মঙ্গলবার, এপ্রিল ২০
Shadow

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ

প্রাইম আন্তর্জাতিক :

মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে আন্তর্জাতিক গণ আদালতে শেষ পর্বের শুনানিতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে। বৃহস্পতিবার হবে যুক্তিতর্ক শুনানি।

বুধবারের শুনানিতে গণ-আদালতে সাক্ষ্য দেন মিয়ানমারের রোহিঙ্গা, কারেন, কাচিনসহ স্থানীয় জাতিগোষ্ঠীর কয়েকজন প্রতিনিধি।

তারা দেশটিতে সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতনের বর্ণনা তুলে ধরেন। রোহিঙ্গারা শুনানিতে অংশ নিয়ে আদালতে বলেন, মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী জাতিগত নিধন ও দমন  অভিযান চালাচ্ছে।  সেনাবাহিনী ও পুলিশ মিলে রোহিঙ্গাদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করছে। তাদের বাড়িঘন পুড়িয়ে ভিটেছাড়া করছে।

এর আগে সোমবার শুনানি শুরু হলে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিরা তাদের ওপর নির্যাতনের জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী ছাড়াও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) এবং দলের  নেত্রী অং সান সু চির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন।

সু চিসহ দেশটির সেনাবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা  যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ইতিমধ্যে অভিযুক্ত হয়েছেন। ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে কুয়ালালামপুরের মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে শুরু হওয়া গণ আদালতের রায় ঘোষণা হবে ২২ সেপ্টেম্বর শুক্রবার।

এ আদালতে সরকারের পক্ষ থেকে  জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কাজী রিয়াজুল হকও শুনানিতে অংশ নেন।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা ও কাচিন জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা সবাই  মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বর্বর নিপীড়নের নানা বর্ননা তুলে ধরেন। তারা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনেন। অন্যদিকে রোহিঙ্গারাদের প্রতিনিধিরাও  রাখাইনে চলমান অভিযানকে জাতিগত নিপীড়ন হিসেবে তুলনা করেন। এমনকি তারা সবাই সু চির প্রতি চরম ক্ষোভ দেখান। তাঁর বিরুদ্ধে বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনেন রোহিঙ্গারা। রাখাইনে চলমান সেনা অভিযান ও নির্যাতনের দায়ের সু চির প্রতি তারা ঘৃণা জানান।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানানোর প্রেক্ষাপটে এই অধিবেশনের আয়োজন করা হয়। ‘প্রসিকিউশন ফোর্সড ডিসপ্লেসমেন্ট অ্যান্ড জেনোসাইড অব রোহিঙ্গা, কাচিন, শান, কারেন অ্যান্ড আদার মাইনরিটিস অব মিয়ানমার’ শীর্ষক জবানবন্দিতে বুধবার গ্রেগরি স্ট্যানটন সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার আলোকে বলেন, মিয়ানমারে যা ঘটেছে তা জাতিগত নিধন। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ম্যাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডিজ অ্যান্ড প্রিভেনশনের গবেষক অধ্যাপক গ্রেগরি স্ট্যানটন।

বুধবার ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দিতে  তিনি বলেছেন, ১৯৬২ সালে নে উইনের নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে রোহিঙ্গা, কাচিন, শান, কারেন এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে।  তিনি তাঁর জবানবন্দিতে রোহিঙ্গা ও কাচিনদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী ও পুলিশ কীভাবে গণহত্যা চালিয়েছে, তার সাক্ষ্যপ্রমাণ তুলে ধরেন।

স্ট্যানটন তার পাঁচ পৃষ্ঠার জবানবন্দির উপসংহারে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার দায়ে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য বৌদ্ধ মিলিশিয়া এবং মিয়ানমারের বর্তমান বেসামরিক সরকারকেও অভিযুক্ত করেছেন। কেন রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সর্বস্তরে সীমাহীন বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার, তা চিহ্নিত করে তিনি বলেছেন, তারা জাতিগতভাবে বৈষম্যের শিকার। কারণ, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সংবিধানের অধীনে তালিকাভুক্ত ১৩৫টি জাতিগত সংখ্যালঘুর একটি বলে গণ্য হয়নি।

