মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯
Shadow

বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধারে মেগা প্রকল্প

প্রাইম ডেস্ক :
বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধারে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)।
পুরান ঢাকার মুসলিমবাগে আদি চ্যানেলটির শুরু থেকে রায়ের বাজার বেড়িবাঁধ সড়কের পশ্চিম পাশের খাল দিয়ে বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত সংযুক্ত করা হবে। চ্যানেলের দু’পাশে দৃষ্টিনন্দন সবুজ উন্মুক্ত স্থান ও বিনোদন স্পট তৈরি করা হবে।
একই সঙ্গে এর দু’পাশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পর্যাপ্ত সংখ্যক ব্রিজ, ওভারপাস তৈরি করা হবে। চ্যানেলটি উদ্ধার হলে রাজধানীর বড় একটি অংশের পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধান হবে।
অবহেলিত কামরাঙ্গীরচর, ইসলামবাগ, লালবাগ, হাজারীবাগ এলাকার পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে এবং অধিকতর বাসযোগ্য হবে।
প্রায় সাড়ে ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এ চ্যানেলের পুনরুদ্ধারে জমি অধিগ্রহণ, চ্যানেল খনন, অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্রিজ, ওভারপাস নির্মাণসহ সার্বিক উন্নয়ন কাজের সম্ভাব্য ব্যয় চিন্তা করা হচ্ছে অন্তত ৫ হাজার কোটি টাকা।
কম জমি অধিগ্রহণ করে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধার করতে চায় ডিএসসিসি। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মিলিটারি ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিকে (এমআইএসটি) দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যে তারা ডিএসসিসির কাছে একটি খসড়া প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেছে। প্রকল্প বিষয়ে ডিএসসিসির প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদসহ সংশ্লিষ্টরা তাদের চিন্তা ও মতামত দিয়েছে। এমআইএসটি ডিএসসিসির ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের আলোকে প্রকল্পের নকশা প্রণয়নের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই-বাছাই করে ডিএসসিসির কাছে হস্তান্তর করবে। এর ওপর ভিত্তি করে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফাইল (ডিপিপি) প্রস্তুত করবে ডিএসসিসি।
এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস যুগান্তরকে বলেন, ‘রাজধানীর পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে ডিএসসিসি বেশ কিছু খালের আধুনিকায়ন করবে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধারে আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। দায়িত্ব নেয়ার পর বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখেছি। এখন এমআইএসটিকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধারে কাজ করা হবে।’
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, ‘ডিএসসিসির মেয়রের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। এমন উদ্যোগ আরও আগে নেয়া দরকার ছিল। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকার বড় অংশের পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধান ঘটবে।
একইসঙ্গে আদি চ্যানেলের দু’পাশের আধুনিকায়ন হবে এবং আশপাশের পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে। এভাবে রাজধানীর অন্যান্য খাল বা পানি নিষ্কাশন চ্যানেলগুলো উদ্ধার করলে রাজধানীর পানি নিষ্কাশন সমস্যার সমাধান ঘটবে।’
এ বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিষদ নগর অঞ্চল পরিকল্পনা প্রকল্পের (ড্যাপ) পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সংশোধিত ড্যাপে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধারে সুপারিশ করা হয়েছে। ডিএসসিসির এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে রাজউক সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করবে।
বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলের দু’পাশের এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে- ইসলামবাগ, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ শশ্মনঘাট, শহীদনগর, ঝাউচর, হাজারীবাগ সেকশন, কালুনগর, বউবাজার, সিকদার রিয়েল এস্টেট ও সিকদার মেডিকেল কলেজ। এ এলাকাগুলো খুবই অবহেলিত।
আর আদি চ্যানেলটি নোংরা ও আবর্জনায় পূর্ণ থাকায় দু’পাড়ের বসবাসের পরিবেশও দূষিত হয়ে পড়েছে। প্রভাবশালীরা যে যার মতো বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল এবং সরকারি জমি দখল করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। জাল-জালিয়াতি করে অনেকে দলিলও করে ফেলেছেন।
এসব দখলকে পোক্ত করতে কোথাও কোথাও মসজিদও গড়ে তুলতে দেখা গেছে। বহু আগে থেকেই বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধারে এলাকাবাসী দাবি জানিয়ে আসছেন। বিভিন্ন সময় সভা, সমাবেশ, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি প্রদানসহ নানা কর্মসূচি পালন করেছেন।
এসব নজর কাড়ে রাষ্ট্র্রের শীর্ষ কর্তাদেরও। বিষয়টি আমলে নিয়ে ২০১৮ সালের ২৪ ডিসেম্বর কামরাঙ্গীরচরে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধার করতে ডিএসসিসির তৎকালীন মেয়রকে নির্দেশ প্রদান করেন। মোহাম্মদ সাঈদ খোকন মেয়র থাকাবস্থায় এ বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি।
এ বিষয়ে কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা ও চকবাজারের ব্যবসায়ী ইলিয়াস আহমেদ বাবুল যুগান্তরকে বলেন, ১৯৮৭-৮৮ সালে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল হয়ে আমরা নৌকায় টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমায় যেতাম। ১৯৯০ সালে বেড়িবাঁধ হওয়ার পর ধাপে ধাপে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল দখল শুরু হয়।
তিনি বলেন, অনেক দখলদার আদি চ্যানেলের জায়গায় স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তুলেছেন। তারা প্রশাসনের সহযোগিতায় এসব জমির মালিকানাও অর্জন করেছেন। এখন সেসব জায়গায় নামিদামি প্রতিষ্ঠান, শিল্প-কলকারখানা।
ডিএসসিসির কামরাঙ্গীরচরের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধারে আমরা বহু আগ থেকে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় পর্যায় থেকে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা দেব।
বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেল প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএসসিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. খায়রুল বাকের যুগান্তরকে বলেন, ইতোমধ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এমআইএসটি কার্যক্রম শুরু করেছে।
কিছুদিন আগে তারা খসড়া একটি প্রেজেনটেশন দিয়েছে। আশা করি, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারা তাদের প্রতিবেদন ডিএসসিসিতে জমা দেবে। এরপর ডিএসসিসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে।
তিনি বলেন, পুরান ঢাকার মুসলিমবাগ থেকে রায়ের বাজার পর্যন্ত সাড়ে সাত কিলোমিটারের এ আদি চ্যানেল পুনরুদ্ধার করতে সম্ভব্য ব্যয় চিন্তা করা হচ্ছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। তবে কম জমি অধিগ্রহণ করে কিভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যায়, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।