মঙ্গলবার, এপ্রিল ২০
Shadow

রূপবদলের রূপপুর

ইতিবাচকভাবে দেশের রূপ বদলে দেবে রূপপুর এমন ভরসায় বুক বেঁধেছে মানুষ। সেই কবে থেকে প্রতীক্ষা; অবশেষে সেই স্বপ্ন পূরণের স্থাপনার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে। পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক কেন্দ্রের মূল নির্মাণ কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে বৃহস্পতিবার। উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর ভেতর দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। দেশের একক বৃহত্তম প্রকল্প এটি। কেন্দ্রটির মূল পর্যায়ের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ পারমাণবিক জগতে প্রথম পা রাখল। দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা থাকলেও সফলভাবে শেষ হয়েছে এর প্রথম ধাপের কাজ। দুই ইউনিটের এই বিদ্যুত কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত। ফলে সঙ্গত কারণেই নতুন দিগন্তের সূচনা হিসেবে দেশবাসী দেখছে পরমাণু চুল্লীর ঢালাইয়ের শুরুটাকে। এর ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ ৩২তম পারমাণবিক দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিতি পেল। বর্তমানে ৩১ দেশে সর্বমোট ৪৩৭টি পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র রয়েছে।

স্বপ্নের শুরুটা হয়েছিল সেই ১৯৬১ সালে। সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয় দেশ স্বাধীন হওয়ার দু’বছরের মধ্যে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৬৪ সালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের জন্য যে সকল যন্ত্রপাতি জাহাজে করে পাঠানো হয়েছিল সেই জাহাজ পাকিস্তান তাদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে তা চট্টগ্রাম বন্দরে না এনে করাচিতে নিয়ে যায়। আর সেই সঙ্গে বাঙালীর স্বপ্ন সে সময় মুখ থুবড়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বাণী স্মরণযোগ্য: বাঙালীকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। বাঙালী দমে যায়নি, অর্ধশতক পরে হলেও রূপপুর প্রকল্প আলোর মুখ দেখেছে।

বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের উদ্যোগে ২০১০ সালে পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। পরের বছর বাংলাদেশ আর রাশিয়ান ফেডারেশনের মধ্যে পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার বিষয়ক একটি চুক্তি মস্কোতে স্বাক্ষরিত হয়। এরপর ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ সালে রাশিয়ার এটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সই করে সরকার। বিদ্যুত কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ২০২২ সালে এবং দ্বিতীয় ইউনিট পরের বছর উৎপাদনে আসবে। কেন্দ্রটি ৬০ বছর ধরে বিদ্যুত উৎপাদন করবে।

জাপানের ফুকুশিমা আর চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে এই প্রকল্প নিয়ে কিছুটা ভীতি কাজ করেছিল এটা অস্বীকার করা যাবে না। সাধারণ নাগরিকের ভয় পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে। বাংলাদেশের সর্বোত্তম নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখেই রাশিয়া তাদের সর্বশেষ আধুনিক প্রযুক্তি ভিভিইআর ১২০০ মডেলটি রূপপুর প্রকল্পে প্রয়োগ করছে। বিশ্বের পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র নিয়ে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলো মাথায় রেখেই রাশিয়া তার সর্বশেষ মডেলের আধুনিকায়ন করেছে। আর তাই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই বাস্তবায়ন হচ্ছে রূপপুর প্রকল্প।

রাশিয়া আমাদের পুরনো মিত্র। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাদের রয়েছে ব্যাপক সহযোগিতামূলক প্রশংসনীয় ভূমিকা। বাংলাদেশের জাদুকরী উন্নয়ন কার্যক্রমের সহযোগী হিসেবে রাশিয়া এখনও আমাদের পাশে থাকছে। আশা করা যায় দুই দেশের এই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অম্লান থাকবে। রূপপুর প্রকল্পের চমকপ্রদ অর্জন ভবিষ্যতে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুত চাহিদা পূরণে যে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.