শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৬
Shadow

ভ্যাকসিন যুগে বিশ্ব

প্রাইম ডেস্ক :

সব প্রস্তুতি শেষ, কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন পৌঁছে গেছে যুক্তরাজ্যে। এখন কেবল প্রয়োগের পালা। প্রথম ধাপের ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রমের মাধ্যমে ৯৯ শতাংশ মৃত্যু প্রতিরোধ ও হাসপাতালে ভর্তি ঠেকানোর আশা করছে ব্রিটেন। বেলজিয়ামে উৎপাদিত হচ্ছে ফাইজার ও বায়োএনটেক উদ্ভাবিত করোনার ভ্যাকসিন। যুক্তরাজ্যের অনুমোদনের পর এখন তা সরবরাহ করছে মার্কিন ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফাইজার। এরই মধ্যে চার কোটি ডোজ ভ্যাকসিন পৌঁছে গেছে যুক্তরাজ্যে। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে ভ্যাকসিন মজুদের স্থান প্রকাশ করা হয়নি। করোনাভাইরাস মহামারি থেকে মুক্তি পেতে ভ্যাকসিনের অপেক্ষায় ছিল বিশ্ব। ফাইজার-বায়োএনটেকের দাবি, তাদের টিকা করোনা রোধে ৯৫ শতাংশ সক্ষম। অক্সফোর্ড জানিয়েছে, তাদের ভ্যাকসিন ষাটোর্ধ্ব বয়সিদের শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করছে। মডার্নার টিকা ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ, রাশিয়ার টিকা ৯২ শতাংশ কার্যকর বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এগিয়ে চলেছে ভারত, চীনের টিকার হিউম্যান ট্রায়ালও। আজ শনিবার থেকেই স্পুটনিক ফাইভের ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছে রাশিয়া। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভ্যাকসিন পাবে বাংলাদেশও।

সূত্রমতে, যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রস্থলে এই ভ্যাকসিন রাখা হয়েছে। এখান থেকেই হাসপাতালগুলোতে ভ্যাকসিন বিতরণ করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে চার কোটি ডোজ দেয়া হবে ২ কোটি মানুষকে। ইংল্যান্ডের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রথম পর্যায়ের এই ভ্যাকসিন দিয়ে ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। ঠেকানো যাবে হাসপাতালে ভর্তিও। কারা পাচ্ছেন এই ভ্যাকসিন? ১) বৃদ্ধাশ্রমে থাকা বয়স্ক ও তাদের সেবকরা সবার আগে এই ভ্যাকসিন পাবেন। ২) এরপরই পাবেন ৮০ বছরের বেশি বয়সিরা ও সামনের সারির স্বাস্থ্য ও সেবাকর্মীরা। ৩) ৭৫ বছরের বেশি বয়সিরা। ৪) ৭০ বছরের বেশি বয়সিরা এবং একই সঙ্গে মুমূর্ষুরা থাকবেন এই তালিকায়। ৫) এরপর অগ্রাধিকার দেয়া হবে ক্রমান্বয়ে ৬০, ৫৫ ও ৫০ বছরের বেশি বয়সিদের। ৬) ১৬ থেকে ৬৪ বছর বয়সিদের মধ্যে যাদের অবস্থা গুরুতর তারাও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন পাবেন। করোনা থেকে পূর্ণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনে লাগবে দুইটি ডোজ। প্রথম ডোজ নেয়ার পর ১২ দিন পর রোগ প্রতিরোধ গড়তে শুরু করবে ফাইজার বায়োএনটেকের ভ্যাকসিন। ২১তম দিনে নিতে হবে ২য় ডোজ। ২৮তম দিনে পূর্ণ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতে সক্ষম হবেন ভ্যাকসিন গ্রহণকারী।
প্রকাশ্যে ভ্যাকসিন নেবেন ওবামা-বুশ-ক্লিনটন : মার্কিন নাগরিকদের উৎসাহিত করতে ক্যামেরার সামনে কোভিড ভ্যাকসিন নেবেন সাবেক তিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং বিল ক্লিনটন। ভ্যাকসিনের নিরাপত্তার বিষয়টি জানান দিতেই এমন পদক্ষেপ নিয়েছেন তারা। সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যান্থনি ফাউসি মনে করেন ভ্যাকসিন নিরাপদ ও কার্যকর, তাহলে তিনি তা গ্রহণ করবেন। ওবামা বলেন, অ্যান্থোনি ফাউসিকে সাধারণ মানুষ খুবই পছন্দ করেন। তার সঙ্গে কাজ করার দারুণ অভিজ্ঞতা রয়েছে আমার। তাকে বিশ্বাস করি, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। জনসম্মুখে কোভিড-১৯ টিকা নেয়ার বিষয়ে ওবামা আরো জানান, আমি আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি টিকা বের হলে আমি গ্রহণ করব। হয়তো তা টিভিতে বা ক্যামেরার সামনে গ্রহণ করবো। যাতে করে মানুষ বিশ্বাস করে আমি বিজ্ঞানে আস্থা রাখি। ওবামার এই মন্তব্যের পর বুশ ও ক্লিনটনের প্রতিনিধিরাও একই তথ্য জানিয়েছেন। তারা বলছেন, সাবেক এই দুই প্রেসিডেন্টও প্রকাশ্যে টিকা নিতে বেশ আগ্রহী। তবে কোন ভ্যাকসিন তারা নেবেন এ বিষয়টি জানাননি ওবামা। ফাইজার এবং বায়োএনটেকের ভ্যাকসিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদনের বিষয়ে জো বাইডেন প্রশাসনের আগামী বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে। করোনা এবং ভ্যাকসিনের বিষয়ে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেখানে নীরব, সেখানে সাবেক এই তিন প্রেসিডেন্টের এমন উদ্যোগে বেশ অবাক হয়েছেন অনেকেই।
১০০ কোম্পানির ভ্যাকসিন তালিকাভুক্ত: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০টি কোম্পানির ভ্যাকসিন আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটির তালিকাভুক্ত হয়েছে এবং হিউম্যান ট্রায়াল পর্যায়ে রয়েছে ১০টি। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেকের তৈরি তিনটি ভ্যাকসিনকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভ্যাকসিন প্রি-ক্লিনিক্যাল ক্যান্ডিডেটের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। হিউম্যান ট্রায়ালের অনুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও সাবেক ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, ফাইজার-বায়োএনটেক তাদের টিকা ৯৫ শতাংশ কার্যকর বলে জানিয়েছে। ভালো অগ্রগতি আছে অক্সফোর্ড আর অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন, মডার্না ও সিনোভ্যাকেরও। চূড়ান্ত পর্যায়ে আশানুরূপ ফল পেলে জরুরি অনুমোদন চাইবে কোম্পানিগুলো। সব প্রক্রিয়া শেষে নতুন বছরে বিশ্ব পাবে করোনা প্রতিরোধের টিকা। জানা গেছে, ফাইজারের ভ্যাকসিন তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালে সফল হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ফাইজার-বায়োএনটেকের তৈরি ভ্যাকসিন করোনা রোধে ৯৫ শতাংশ সক্ষম। তেমন কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও নেই। সব ঠিকঠাক চললে বড়দিনের আগেই বাজারে আসবে তাদের ভ্যাকসিন। মার্কিন ওষুধ উৎপাদনকারী সংস্থা ফাইজারের সঙ্গে এই ভ্যাকসিন তৈরিতে সহায়তা করছে জার্মান সংস্থা বায়োএনটেক। বায়োএনটেকের কর্ণধার উগুর সাহিন জানান, ‘সবকিছু ঠিকমতোই এগোচ্ছে। আশা করছি দ্রুতই সময়ের মধ্যে আমরা করোনার ভ্যাকসিন উৎপাদনের ছাড়পত্র পেয়ে যাব। বাজারে আনতে পারব ক্রিসমাসের আগেই। উগুর সাহিন আরও জানান, ট্রায়ালে দেখা গেছে, সব বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে করোনা প্রতিরোধে এই ভ্যাকসিন সমান কার্যকর। বিশেষত প্রবীণদের ক্ষেত্রে খুবই ভালো কাজ করছে এই ভ্যাকসিন। বিশ্বের ছয়টি দেশের প্রায় ৫০ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের ওপর ফাইজার-বায়োএনটেক করোনা টিকার পরীক্ষা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি মহামারী করোনার সম্ভাব্য ভ্যাকসিনটি ৬০-৭০ বছর বয়সিদের  ক্ষেত্রে শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করছে। আশা করা হচ্ছে অক্সফোর্ড আর অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি এই টিকা করোনায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা বয়স্ক মানুষকে সুরক্ষা দেবে। গবেষকরা বলছেন, বিখ্যাত ব্রিটিশ চিকিৎসা বিষয়ক জার্নাল ল্যানসেটে প্রকাশিত দ্বিতীয় দফার ফলাফলে ভ্যাকসিনটির ডোজ নেওয়া ৫৬০ সুস্থ স্বেচ্ছাসেবীর যেসব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা আশাজাগানিয়া। এ ছাড়া এই ভ্যাকসিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বলে ল্যানসেটে পিয়ার রিভিউ হওয়া ফলাফলে জানানো হয়েছে। ভ্যাকসিনটি যারা নিচ্ছেন তাদের শরীরে বৃহৎ পরিসরে মহামারী কভিড-১৯-এর সংক্রমণ ঘটে কি না- তৃতীয় ধাপের ট্রায়ালের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ বিষয়টিও দেখার চেষ্টা করছেন গবেষকরা। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ সংক্রান্ত প্রাথমিক ফলাফল পাওয়ার আশা করছেন তারা।
