সোমবার, জানুয়ারি ১৮
Shadow

টাকা নেই সেবাও নেই ! শ্রীপুরে সিটিজেন চার্টারের বোর্ডেই সীমাবদ্ধ ভুমি সেবা

শ্রীপুর(গাজীপুর)প্রতিনিধি :
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন ভূমি অফিসে নামজারীর প্রতি নথিতে অফিস খরচ’ নামে টাকা নির্দ্দিষ্ট করে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ভূমি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। ঘুষ ছাড়া কাজ করতে গিয়ে সরকারী সেবা নিতে আসা ভূমি মালিকদের হয়রাণী দিন দিন বেড়েই চলছে। ঘুষ ছাড়া এখন ভূমি অফিসে ভুমি মালিকদের কাজ অসম্ভব ব্যাপার।সাধারণ ভূমি মালিকদের মতে বিভিন্ন ভূমি অফিসের সামনে প্রদর্শণ করা সিটিজেন চার্টারের বোর্ডেই সীমাবদ্ধ রয়েছে ভূমি সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম।

সরেজমিন বিভিন্ন ভুমি অফিসে ভূমি সেবা নিতে আসা সেবাপ্রার্থীদের তথ্যমতে, পুরো উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস ও একটি উপজেলা ভূমি অফিসের ভূমি সংশ্লিষ্ট সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব অফিসে ভূমি সংশ্লিষ্ট সেবা নিতে প্রতিটি কাজের জন্য এমনকি পরামর্শ নিতেও টাকা গুনতে হয়। ভূমি অফিসের প্রধান সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে ভূমি কর্মকর্তা সার্ভেয়ার, কানোনগো অফিস সহায়ক ও কয়েকশ দালালের প্রতিনিয়ত হয়রাণী। প্রত্যেকটা ভূমি অফিসের নিয়ন্ত্রণ ভূমি কর্মকর্তাদের নিয়োগ করা দালালদের হাতে। অফিসে চেয়ার টেবিল নিয়ে কর্মকর্তাদের মত দালালরাও কাজ করেন। গুরুত্বপূর্ণ সরকারী নথি,অফিসের রেকর্ডপত্রও দালালদের হাতে থাকে। ভূমি কর্মকর্তাদের সাথে সরাসরি কোন ভূমি মালিক যোগাযোগ করলে তাঁরা দালালদের ধরিয়ে দেন। দালালদের মাধ্যমে টাকা পেলে দালালদের প্রস্তুত করা নথিতে ভূমি কর্মকর্তারা সই দেন, টাকা না দিলে বিভিন্ন কারন দেখিয়ে নামজারীর নথি বাতিল করেন। নথিতে থাকা ভূমি মালিকদের মুঠোফোনে প্রথম থেকেই যোগাযোগ শুরু করেন দালালরা। বর্তমানে নামজারীর নথিতে ১ একর পর্যন্ত অফিস খরচ নির্ধারণ করা আছে ৫-১০হাজার টাকা । কাগজপত্রে সমস্যা জমির দখল না থাকলে নামজারী করতে টাকার অংক কয়েক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।। অথচ সরকারী বিধি অনুযায়ী ডুপ্লিকেট কার্বন রশিদ (ডিসিআর) ১১৫০টাকা সহ ১২০০ টাকার উপরে ভূমি মালিকদের কাছ হতে নামজারী অনুমোদন হওয়ার আগে কোন ধরনের অর্থ নেয়ার কোন বিধান নেই। ভূমি মালিকরা এসব জানার পরও তাঁদের বিভিন্ন ফাঁদে ফেলে ভুমি কর্মকর্তারা অফিস খরচ আদায় করেন। অফিস খরচ না দিলে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে নামজারীর নথি বাতিল করা হয়। আবার নামজারী হওয়ার পর জোত খুলতেও টাকা গুনতে হয়। ভূমি উন্নয়ন পরিশোধের কোন জমির কত টাকা খাজনা তার নির্দ্দিষ্ট তালিকা প্রদর্শণ বোর্ডে না থাকায় ভূমি মালিকদের নানা ভাবে হয়রানী করেন ভূমি কর্মকর্তারা। ভূমি কর্মকর্তাদের আদায়কৃত অফিস খরচের একটা অংশ নথির সাথে উপজেলা ভূমি অফিসে নামজারী সহকারীর নিকট বুঝিয়ে দিতে হয়। সেখানে টাকা না পেলে নামজারীর নথি সহকারী কমিশনারের সামনে উপস্থাপন হয় না। প্রতিটা নথিতে অফিস খরচ জমা দেয়া হলে বিধি অনুযায়ী নামজারীর দখল, নোটিশ, মালিকানা দেখা হয় না। আর এ কারনেই শ্রীপুরে প্রতিনিয়ত একজনের জমি অন্যের নামে নামজারী করে দেওয়ায় মিস কেসের সংখ্যা বেড়েই চলছে। জমির দখল নামজারীর অন্যতম প্রধান শর্ত থাকলেও শ্রীপুরে নামজারীর আবেদনের পর কোন ধরনের দখল দেখা হয় না। নোটিশ জারীর জন্য ২০ টাকা ফি নিলেও কোন ধরনের নোটিশ জারী করা হয় না। নামজারীর পুরো পক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় একপ্রকার অসচ্ছ ভাবে। যেখানে মুখ্য ভূমিকা পালণ করে অফিস খরচের টাকা।
