মঙ্গলবার, এপ্রিল ২০
Shadow

বর্তমান সেনাবাহিনী অনেক বেশি আধুনিক, স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং চৌকস :প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক  :

ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করা সশস্ত্র বাহিনীর পবিত্র দায়িত্ব। আজ যারা সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেছ, তারাও এই দায়িত্বের অংশীদার হলে। দেশের মানুষের সুখ দুঃখে পাশে থেকে তাদের কল্যাণে নিজেদের আত্মত্যাগ করতে হবে। তোমাদের আজ থেকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সজাগ ও সদা প্রস্তুত থাকতে হবে। বুধবার চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে (বিএমএ) আয়োজিত রাষ্ট্রপতি প্যারেড অনুষ্ঠানে ৭৫তম দীর্ঘমেয়াদী কোর্সের কমিশনপ্রাপ্তদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ থেকে তোমাদের ওপর ন্যস্ত হচ্ছে দেশমাতৃকার মহান স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব। সর্বোচ্চ ত্যাগের বিনিময় হলেও দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করাই হবে তোমাদের জীবনের প্রথম ও প্রধান ব্রত। মনে রাখবে অনেক রক্ত আর ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই স্বাধীনতা। কাজেই এ দায়িত্ব পালনে তোমাদের সজাগ ও সদা প্রস্তুত থাকতে হবে।

রাষ্ট্রপতি প্যারেড অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, এমপি, তিন বাহিনীর প্রধানসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা উপস্থিতি ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন নবীন কর্মকর্তাদের পিতা মাতাও। বর্ণাঢ্য রূপে ভাটিয়ারি মিলিটারি একাডেমিকে সাজানো হয়েছিল। নবীন কর্মকর্তাদের প্যারেডে মুগ্ধ ছিলেন আমন্ত্রিত অতিথিরা। প্রতিটি পর্বে তাদের করতালির মাধ্যমে স্বাগত জানায় উপস্থিত সকলে। প্রধানমন্ত্রী তাদের এই সুনিপুন প্যারেডে ভূয়সী প্রশংসা করেন। একাডেমির গোটা পরিবেশ ছিল নবীন কর্মকর্তাদের তিন বছরের অর্জিত প্রশিক্ষণের বহির্প্রকাশ।

কমিশনপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের জনগণের পাশে থাকার এবং দেশ সেবার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমরা নিঃস্বার্থভাবে জনগণের পাশে থাকবে এবং দেশের সেবা করবে। উর্ধতন কর্মকর্তাদের প্রতি অনুগত এবং অধীনস্তদের প্রতি সহমর্মী হতে হবে তোমাদের। তোমাদের জন্য রইল আমার শুভকামনা। দেশ-বিদেশে দায়িত্ব পালনে দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব দেখিয়ে আমাদের সেনাবাহিনী সব মহলের প্রশংসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তোমাদের এ সুনাম আরও এগিয়ে নিতে হবে। বিশ্বের যে কোন প্রান্তের মানুষ শান্তি আর সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জানবে- এটিই আমার প্রত্যাশা। তোমাদের মনে রাখতে হবে, তোমরা এদেশের সন্তান। জনগণের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তোমাদের সকলকেই সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্নার সমান অংশীদার হতে হবে। দাঁড়াতে হবে যে কোন দুর্যোগ ও দুঃসময়ে বিপন্ন মানুষের পাশে। সম্প্রতি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন, সুশৃঙ্খলভাবে ত্রাণ বিতরণ এবং তাদের পরিচয়পত্র তৈরিতে সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এছাড়াও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দুর্গম পার্বত্য এলাকায় সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে মহাসড়ক, সেতু ও ফ্লাইওভার নির্মাণ, ভোটার তালিকা ও মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রেও দক্ষতা দেখিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের সেনাবাহিনীর জন্ম। স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি শক্তিশালী ও প্রশিক্ষিত একটি সেনাবাহিনী গড়ে তোলার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে প্রতিরক্ষা নীতি প্রণয়ন করেন। বিভিন্ন সেনানিবাসের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি একটি বিশ^মানের মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি। সর্বপ্রথম ১৯৭৪ সালে কুমিল্লা সেনানিবাসে অস্থায়ী ভিত্তিতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি স্থাপন করেন। ১৯৭৪ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, ‘ইনশাআল্লাহ এমন দিন আসবে, যখন এই একাডেমি শুধু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় নয় সারা দুনিয়াতে সম্মান অর্জন করবে।’ আজ তার সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটেছে। আমাদের সেনাবাহিনী অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা পাচ্ছে। বিশ^ দরবারে মাথা উঁচু করে আমাদের সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। বিদেশে মিশনগুলোতে বাংলাদেশের সুনাম বয়ে নিয়ে আসছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐদিন তাঁর বক্তৃতায় নবীন সামরিক অফিসারদের পেশাগতভাবে দক্ষ, নৈতিক গুণাবলীসম্পন্ন এবং দেশপ্রেমের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে গড়ে উঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন। জাতির পিতার সেই দূরদৃষ্টি সম্পন্ন প্রতিরক্ষা নীতির অনুসরণে আমরা ফোর্সেস গোল-২০৩০ প্রণয়ন করেছি। গত ৯ বছরে আমরা সেনাবাহিনীর অবকাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি সক্ষমতা বহুলাংশে বৃদ্ধি করেছি। সেনাবাহিনী আধুনিকায়নে তাঁর সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের আমরা নতুন নতুন ব্রিগেড, ইউনিট ও ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠাসহ এনডিসি, বিপসট, এএফএমসি, এমআইএসটি এবং এনসিওস একাডেমির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রতিষ্ঠা করেছি। সেনাবাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক এপিসি, এআরভি, ব্যাটেল ট্যাংক, আরমার্ড রিকভারি ভেহিকেল, হেলিকপ্টার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্র এবং সরঞ্জামাদি ক্রয় করা হয়। আজকের বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অবকাঠামোগত, কৌশলগত এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে এক দশক আগেকার সেনাবাহিনীর চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আধুনিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামাদির সমন্বয়ে আজকের সেনাবাহিনী অনেক বেশি উন্নত, দক্ষ এবং চৌকস। আজকে যারা কমিশনপ্রাপ্ত নবীন সামরিক অফিসার হলে, তোমরা তোমাদের পেশাগত দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে নৈতিক গুণাবলী দিয়ে সম্পন্ন করবে। দেশপ্রেমের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে দেশ গড়ে তুলবে। এই আহ্বান রইল তোমাদের প্রতি।

শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মেয়াদে আমরা নতুন নতুন ব্রিগেড, ইউনিট ও ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠাসহ এনডিসি, বিপসট, এএফএমসি, এমআইএসটি ও এনসিওএস একাডেমির মত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছি। সেনাবাহিনীর অপারেশনাল সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পর্যাপ্ত সংখ্যক এপিসি, এআরভি, ব্যাটল ট্যাংক, আরমার্ড রিকোভারি ভেহিকেল হেলিকপ্টারসহ প্রয়োজনীয় সমরাস্ত্র সরঞ্জামাদি বাহিনীতে যুক্ত করেছি। আজকের সেনাবাহিনী অবকাঠামোগত, কৌশলগত এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে এক দশক আগের সেনাবাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি আলাদা। আধুনিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জামাদির সমন্বয়ে আজকের সেনাবাহিনী অনেক বেশি উন্নত, দক্ষ ও চৌকস। এসব কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, সেনাবাহিনীর সঙ্গে আমার রয়েছে সুদৃঢ় পারিবারিক বন্ধন।

বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিকে একটি অত্যাধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানস¤পন্ন একাডেমিতে পরিণত করার লক্ষ্যে তাঁর সরকার কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এখানে ইতোমধ্যে ক্যাডেটদের ইনডোর প্রশিক্ষণের সকল প্রকার অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে এ একাডেমিতে বিভিন্ন বিষয়ে ৪ বছর মেয়াদী অনার্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী চালু করা হয়েছে। একইসঙ্গে ক্যাডেটদের কমিশন লাভের সময়কাল ২ থেকে ৩ বছরে উন্নীত করা হয়েছে। এই প্রথমবারের মতো ক্যাডেটরা একেবারে লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন লাভ করল।

আন্তর্জাতিক পরিম-লে অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দারিদ্র্যদূরীকরণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়নসহ নানা ক্ষেত্রে আমরা শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, অনেক উন্নত দেশকে ছাড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি। গত অর্থ বছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধিও হার ছিল ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০০৫ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১ শতাংশ। সেখান থেকে কমিয়ে বর্তমানে দারিদ্র্যের সংখ্যা ২২ শতাংশে এনেছি। একই সালে মাথাপিছু আয় ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার। এখন তা বেড়ে ১ হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৩২ বিলিয়ন ডলারে পরিণত হয়েছে। আমরা নিজেদের অর্থ দিয়ে পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করব। আর এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিশে^ পরিচিতি লাভ করবে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে। একটি প্রশিক্ষিত ও আধুনিক সেনাবাহিনী গঠনে এ উদ্যোগ যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে বলে আমি আশা রাখি। নতুন ক্যাডেটদের কমিশন লাভের জন্য অভিনন্দন ও শুভেচ্ছাও জানান প্রধানমন্ত্রী। এ দিনের কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে ৩৫০ জন ক্যাডেট কমিশন লাভ করেছে। এর মধ্যে ৩৪৩ বাংলাদেশী, ৫ ফিলিস্তিনী এবং ২ জন শ্রীলঙ্কার ক্যাডেট রয়েছে।

ব্যাটালিয়ন সিনিয়র আন্ডার অফিসার সাদমানুর রহমান ৭৫তম বিএমএ লং কোর্সে বেস্ট অলরাউন্ড নৈপুণ্যের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ‘সোর্ড অব অনার’ লাভ করেন। তিনি একই মিলিটারি বিষয়ে সর্বোচ্চ মান অর্জন করায় ‘আর্মি চিফ গোল্ড মেডেল’ও লাভ করেন।

এর আগে, প্রধানমন্ত্রী একটি খোলা জিপে করে সুসজ্জিত প্যারেড পরিদর্শন করেন এবং সালাম গ্রহণ করেন। তিনি বিশেষ কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পাসিং আউট ক্যাডেটদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন।

সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মুহম্মদ শফিউল হক এবং বিএমএ কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল সাইফুল আলম এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাগণ, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, নৌবাহিনী প্রধান, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, কূটনৈতিকবৃন্দ, আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ এবং কমিশনপ্রাপ্ত ক্যাডেটদের অভিভাবকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছলে তাঁকে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মুহম্মদ শফিউল হক, ২৪ ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের জিওসি এবং চট্টগ্রামের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মোঃ জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার, জেনারেল অফিসার কমান্ডিং অব আর্মি ট্রেনিং এ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ড লে. জেনারেল আব্দুল আজিজ এবং বিএমএ কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল সাইফুল আলম প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।