মডার্নার ভ্যাকসিন: যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি মডার্নার পরীক্ষাধীন ভ্যাকসিন ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কার্যকর বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও এ ভ্যাকসিন হাতের নাগালে পেতে বেশ কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে সবাইকে। মডার্নার প্রেসিডেন্ট ড. স্টিফেন হোগ বলেন, এটি সত্যিকার অর্থে একটা গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দুটি আলাদা সংস্থার কাছ থেকে করোনা মোকাবিলায় ভ্যাকসিনের একই রকম ফলাফল পাওয়াটাই সবচেয়ে বেশি আশা দেখাচ্ছে। এটা আমাদের সবার মধ্যে এমন আশা জাগিয়ে তুলবে।
কোভ্যাকসিন: ভারত বায়োটেক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড ব্যাপক আকারে তাদের কভিড-১৯ ভ্যাকসিন ‘ কোভ্যাকসিন’-এর তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করেছে। ভারতে পরিচালিত সর্ববৃহৎ কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং কভিড-১৯ ভ্যাকসিনের তৃতীয় পর্যায়ের প্রথম ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য সংস্থাটি মোট ২৬ হাজার অংশগ্রহণকারীকে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। ভারত বায়োটেকের নির্বাহী পরিচালক সাই প্রসাদ গত বলেছিলেন, সংস্থাটি আগামী বছর জুনের মধ্যে কভিড-১৯ ভ্যাকসিনটি চালু করার পরিকল্পনা করেছে। কার্যকারিতার তথ্য যদি ইতিবাচক হয়, তবে এটি ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে চালু করা হতে পারে। তাহলে এটি সেরাম ইনস্টিটিউটের কোভিশিল্ডের পর ভারতে চালু হওয়া দ্বিতীয় টিকা হবে।
স্পুটনিক ফাইভ: রাশিয়ায় কভিড-১৯-এর টিকার যে ট্রায়াল চলছিল তা ৯২ শতাংশ সফল বলে প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে। এই ট্রায়ালে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাদের এক অংশকে স্পুটনিক ফাইভ নামের এই টিকা দেওয়া হয়েছিল। বাকিদের যে ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল তাতে কোনো ভ্যাকসিনের ওষুধ ছিল না। এদের মধ্যে ২০ জনের শরীরে এই টিকা ৯২ শতাংশ সফলতা দেখিয়েছে। স্পুটনিক ফাইভ টিকা তৈরি করা হয়েছে মস্কোর এপিডেমিওলজি ও মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ক জাতীয় গবেষণা কেন্দ্রে।
ভ্যাকসিন কতদিন সুরক্ষা দেবে?: বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এসব ভ্যাকসিনের কোটি কোটি ডোজের ক্রয়াদেশ দিয়ে রেখেছে। এর মধ্যে শুধু যুক্তরাজ্য অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি ভ্যাকসিনের ১০ কোটি ডোজ, ফাইজার-বায়োএনটেকের ৪ কোটি ডোজ এবং মডার্নার তৈরি সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের ৫০ লাখ ডোজ কেনার জন্য চুক্তি করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সীতেশ চন্দ্র বাছার বলেন, শরীরে রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করলে তা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুরক্ষা দিয়ে থাকে। কোনো ভাইরাসের ভ্যাকসিন জীবনভর সুরক্ষা দেয় আবার অনেক ভাইরাসের ভ্যাকসিন এক বছর সুরক্ষা দেয়। করোনাভাইরাসে এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার সময়কাল কত দিন হবে তা বলা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ পরিস্থিতিতে গবেষকরা অত সময় পাচ্ছেন না যে, বিষয়টি গবেষণা করে দেখবেন।