মাওনা গ্রামের আবু নাছের অভিযোগ করেন, গফরগাওয়ের পাগলা এলাকার শফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি শ্রীপুর উপজেলা ভূমি অফিসে দালালি করে ভূমি দস্যুদের সাথে সখ্যতা রেখে বিভিন্ন অনিয়ম করে থাকেন। তার মুলাইদ মৌজার কোটি টাকার জমি ভূমিদস্যুদের নামে নামজারীতে সহায়তা করেছিলেন শফিকুল। পরে এই শফিকুলের নামে থানায় অভিযোগ দিলেও কাজ হয়নি। এখনও প্রতিদিন উপজেলা ভুমি অফিসে কর্মকর্তাদের সাথে কাজ করেন।
মাওনা ভূমি অফিসের উমেদার আবুল কাশেম জানান,আমরা কাজ করি ভূমি কর্মকর্তাদের অধিনে। তারাই আমাদের কাজের জন্য চেয়ার টেবিল দিয়েছেন।তাদের হুকুমমত বিভিন্ন কাজ করি। অন্য কাউকে জবাবদিহীতা করতে আমরা বাধ্য নই।
শ্রীপুর পৌর ভূমি অফিসের উমেদার(দালাল) আজিজুল হক জানান, প্রত্যেকটা নথি ভুমি অফিসে আসলে ভূমি কর্মকর্তার আদেশ মত অন্যান্য উমেদারদের মধ্যে বন্টন করা হয়। এসময় নথিতে থাকা মুঠোফোনে ভূমি মালিকদের সাথে তাঁরা যোগাযোগ করেন। পরে ভূমি মালিকরা আসলে তাদের অফিস খরচের কথা বলা হয়। অফিস খরচ দিলেই নথি তৈরীর কাজ শুরু হয়।
মাওনা উত্তরপাড়াগ্রামের হতদরিদ্র সালেহা খাতুন জানান, নিজের পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া সাড়ে তিন শতাংশ জমিতে বসতবাড়ি তৈরী করে বসবাস করে আসছিলেন।সম্প্রতি জমিটি তাঁর দুই সন্তানদের নামে রেজিষ্ট্রি করে দেন। নিয়ম অনুযায়ী সন্তদানদের নামে নামজারী করার জন্য উপজেলা ভূমি অফিসে আবেদন করেন যার নথি নং ৯৯০/১৭-১৮। অফিসের দালাল ভূমি কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াহাবের সাথে চেয়ার টেবিল নিয়ে বসা আবুল কাশেম ০১৯২৩৬২১২৮৫ নাম্বারে ফোন করে ১০ হাজার টাকা নিয়ে আসতে বলেন।সময়মত টাকা যোগাড় করতে না পারায় পরে তাঁর নথি বাতিল হয়ে যায়।
একইভাবে মাওনা গ্রামের আফাজউদ্দিন তাঁর ১৫ শতাংশ জমি নামজারী করার জন্য ৯৮৯/১৬-১৭ নথির মাধ্যমে আবেদন করেন। এসময়ভূমি অফিসে গেলে ভূমি কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াহাব অফিস খরচের কথা বলে ১১ হাজার টাকা দাবী করেন। পরে ৮হাজার টাকা দিলে নামজারীর প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়।
কেওয়া মৌজার ৭শতাংশ জমি নামজারী করার জন্য হতদরিদ্র মোহাম্মদ আলী তিনবার আবেদন করেছেন।একবার ভূমি অফিসের ভূমি কর্মকর্তার নিয়োগ করা দালাল আজিজুলকে ৩ হাজার টাকাও দিয়েছিলেন। বাকি ৫ হাজার টাকার ব্যবস্থা না করতে পারায় আজও নামজারী সম্পন্ন হয়নি।
কেওয়া মৌজার অপর ভূমি মালিক জহুরা খাতুন অভিযোগ করেন,তাঁর রেকর্ডিয় ২২ শতাংশ জমি অনেক টাকার বিনিময়ে ভূমি কর্মকর্তার যোগসাজসে অন্যের নামে নামজারী করে দিয়েছেন ভূমি কর্মকর্তারা। এখন নিজেও নামজারী না করতে পেরে সরকারকে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে পারছেন না।
মাওনা ইউনিয়ন ভুমি সহকারী কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াহাব জানান, অফিসে লোকবল সংকটের কারনে বাহিরের লোক দিয়ে কাজ করানো হয়। তবে নামজারী করতে কোন টাকা লাগে না। খুশি হয়ে ভূমি মালিকরা যা দেয় তাই আমাদের চলে।
শ্রীপুর পৌর ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন পালোয়ান জানান, প্রত্যেকটা ভূমি অফিসে পূর্ব থেকেই এসব দালালরা কাজ করছেন। তাদের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ যদি আদেশ দেন তাহলে আমরা তা পালন করতে বাধ্য।
শ্রীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সোহেল রানা জানান,সরকারী রেকর্ড পত্র নিয়ে বহিরাগত কারো কাজ করার নিয়ম নেই তবে কী কারণে এসব হচ্ছে, কেন হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। যদি প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ড. মুহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ভূমি অফিসে দালাল দিয়ে কাজ করানোর কোনও সুযোগ নেই। যদি শ্রীপুরের কোনো ভূমি অফিসে দালাল দিয়ে রেকর্ড বা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রে দালালদের হাত দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।