শুক্রবার, মে ৭
Shadow

ভালোবাসায় বাঁচুক প্রতিবেশী

প্রাইম ডেস্ক :

জগৎ সংসার মানুষের। মানুষের বসবাসে পৃথিবীর শহর-নগর আলোকিত। পাড়া-মহল্লা জাগ্রত, শোভিত। মানুষের পিঠে চড়ে পৃথিবীর বয়স বাড়ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে জগৎপাড়ার শ্রী। মানুষকে পেছনে ফেলে সভ্য পৃথিবী এগোতে পারবে না এক কদম সামনে। পৃথিবীর সৃজন, নির্মাণ, বেড়ে ওঠা, সুন্দর, সাদরিত, বরিত করতে হলে গঠন করতে হবে আলোকিত সুবাসিত সমাজ। সভ্য সমাজ এবং মনুষ্য বসবাস উপযোগী সমাজ গঠন করতে হলে সমাজে থাকতে হবে আদর্শবান ও চরিত্রবান  মানুষ; মানুষে মানুষে ভালোবাসা, বিপদে সহযোগী, দুঃখের সহযোদ্ধা, কষ্টের সাথী হতে হবে সমাজ সদস্যদের। ফেরি করে বেড়াতে হবে বিশুদ্ধ প্রেমের ফল্গুধারা। রাতের আঁধারে দিনের অলস সময়ে খোঁজ করে করে নরম নরম ভালোবাসার হাত বুলিয়ে দিতে হবে সেই দুঃখী মানুষের ওপর। জীবনবাতির প্রদীপদানিতে জ্বালাতে হবে বিশ্বাসের আলো। পাশের মানুষের জীবননদীতে জোয়ার বইয়ে দিতে হবে প্রণয়প্রীতির। প্রতিবেশীর হৃদয় মিনারে প্রজ্বলিত করতে হবে বেঁচে থাকার সাহসী আলো। তার পাশে দাঁড়াতে হবে বটবৃক্ষ হয়ে। তার জন্য বিছিয়ে দিতে হবে কোমল কোমল চাদর। তার বিপদে ছুটে যেতে হবে দুরন্ত রকেট হয়ে। সাধ্যমতো দয়া-অনুগ্রহের নির্মল শহরে জায়গা দিতে হবে প্রতিবেশীকে। তার প্রতি নজর দিতে হবে পবিত্র চোখের। চলতে হবে হেঁটে যাওয়ার পথে।

