মঙ্গলবার, মার্চ ২
Shadow

শীতের সবজিতে কৃষকের মুখে হাসি

আব্দুল আজিজ :
তীব্র শীতের শুভ্র কুয়াশার চাদর উপেক্ষা করে সবজি চাষে ব্যস্ত গাজীপুরের শ্রীপুরের কয়েক হাজার কৃষক। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শীতের তীব্রতা। লতা-পাতা আর ঘাসে চকচক করছে ভোরের শিশির। কৃষকের বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে এখন সবুজ সবজির বাহারি খেলা। ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, লাউ, টমেটো ও ধনেপাতার গন্ধে আমোদ চারদিকে। মাঠে শীতের সবজির সমারোহ প্রকৃতিকে জানান দিচ্ছে এখন চলছে পৌষ মাস। এবার শীতের সবজির ভাল দাম ও বাম্পার ফলন পাওয়ায় কয়েক হাজার কৃষক এবার নতুন স্বপ্নে বিভোর।

শ্রীপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, উপজেলার আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌর এলাকার ১২’শ ৮৬ হেক্টর জমিতে এবার শীতকালীন সবজির চাষ হয়েছে। যার মধ্যে ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলা, শিম, লাউ, টমেটো ও বিভিন্ন জাতের শাক রয়েছে। স্থানীয় কৃষি অফিসের তত্ত¡াবধানে গত কয়েক বছর যাবৎ কৃষকদের বিষমুক্ত সবজি চাষে প্রশিক্ষণ দেওয়ায় এখন শ্রীপুরে উৎপাদিত অধিকাংশ সবজিই বিষমুক্ত। এছাড়াও গত কয়েক বছর ধরে দেশে কোন হরতাল অবরোধের মত কর্মসূচি না থাকায়, পণ্য পরিবহনে কৃষক বাড়তি সুবিধার মাধ্যমে ভাল দাম পাচ্ছেন। কৃষকের উৎপাদিত সবজি রাতে রাতেই গাজীপুর ও মাওনা চৌরাস্তার কয়েকটি আড়ৎ হয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ হচ্ছে। এছাড়াও গ্রামীণ অনেক পরিবার শখের বসে বাড়ির আঙিনায় বিষমুক্ত নানা ধরনের শাক সবজি চাষ করে পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে অধিকাংশ বাজারে বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন।

শ্রীপুরের মাওনা ইউনিয়নের শিরিশগুড়ি গ্রামে নিজের ভাড়াকৃত ২৫বিঘা জমিতে প্রায় লক্ষাধিক বাঁধা কপির চাষ করে এবার তাক লাগিয়ে দিয়েছেন অবসর প্রাপ্ত সেনা সদস্য জিল্লুর রহমান। ২০১২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩২ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি বিভাগ থেকে অবসর নিয়ে একই বিভাগের মেজর (অব:) তানভীর হায়দারের বিষমুক্ত সবজি চাষের উৎসাহে তিনি কৃষিতে নিজের সবকিছু বিনিয়োগ করেছেন। প্রথমে পেঁপেঁ চাষের মাধ্যমে কৃষি কাজ শুরু করলেও চলতি মৌসুমে বাঁধাকপির চাষ করেছেন। তিনি জানালেন, প্রায় লক্ষাধিক বাঁধাকপি এখন বিক্রির উপযোগী। এজন্য তাঁর খরচ হয়েছে পাঁচ লাখ টাকা। বর্তমান বাজারে সবজির ভাল দাম থাকায় আশা করা হচ্ছে লাভের অংক পাঁচ লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

মুলাইদ গ্রামের কৃষক সিরাজউদ্দিন জানান, বিগত ২০১৪সালে বিএনপি জামায়াতের টানা অবরোধে তাঁর ক্ষতি হয়েছিল তিন লক্ষ টাকা। বিভিন্ন কারণে নিঃস্ব হওয়ার পথেই আবারো ধার দেনা করে কয়েক বছর কোন রকমে কৃষিতে টিকে থেকেছেন। এবার সাত বিঘা জমিতে শীত লাউ ও ফুলকপি চাষ করেছেন। দেড় লাখ টাকা খরচ হলেও এখন পর্যন্ত বিক্রি তিন লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আরো এক লক্ষ টাকা বিক্রির আশা তাঁর। ধার দেনা শোধ হওয়ার মধুর স্বপ্নের হাতছানি এখন তাঁর সামনে।

গোদারচালা গ্রামের গৃহবধূ কমলা আক্তার। তিনি নিজের শ্রমেই বাড়ির পাশের অব্যবহৃত দশ শতাংশ শীত লাউয়ের চাষ করেছেন। এখন পর্যন্ত বাজারে ৫০ টাকা দরে প্রায় আটশত পিছ লাউ বিক্রি করেছেন। এতে তাঁর মাচা তৈরী ও আনুষাঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে বিশ হাজার টাকা আয় হয়েছে।

শ্রীপুর উপজেলা কৃষি অফিসে কর্মরত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবু সাইদ জানান, বিষমুক্ত ও বিজ্ঞান ভিক্তিক উপায়ে সবজি চাষে কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তোলা হচ্ছে। কৃষি একটি লাভজনক ব্যবসা বিধায় এখানে লোকসানের কোন ধরনের সম্ভাবনা নেই। ভালো দাম ও সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায়, দিন দিন সবজি চাষে কৃষকের আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এ বিষয়ে সার্বক্ষণিক আমরা মাঠে থেকে কৃষকদের বিনামূল্যে পরামর্শ দিচ্ছি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুয়ীদ উল হাসান জানান, কৃষি বিভাগের নজরদারীতে শ্রীপুরে উৎপাদিত অধিকাংশ সবজিই বিষমুক্ত। এবার কৃষকের মাঠে শীতকালীন সবজির বাম্পার ফলন, আবহাওয়া অনূকুল ও দাম ভাল হওয়ায় কৃষকের মুখে এখন হাসির ঝিলিক দেখা যাচ্ছে। তাঁদের আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর হিসেবে গড়ে তুলতে কৃষি বিভাগ আন্তরিক ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যার ফল পাচ্ছে প্রান্তিক কৃষক।