধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ পান নূরুল ইসলাম। তিনি টানা ছয় মাস ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে অধ্যক্ষসহ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর ৫টি শূণ্যপদ পূরণের বিষয় সামনে আসে। একটি স্বার্থান্বেষী মহল তখন তৎপর হয়ে ঊঠেন। তারা শূণ্য পদে নিয়োগ দিয়ে কোটি টাকা বানিজ্যের ধান্ধা করেন। তারা ২০১৯ সালের জুন মাসে ভাইস প্রিন্সপাল নুরুল ইসলামকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে সরিয়ে দিয়ে জুনিয়র লেকচারার খাদেমুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব দেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জারীকৃত জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের পদ শূণ্য হলে সহকারি প্রধান ভারপ্রাপ্ত প্রধান হবার কথা। সহকারি প্রধান না থাকলে শিক্ষকদের মধ্যে বয়োজ্যষ্ঠ ব্যক্তি ওই পদে দায়িত্ব পাবার বিধান। সেই নিয়মানুযায়ী উপাধ্যক্ষ নূরুল ইসলামের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হবার কথা। কিন্তু তাকে এমনকি সিনিয়র ১২জনকে পাশ কাটিয়ে কনিষ্ঠ প্রভাষক খাদেমুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই সালের জুলাই মাসে চক্রটি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ খাদেমুলের যোগসাজশে নিয়োগ বানিজ্যের ধান্ধায় নামেন। টের পেয়ে গভর্নিং বডির অপর অংশ বাধা দেন। কলেজ গভর্নিংবডির সদস্য এবং হেমনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রওশন খান আইয়ুব গত জুনে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে টাঙ্গাইল আমলী আদালতে মামলা দায়ের করেন। ফলে নিযোগ প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যায়। এদিকে ভারাপ্ত অধ্যক্ষ খাদেমুল ্ইসলামের জাল সনদে চাকরি করার বিষয়ে তদন্ত ও প্রতিকার চেয়ে টাঙ্গাইল জেলা শিক্ষা অফিসার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন হেমনগর ডিগ্রী কলেজের ম্যানেজিং কমিটির কয়েক সদস্য। অভিযোগে জাল সনদ নিয়ে প্রভাষক পদে চাকরি এবং সরকারি নিয়ম লংগন করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদে বেআইনীভাবে দায়িত্ব দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। হেমনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং কলেজ গভর্নিং বডির সাবেক সদস্য রওশন খান আইয়ুব ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, নিয়োগবানিজ্য বন্ধ থাকলেও জাল সনদধারি ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে এখনো কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কলেজ গভর্নিং বডির অপর সদস্য এবং উপজেলা চেয়ারম্যান ইউনুস ইসলাম তালুকদার জানান, সকল সিনিয়রকে শিক্ষককে পাশ কাটিয়ে মোস্ট জুনিয়রকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ করার মিটিংয়ে তিনি ছিলেন না। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে জাল সনদ থাকার অভিযোগের কথা তিনি শুনেছেন। এদিকে ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্থানীয় মিডিয়াকর্মীরা বগুড়া নেকটার (অধুনালুপ্ত নট্রামস) কার্যালয়ের পরিচালক শাফিউল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করেন। খাদেমুলের দুটি পৃথক সনদের ফটোকপি সেখানে জমা দেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট র্কতৃপক্ষ অফিসে অনুসন্ধান চালিয়ে নট্রামস বা নেকটার কতৃক অতীতে কখনো এ ধরনের সনদ সরবরাহ করা হয়নি বলে মিডিয়াকে নিশ্চিত করেন।

টাঙ্গাইল জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার লায়লা খানম জানায়, হেমনগর ডিগ্রী কলেজের ভারপাপ্ত অধ্যক্ষ খাদেমুল ইসলামের জাল সনদ নিয়ে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শক প্রফেসর ড. মোঃ মনিরুজ্জামান জানান, সাবজেক্ট ভিত্তিক অনুমোদন না থাকলে কোন শিক্ষক ডিগ্রী কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হতে পারেন না। খাদেমুল ইসলাম তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ের প্রভাষক। এটি ইন্টারমিডিয়েট শ্রেণীর একটি সাবজেক্ট। তাই নিয়মানুযায়ী ডিগ্রী কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদ তিনি পেতে পারেন না। এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ খাদেমুল ইসলাম জানান, তিনি জাল সনদে চাকরি নেননি। তার প্রথম সনদটি ঘাটাইল থেকে নেয়া। সেটি সন্দেহ যুক্ত মনে হওয়ায় তিনি পরবর্তীতে বগুড়ার মীনা মাল্টি মিডিয়ায় ভর্তি হন। সেখান থেকে ২০০১ সালে নট্রামসের প্রকৃত সনদ সংগ্রহ করেন। একটি মহল তার ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য অপপ্রচার চালাচ্ছেন। কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি এবং গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিকাশ বিশ্বাস জানান, সরকারি সার্কুলার অনুযায়ী তিনি সভাপতি হিসাবে মাত্র চারদিন আগে দায়িত্ব পেয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে জাল সনদসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বিষয় নিয়ে তদন্ত করা হবে। দোষী হলে তার বিরুদ্ধে নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।