প্রতিবেশী প্রতিবেশীর ভাই। হৃদয়ের ভালোবাসার হকদার। প্রতিবেশীর অস্তিত্ব মিশে থাকে আরেক প্রতিবেশীর হৃদয়ের মর্মমূলে। চেতনার শিখরে। প্রতিবেশীর প্রতি দয়া-অনুগ্রহ করার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা।  পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘তোমরা সবাই আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না, মা-বাবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো, নিকটাত্মীয়, এতিম ও মিসকিনদের প্রতি এবং প্রতিবেশী আত্মীয়ের প্রতি, আত্মীয় প্রতিবেশীর প্রতি, পথ চলার সাথী ও পথিকদের প্রতি এবং তোমাদের অধীন ক্রীতদাস ও দাসীদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করো।’ (সূরা নিসা : ৩৬)।
আল্লাহর একত্ববাদ এবং রাসুলের আনীত দ্বীনের ওপর বিশ্বাসী একজন মুসলমানের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন হলো পালনকর্তার সন্তুষ্টি। তার স্বপ্ন ভাবনায়, বেঁচে থাকার সম্ভাবনাময় দিনগুলোজুড়ে থাকে রাব্বুল আলামিনের ভালোবাসা অর্জনের কৌশল। বান্দার জন্য জগতের সুবিস্তৃত মাঠকে করে দিয়েছেন সহজ সাবলীল ও শোভন, শ্রীতে ভরপুর। মনজিলে মাকসুদে পৌঁছার সহজ কর্মপন্থা বলে দিয়েছেন রহমতের চাদর বিস্তৃত করে। অল্প অল্প আমলে সওয়াবের বিশাল ভা-ার এবং নাজাতের সুসংবাদ দিয়েছেন শুদ্ধ গ্রন্থের বাণীতে। পৃথিবীর মঞ্চে সৌভাগ্যশীল হয়ে সর্বশেষ আখেরাতের শহরে সফলতাকে সহজে চুম্বন করতে মানবজাতির জন্য দিয়েছেন সহজসাধ্য আমল। কল্যাণকে সম্পৃক্ত করেছেন প্রতিবেশীর ভালোবাসার সঙ্গে। আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠত্বতার দাবি নিয়ে হাজির হতে হবে প্রতিবেশীকে ভালোবেসে। প্রতিবেশীর কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ হলে ব্যক্তির জীবন হবে সুখকর লোবানে ভরপুর এবং ব্যক্তি হবে আল্লাহর প্রিয় বান্দা। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘বন্ধুদের মধ্যে আল্লাহর কাছে উত্তম বন্ধু ওই ব্যক্তি যে তার সঙ্গীর কল্যাণকামী, প্রতিবেশীদের মধ্যে আল্লাহর কাছে উত্তম প্রতিবেশী ওই ব্যক্তি, যে তার প্রতিবেশীর কল্যাণকামী।’ (তিরমিজির সূত্রে রিয়াজুস সালেহিন : ৩১১)।
মানুষকে ঘিরে সমাজ গড়ে ওঠে। সমাজের শুদ্ধ থাকাটা নির্ভর করে মানুষের ওপর। সমাজকে নির্মাণে সৃজনে আলোকিত করতে হলে মানুষকে হতে হবে আলোকিত মননের। ফেরি করতে হবে বিশুদ্ধ আলোর। সমাজে বসবাসকারী এলিট নিম্ন শ্রেণীর কাউকে কেউ উপেক্ষা করে সমাজকে এগিয়ে নিতে পারবে না। একটা সমাজকে স্বপ্ন সভ্যতায়, নির্মাণে চূড়ান্ত সফলতায় পৌঁছাতে হলে গরিবকে কোলে তুলে নিতে হবে অপার ভালোবাসায়। তার বিপদে আপদে যেতে হবে এগিয়ে। নিজের খাবারের একটা অংশ বিলিয়ে দিতে হবে দরবারে। একজন গরিব অসহায় অভাব-অনটনে তিন বেলা পেট পুরে খেতে অক্ষম; সুতরাং ধনীমাত্রই মানবতার পাঠ নিয়ে দাঁড়াবে সেই মানুষটার পাশে। প্রয়োজনে বাড়িয়ে দেবে তরকারিতে ঝোল। এই পবিত্র শিক্ষা দিয়েছেন ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.)। প্রতিবেশীকে নিজের খাবার বিলিয়ে দেয়ার শিক্ষাটা বাঙ্ময় হয়ে ফুটে ওঠে রাসুলের হাদিসে। আবু জার (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেন, ‘হে আবু জার! যখন তুমি তরকারি পাকাও, তাতে একটু বেশি পানি দিয়ে ঝোল বাড়াও এবং তোমার প্রতিবেশীকে পৌঁছাও।’ (মুসলিম : ২৬২৫)।
খুব ভোরে যদি ঘুম থেকে উঠে জানালার গরাদ ধরে কিংবা দরজা খুলে চোখ মেলে তাকানো হয়, তাহলে আমাদের চোখের পুতলিতে যে মুখটা ভেসে আসবে, নিশ্চয় সেটা আমাদের প্রতিবেশীর। আমাদের অসুস্থতায়, দুর্ভাবনায়, সামন্য উফ শব্দে যে ব্যথিত হবেন, ভালোবাসার কোমল হাত ও বিশ্বাসী চোখ নিয়ে আমার মাথায় হাত রাখবে, নিশ্চয় সে প্রতিবেশী। প্রতিবেশী আমাদের জীবনে মিশে আছে নিজ ছায়ার মতো। অক্সিজেনের মতো দিচ্ছে বেঁচে থাকার পরম সমীরণ। আমাদের প্রতিবেশী যেন নিজ সন্তানের অপর নাম। প্রতিবেশী অপর প্রতিবেশীর ভালোবাসার, আদরের, আবদারের মৌয়াল। ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকারের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেশীকে গুরুত্ব দিয়েছে পৃথিবীর অন্যসব অধিকার থেকে একটু বেশি। মানবতার নবী প্রতিবেশীর ব্যাপারে মানবজাতিকে দিয়েছেন শাশ্বত চূড়ান্ত পাঠ। হাদিসে এসেছে, আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেন, ‘হজরত জিবরাঈল এসে আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে অবিরত উপদেশ দিতে থাকলেন। এমনকি আমার মনে হলো, হয়তো তিনি প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।’  (বোখারি : ৬০১৫; মুসলিম : ২৬২৪)।
ইসলামী আইন শাস্ত্রে প্রতিবেশীকে মাপা হয়েছে ভালোবাসার বাড়তি পাল্লায়।  প্রতিবেশির হক করেছে চিরন্তন নিশ্চিত। প্রতিবেশীর সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম অধিকার পাবে নিকটতম প্রতিবেশী। উপরন্তু প্রতিবেশীর অগোচরে কেউ যদি সম্পত্তি বিক্রি করে দেয়, তাহলে ইসলামী আইন বলে, প্রতিবেশী ব্যক্তি এই সম্পদ আদায়ে আদালতে আইন পেশ করে সম্পত্তি ফিরিয়ে আনতে পারবে। এবং আদালত তার পক্ষে রায় দেবে। (হেদায়া)।
সমাজে সব ধরনের মানুষ বাস করে। গরিব-ধনী পাশাপাশি থাকে। এখন কেউ কাউকে উপেক্ষা করে পাঁজর শক্ত করে দাঁড়াতে পারবে না সভ্য এবং উন্নত পৃথিবীতে। টাকার জোরে, বংশীয় আধিপত্যে চেপে ধরা যাবে না গরিব প্রতিবেশীর টুঁটি। ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না অসহায় অভাবী প্রতিবেশীকে। তার ওপর চর্চা করা যাবে না অনধিকার। মিথ্যা অজুহাতে তার মাথার ওপর বসানো যাবে না নির্মম আঘাত। গরিব বলে তার দরজার সামনে, জানালার কিনারে, চালের ওপর ফেলা যাবে না ময়লার দুর্গন্ধ স্তূপ। অনিষ্ট করা যাবে না গরিব প্রতিবেশীকে। প্রতিবেশী আমারই বোন। আমারই ভাই। আমার হৃদয় মিনারের কোনো বাসিন্দা। প্রতিবেশী গরিব হলে তার ব্যাপারে অন্তর থেকে ‘সুবোধ পালিয়ে গেলে’ জীবনে আসবে বড় রকমের দুর্যোগ। পৃথিবীর মালিক হবে অসন্তুষ্ট। কেননা মোমিনের সম্পর্কটা প্রতিবেশীকে ভালোবাসার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। হাদিসে স্পষ্ট ঘোষিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মোমিন নয়, আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মোমিন নয়, আল্লাহর কসম! সে ব্যক্তি মোমিন নয়। জিজ্ঞাসা করা হলো, ইয়া আল্লাহর রাসুল! কে সেই ব্যক্তি? তিনি বলেন, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।’ (বোখারি : ৬০১৬)।

Leave a Reply

Your email address will not be published.