তার কথায়, জাতিগত বর্মিরা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ অভিবাসী হিসেবে গণ্য করে। নাগরিকত্ব না থাকার কারণে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার নেই। তারা রাষ্ট্রবিহীন। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র দিতে অস্বীকার করেছে, যা দেশের মধ্যে ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয়। তাদের পাসপোর্টও দেয়া হয় না। উচ্চতর শিক্ষা নিতে তারা কোনো বিদ্যাপীঠে যেতে পারে না। রোহিঙ্গারা ভূমি ও সম্পদের অধিকার থেকেও বঞ্চিত।

স্ট্যানটন তার লিখিত জবানবন্দিতে আরও বলেন, নির্যাতিত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ বা মালয়েশিয়ায় নৌকাযোগে পালানোর চেষ্টা করলেও এসব দেশে তারা উদ্বাস্তুর মর্যাদা পায় না। প্রতিবছর শত শত রোহিঙ্গা নৌকাডুবিতে প্রাণ হারায়। আর অনেকেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কর্তৃক সীমান্তে পোঁতা মাইন বিস্ফোরণে প্রাণ দিচ্ছে। পলায়নরত রোহিঙ্গাদের সামরিক বাহিনী গুলি করে হত্যা করছে।

সাত সদস্যের এই বিচারক প্যানেলের প্যানেলে আছেন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলারসের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও আর্জেন্টিনায় সেন্টার ফর জেনোসাইডের প্রতিষ্ঠাতা দানিয়েল ফিয়েরেস্তেইন,  গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী আয়ারল্যান্ডের ডেনিস হেলিডে, মালয়েশিয়ার জুলাইহা ইসমাইল।  কম্বোডীয় আইনবিদ হেলেন জার্ভিস আছেন এই প্যানেলে। তিনি পিপিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট। বাংলাদেশেও যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে কাজ করেছেন হেলেন। অস্ট্রেলিয়ার সিডনির মেকুইয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক প্রধান গিল এইচ বোয়েরিঙ্গারও বিচারকদের একজন। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার মানবাধিকার আইনজীবী নুরসিয়াবানি কাতজাসুংকানা, ইরানের মানবাধিকার আইনজীবী সাদি সদর এবং ইতালির সুপ্রিম কোর্ট অব ক্যাসেসনের বর্তমান সলিসিটর জেনারেল নিলও রেসি আছেন এই প্যানেলে।
রোমভিত্তিক পারমানেন্ট পিপলস ট্রাইব্যুনাল (পিপিটি) নামের একটি সংগঠন গণ- আদালত গঠন করে।  পিপিটি মালয়েশীয় সাংগঠনিক কমিটির সভাপতি চন্দ্র মোজাফফর বলেছেন, পাঁচ দিনের অধিবেশনে বিচারকেরা প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক বিশেষজ্ঞ সাক্ষীদের মতামত, ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি বিচার-বিশ্লেষণ করবেন। শুক্রবার সকাল ১০টায় তাঁরা রায় ঘোষণা করবেন।

মুসলিম ওয়ার্ল্ড বিজ সম্মেলনে রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধের আহবান
এদিকে কুয়ালালামপুরে চারদিন ব্যাপী পুত্রাওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে মুসলিম ওয়ার্ল্ড বিজ সম্মেলনের তৃতীয় দিন বুধবারের সমাপনী অধিবেশনে নেতারা মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের গণহত্যা বন্ধ করতে সু চি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান বর্বরতা বন্ধ এবং কোনো ধরনের বৈষম্য কিংবা বর্নের ভিত্তিতে শ্রেণিকরণ না করে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

সম্মেলনে জানানো হয়, এক লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী মালয়েশিয়ায় আশ্রয়ে রয়েছে। মুসলিম অধ্যুষিত মালয়েশিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) ৫৯ হাজার নিবন্ধিত শরণার্থী রয়েছে। মুসলিম বিশ্ব নেতারা এক কাতারে এসে মুসলিম নিধন বন্ধের আহ্বান জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published.