বুধবার, মার্চ ৩
Shadow

এবারের একুশের প্রত্যয়

মহান একুশে ফেব্রুয়ারি এবারে এসেছে একেবারেই ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও আবহ নিয়ে। কোভিড-১৯ বা মহামারী করোনাভাইরাস গ্রাস করেছে প্রায় গোটা পৃথিবীকে। ভয়াবহ সংক্রামক ও হন্তারক এই ব্যাধির বিরুদ্ধে মানবসভ্যতাকে লড়াই করতে হচ্ছে সবার মুখে মাস্কসহ স্বাস্থ্যবিধি মানা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে। বাংলাদেশসহ গুটিকয়েক দেশে সদ্য আবিষ্কৃত ভ্যাকসিন সীমিত পরিসরে প্রয়োগ শুরু হলেও করোনা প্রতিরোধে উপরোক্ত নিয়মবিধি মেনেই চলতে হবে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে এবারে ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে আয়োজন করা সম্ভব হয়নি মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা। অনুষ্ঠিত হবে না প্রভাতফেরি, শহীদ মিনারসহ বাংলা একাডেমি চত্বরে সুবৃহৎ জনসমাবেশ। তেমন আড়ম্বর-আয়োজনে পালিতও হবে না আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে নানা অনুষ্ঠান। কিছু অনুষ্ঠানের অয়োজন হবে রেডিও-টেলিভিশনসহ ভার্চুয়াল মাধ্যমে। মহান একুশের চিরকালের বেদনাবিধুর পরিবেশ হয়ত বিরাজ করবে, সমবেত কণ্ঠে গীতও হবে- আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি …। সমস্ত বাঙালীর সম্মিলিত এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে স্বাধীনতার মাস মার্চে পালিত হবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। তখন অনুষ্ঠিত হবে বইমেলা ১৮ মার্চ থেকে। শোকের মাস ফেব্রুয়ারিতে এটুকুই যা সান্ত্বনা ও আনন্দের।

একুশ মানে মাথা নত না করা। কথাটির যথার্থতা বারবার প্রমাণিত হয়েছে বাংলাদেশে। একুশ শিখিয়েছে অন্যায়, অবিচার ও অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী, প্রতিরোধী হতে। বায়ান্নর সেই ঐতিহাসিক একুশে ফেব্রুয়ারি ৬৭ বছর পেরিয়ে ৬৮ বছরে পদার্পণ করেছে। অমর একুশের চেতনা আজও অমলিন। সেদিন মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলার তরুণরা মাতৃভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বাজাত্যবোধের যে মশাল প্রজ্বালিত করেছিলেন, সেই আলো দেশের সীমানা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। বর্তমানে এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয় বিশ্বের সর্বত্র।

মাতৃভাষার জন্য আত্মদানের এমন নজির বিশ্বে আর নেই। রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে একুশের প্রভাব এতটাই সর্বব্যাপী যে, ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। আত্মপরিচয় বিস্মৃত জাতিকে স্বরূপের সন্ধান দিয়েছে মহান একুশ। জাতি হিসেবে একতাবদ্ধ করেছে যেমন, তেমনি জুগিয়েছে অপরিমেয় শক্তি ও সাহস। অদম্য আত্মবিশ্বাসে করেছে বলীয়ান। একুশ বাঙালীর আবহমানকালের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন রত্নভাণ্ডারের সঙ্গে যুক্ত করেছে বাঙালী জাতিকে। দিয়েছে সঠিক পথের সন্ধান। একুশের পথ ধরে তাই গণঅভ্যুত্থান পেরিয়ে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বাঙালী পেয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম ভাষাভিত্তিক এক দেশ। বাঙালী ও বাংলাদেশ যতদিন থাকবে বিশ্বের বুকে, ততদিন থাকবে অমলিন বাংলা ভাষা ও অমর একুশে। কারণ, একুশের শিকড় প্রোথিত বাঙালীর চেতনার গভীরে। দেশের মানুষ কখনই সামরিক ও স্বৈরশাসনের কাছে মাথা নত করেনি। আপোস করেনি গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে। আর এসব কিছুরই প্রেরণা হয়ে আছে মহান একুশে। একুশ মৌলবাদ, জঙ্গীবাদ, সন্ত্রাসবাদ, দুর্নীতি, নাশকতা, নৃশংসতা ও মাদকের বিরুদ্ধে আপোসহীন লড়াইয়ের প্রেরণা। বাঙালী এই দিনে আবার জেগে ওঠে বাঙালী জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে। গণতন্ত্র ও উন্নয়নকে সুসংহত করার সুদূর অঙ্গীকারে।