সোমবার, নভেম্বর ২৩
Shadow

৪২ রুটে ২২ কোম্পানি

রাজধানী ঢাকার অবর্ণনীয় অসহনীয় দুর্বিষহ যানজট ও জনজট নিয়ে নতুন করে বলার অবকাশ নেই। এটি একদিকে যেমন নগরবাসীর নিত্যদিনের বিড়ম্বনা, তেমনি শ্রমঘণ্টাসহ বিপুল আর্থিক অপচয়ের কারণও বটে। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে ঢাকা উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক রাজধানীর যানজট নিরসনে চিন্তা-ভাবনা করে কিছু প্রস্তাব রেখেছিলেন। তাতে ঢাকায় অগণিত ও অপরিকল্পিত নানা রুটের পরিবর্তে স্বল্প সংখ্যক পরিকল্পিত রুট নির্ধারণ করে পরিমিত সংখ্যক বাস-মিনিবাস পরিচালনার কথা বলেছিলেন। নিবন্ধিত অগণিত বাসের অসংখ্য মালিককে অনধিক পাঁচ-সাতটি কোম্পানির অধীনে নিয়ে আসার প্রস্তাব রেখেছিলেন। এমনকি বিদেশ থেকে এককালীন কয়েক হাজার বাস আমদানি করে সেগুলোর মাধ্যমে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাবও ছিল। দুর্ভাগ্য হলো, তার অকালমৃত্যুতে পরিকল্পনাটি আর এগোতে পারেনি। তবে এবার ঢাকা দক্ষিণের মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের হাত ধরে পরিকল্পনাটি সমন্বয় করে বাস্তবায়ন হতে চলেছে। মঙ্গলবার নগর ভবনে আয়োজিত রাজধানীর রুট র‌্যাশনালাইজেশন বিষয়ে গঠিত কমিটির ত্রয়োদশ বৈঠকে এমনই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। বিস্ময়কর হলেও বাস্তব যে, বর্তমানে রাজধানীতে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ১৬ লাখ ৯ হাজারের বেশি। এর মধ্যে বাস-মিনিবাসের সংখ্যা ৪৬ হাজারের বেশি। ২০ রকমের নিবন্ধিত যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা সর্বাধিক- সাত লাখ ৮২ হাজারের বেশি, যার চালকরা আদৌ কোন ট্রাফিক আইন মানেন না। সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে ঢাকার সড়ক অনুপাতে তিন লাখের বেশি যানবাহন চলতে পারে না। গত এক দশকে যানবাহন বেড়েছে তিন গুণ। এর বাইরেও প্রতিদিন সারাদেশ থেকে অসংখ্য যানবাহন রজাধানীতে ঢুকছে এবং যত্রতত্র যাত্রী ও পণ্য খালাস করছে। সেক্ষেত্রে প্রতিদিন সড়কে চরম বিশৃঙ্খলা, যানজট, জনজট ও দুর্ঘটনা অনিবার্য। এই অবস্থার আপাত অবসানে বিশেষ করে নিবন্ধিত গণপরিবহনগুলো ২২টি কোম্পানির অধীনে এনে ৪২টি পরিকল্পিত রুটে নিয়ে আসার জোর প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। আড়াই হাজার মালিকের বিভিন্ন রুটের বাস পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত হবে ২২টি কোম্পানির হাতে। কোম্পাানিই নির্ধারণ করবে ক্লাস্টার ও রুটগুলো। এর বাইরে বর্তমানের তিনটির স্থলে নির্মাণ করা হবে আরও অন্তত ১০টি বাস টার্মিনাল। তদুপরি বাইরের যানবাহন যাতে রাজধানীতে ঢুকতে না পারে সেই ব্যবস্থাও করা হবে। এসব শুরু ও বাস্তবায়ন হতে পারে আগামী বছর থেকে।

রাজধানীর আয়তন, জনসংখ্যা, রাস্তাঘাট, বাসস্থান ইত্যাদি অনুপাতে এত বিপুল সংখ্যক যানবাহনের নৈমিত্তিক চলাচলের তাৎক্ষণিক কুফল হলো ভয়াবহ ও অসহনীয় যানজট, শ্রমঘণ্টা নষ্ট, ভয়ানক বায়ুদূষণ, সর্বোপরি জনস্বাস্থ্য সমস্যা ইত্যাদি। যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। চীন ও সিঙ্গাপুরে গাড়ি কেনার নীতি করা হয়েছে লটারি পদ্ধতিতে। যুক্তরাজ্যে গাড়ি পার্কিং কর বাড়ানো হয়েছে অবিশ্বাস্য হারে। ভারতের দিল্লীতে যানজট নিয়ন্ত্রণ ও বায়ুদূষণ কমাতে জোড়-বিজোড় পদ্ধতিতে ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল নিয়ন্ত্রণ চালু করা হয়েছে। আর বাংলাদেশ তথা রাজধানী ঢাকায় মেলে তার উল্টো চিত্র। এখানে যে কেউ টাকা থাকলে যখন-তখন গাড়ি কিনে নিবন্ধন, এমনকি লাইসেন্স বাগিয়ে নিতে পারে। গাড়ির মালিক ব্যক্তিটি নিয়মিত কর পরিশোধ করে কিনা, তার জীবন-জীবিকা, আয়-ব্যয়ের উৎস, টাকা সাদা না কালো সেসব আদৌ খতিয়ে দেখা হয় না। এর ওপর গোদের ওপর বিষফোঁড়ার উপদ্রবের মতো রয়েছে অগণিত ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন। ফলে সড়ক দুর্ঘটনাসহ তীব্র যানজট, সেইসঙ্গে ভয়াবহ বায়ুদূষণ বাড়ছেই, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য রীতিমতো হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। উল্লেখ্য, রাজধানী ঢাকা বায়ুদূষণের দিক থেকে বিশ্বে প্রায় শীর্ষে অবস্থান করছে। এসবের অবসানকল্পে রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরী ও অত্যাবশ্যক।