বুধবার, মার্চ ৩
Shadow

পৌষেও মিলবে সুমিষ্ট আম

প্রাইম ডেস্ক :

জৈষ্ঠ্য মাসের মধুফল আম যদি পৌষের শিশিরে ভিজে থাকে তাহলে একটু আশ্চর্য হতেই হবে। চোখ কপালে উঠলেও সত্যটা এমনি যে, বগুড়ায় এখন বারোমাসি আম চাষ শুরু হয়েছে। জেলার শেরপুর উপজেলায় ৩ বন্ধু মিলে প্রায় ১৮ বিঘা জমিতে প্রায় ৯ হাজার বারোমাস আম চাষ করে ফলন পেতে যাচ্ছে। শীতকালেও আম চাষে সফলতা পাওয়ায় এলাকায় আম দেখতে ভিড় করছে সাধারণ মানুষ।

বারোমাসি আম বাগানটি গড়ে উঠেছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খামারকান্দি ইউনিয়নের মাগুড়াতাইর গ্রামে। প্রায় চল্লিশ বিঘা জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে এই মিশ্র ফলের বাগান। এরমধ্যে আঠার বিঘাতে জমিতে বারোমাসি আম চাষ করা হয়েছে। সেখানে নয় হাজার আমের গাছ রয়েছে। সেসব গাছে মুকুল ধরেছে। আবার কোন কোন গাছে আম ঝুলছে। কোন গাছে কাঁচা আবার কোন গাছে পাকা আম। বারোমাসি এই বাগানচি গড়ে তুলেছে তিন বন্ধু মামুন রশিদ, সোহেল রেজা ও শহিদুল। এরমধ্যে মামুন ও সোহেল মাস্টার্স পাস করেছেন। আর এইচএসসি পাস করেছেন শহিদুল। বাগানটির নাম দিয়েছে ‘ফুল এগ্রো ফার্ম লিমিটেড’। এই ফার্মে আম ছাড়াও বিভিন্ন প্রকার শীত সবজি, পেয়ারাসহ বিভিন্ন ফলের চাষও করে।
তিন বন্ধু মামুন, সোহেল ও শহিদুল জানান, ২০০৫ সালে ছোট পরিসরে নিজেদের পাঁচ বিঘা জমির ওপর বাগানটি গড়ে তোলা হয়। পরবর্তীতে আরও ৩৫বিঘা বিশ বছরের জন্য জমি লিজ নিয়ে বাগানের পরিসর বাড়ানো হয়। তাদের বাগানে প্রায় ১৫ হাজার রকমারি ফলমূলের গাছ রয়েছে। এরমধ্যে বারোমাসি আম কার্টিমন ও বারি-১১, মাল্টা, পিয়ারা ও কুল। অন্যান্য ফলের উৎপাদন ভাল হলেও বর্তমানে বারোমাসি আম বিক্রিতে ব্যস্ত তারা। অসময়ে পাওয়া এই ফলের চাহিদাও বাজারে অনেক বেশি। তাই এই বগুড়া জেলা ছাড়াও আশপাশের জেলাগুলোতেও এই আম বিক্রি হচ্ছে।

পাইকারি আগে তিনশ’ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও এখন পাঁচশ’ টাকায় বিক্রি করছেন। ইতিমধ্যে দুই লাখ টাকার আম বিক্রি করেছেন। আরও অন্তত এক লাখ টাকার আম বাগানে রয়েছে। সবমিলে এখন লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছেন। অনেকেই বারোমাসি আমের চারা কিনতে আসছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এই মিশ্র ফলের বাগান থেকে এক কোটি টাকার আম, কুল ও পিয়ারা বিক্রি করতে পারবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।

মিশ্র বাগানের উদ্যোক্তাদের একজন মামুনুর রশিদ জানান, তারা কৃষক পরিবারের সন্তান। তাই ছোট বেলা থেকেই কৃষিকাজের তাদের প্রতি আগ্রহ ছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দেশসেরা কৃষক হিসেবে নির্বাচিত করে মামুনকে থাইল্যান্ডে ফুড প্রডাকশন ও ম্যানেজমেন্টের ওপর প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। তিনি সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে আসেন। এরইমধ্যে সোহেল রেজা বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (আরডিএ) থেকে বারোমাসি আম চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। এছাড়া আরেক উদ্যোক্তা শহিদুল ইসলাম জীবিকার তাগিদে মালয়েশিয়ায় গেলেও ২০০১ সালে দেশে ফেরেন। পরবর্তীতে এই তিন বন্ধু যৌথভাবে বিভিন্ন নার্সারি থেকে চারা সংগ্রহ করে নিজেদের পাঁচ বিঘা জমির ওপর মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তোলেন। এরপর আরও জমি লিজ নিয়ে সেখানে লাগান বারোমাসি আম, পিয়ারা, মাল্টা ও কুল গাছের চারা। সময়ের ব্যবধানে বাগানটিতে লাগানো রকমারি ফলমূলের পনের হাজার গাছ রয়েছে। সেসব গাছে উৎপাদিত ফল বিক্রিও শুরু হয়েছে। তবে তাদের মিশ্র ফলের বাগানের বারোমাসি আম বেশ সাড়া জাগিয়েছে।

বগুড়া হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক আব্দুর রহিম জানান, বারোমাসি আম চাষ বাড়ছে। তাই চাষীদের সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকেই এই জাতের ফলের বাগান করে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। যার দৃষ্টান্ত হচ্ছেন এই তিন শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা। এই বারোমাসি আমের বাগান করে নিজেরা বেকারত্ব ঘুচিয়েছেন।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার জানান, এ উপজেলায় মিশ্র ফলের বাগান বাড়ছে। তার দপ্তর থেকে পরামর্শসহ সব ধরণের সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। এই ধারাবাহিকতায় মাগুড়াতাইর গ্রামটিতে গড়ে ওঠা ফুল এগ্রো ফার্ম লিমিটেড নামের মিশ্র ফলের বাগানেও একইভাবে সহযোগিতা করছেন। শিক্ষিত তিন বন্ধুর এই মিশ্র ফলের বাগানটি মডেল হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।