বুধবার, মার্চ ৩
Shadow

প্রবাসী আয়ে চমক

বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশী শ্রমজীবীরা। গত বছর করোনা মহামারীর কারণে বিশ্বের অনেক দেশের রেমিটেন্স তথা প্রবাসী আয় যখন কমেছে, তখন বাংলাদেশে তা বেড়েছে ঈর্ষণীয় হারে। ২০২০ সালে বিশ্বের উন্নয়নশীল ১০টি দেশের মধ্যে সাতটিরই প্রবাসী আয় কমলেও সমালোচকদের মুখে ছাই দিয়ে যে তিনটি দেশের রেমিটেন্স বেড়েছে, তার মধ্যে শীর্ষ তিনে আছে বাংলাদেশ। বাকি দুটি দেশ পাকিস্তান ও মেক্সিকো। বিশ্বব্যাপী পর্যালোচনা করে এই খবর প্রকাশ করেছে বিখ্যাত সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। তবে সংস্থাটি বলেছে, ২০২১ সালে সেটি আবার কমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। কেননা, করোনা মহামারীর জেরে অনেক দেশের শিল্প-কারখানা ও নির্মাণ শিল্প সঙ্কুুচিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থান কমে আসতে পারে। তবে এটি যে ঘটবেই, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কেননা করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কার এবং দেশে দেশে তার প্রয়োগ শুরু হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতি মোকাবেলায় তা ঘুরে দাঁড়ানোরও সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

দেশে ও বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর এই দুঃসময়েও বাংলাদেশের জন্য এক পরম প্রাপ্তি ও গৌরব বয়ে এনেছেন প্রবাসীরা। এবার অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি। করোনাভাইরাসজনিত সঙ্কটে যখন দেশে-বিদেশে অর্থনীতির চাকা প্রায় স্থবির, আমদানি-রফতানি ঠেকেছে তলানিতে এবং পোশাক ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি রয়েছে রীতিমতো হুমকিতে, তখন এর চেয়ে আশা জাগানিয়া খবর আর কি হতে পারে? বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে এক হাজার ৮৪০ কোটি ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ৪ শতাংশ বেশি। আর ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৯৮৮ কোটি ডলার। প্রধানত এই প্রবাসী আয়ের ওর ভিত্তি করে এবার বাংলাদেশের বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভও প্রথমবারের মতো অতিক্রম করেছে ৩৬ বিলিয়ন ডলার। এক্ষেত্রে অবশ্য সরকারের প্রবাসী আয়ে নগদ ২ শতাংশ হারে প্রণোদনাও বিশেষ উৎসাহ জুগিয়েছে বৈকি। সদ্য ঘোষিত জাতীয় বাজেটেও এই প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এতে বৈধ পথে অর্থ প্রেরণের পরিমাণ বেড়েছে এবং অবৈধ পথে রেমিটেন্স প্রেরণে হয়রানিসহ বর্ধিত ব্যয় হচ্ছে না।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক শ্রম সংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক হিসাবে জানা যায়, বিশ্বের ১৬৯টি দেশে অন্তত এক কোটি ২০ লাখের মতো বাংলাদেশী রয়েছে, যাদের অধিকাংশই শ্রমিক। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশই রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি দেশে। তবে সমস্যাও কিছু আছে। অবৈধ অভিবাসীদের পাশাপাশি এমনকি যারা বৈধভাবে দীর্ঘদিন প্রবাসে কর্মরত, তাদেরও বাংলাদেশে পাঠানোর তোড়জোড় চলছে। এক হিসাবে জানা যায়, শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই কয়েক লাখ শ্রমিককে পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি করোনার ভয়ঙ্কর ছোবল তো রয়েছেই। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে আট শতাধিক বাংলাদেশী মৃত্যুবরণ করেছেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে। প্রবাসী বাংলাদেশী শ্রমজীবীদের সঙ্কট-সমস্যার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অবশ্য কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে প্রবাসীদের কল্যাণে দু’শ’ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন, যা প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের বাইরে। এর পাশাপাশি বিদেশ ফেরতদের স্বকর্মসংস্থানের জন্য সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়া হবে। তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে কোন জামানত লাগবে না। তদুপরি দেয়া হবে কৃষি খামার, গবাদিপশু হাঁস-মুরগি পালন, সেলাই মেশিনসহ আত্মনির্ভরশীল হওয়ার প্রশিক্ষণ। তবে তা নিয়ে যেন কোন নয়-ছয় তথা দুর্নীতি-অনিয়ম না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে।