শনিবার, জানুয়ারি ১৬
Shadow

জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সমস্যা

 

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে সে দেশের সেনাবাহিনী কর্তৃক জাতিগত রোহিঙ্গা নিধন চলছেই। এর পেছনে এক শ্রেণীর সন্ত্রাসবাদী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও ভিক্ষুদের ইন্ধনের অভিযোগও আছে। মিয়ানমারে জন্মসূত্রে শতাধিক ছোট-বড় নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও জাতিগত সম্প্রদায় থাকলেও যে কোন কারণেই হোক সামরিক মদদপুষ্ট তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিক বলে মনে করে না। দুঃখজনক হলো, সরকারের সঙ্গে একই সুরে তাল মিলিয়েছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী নেত্রী আউং সান সুচি। তারা মনে করে, রোহিঙ্গারা বাঙালী এবং বাংলাদেশ থেকে আগত অভিবাসী। যেটি ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক বিচারে সর্বৈব মিথ্যা এবং অগ্রহণযোগ্য। যা হোক, মিয়ানমার সরকারের একগুঁয়ে ও অনমনীয় মনোভাব এবং অব্যাহত দমনপীড়ন এমনকি পোড়ামাটি নীতি গ্রহণের কারণে দীর্ঘদিন ধরে সে দেশ থেকে রোহিঙ্গা বিতাড়ন চলছেই। আর আরাকান রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থল ও জলপথে সীমান্ত সংযোগ আছে বিধায় ভিটামাটি হতে বিতাড়িত রোহিঙ্গারা দলে দলে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে বাংলাদেশে। কিছু গেছে ভারত, পাকিস্তান ও অন্যত্র। তবে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার প্রধান শিকার বাংলাদেশ। অথচ বাংলাদেশ তার সীমিত ভূখ-, বিপুল জনগোষ্ঠী ও পরিমিত অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে মধ্যে এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয়সহ অন্নসংস্থান করতে সমর্থ ও সক্ষম নয়। দুঃখজনক হলো, ইতোপূর্বে কোন সরকারই সমস্যার সমাধানে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক কোন ফোরামে তোলেনি। এ কথার সমর্থন মিলেছে সম্প্রতি কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত মিয়ানমারের কথিত রাষ্ট্রীয় অপরাধ সংঘটনের বিচারে গঠিত এক আন্তর্জাতিক গণ-আদালতের শুনানিতে। সেখানে ব্রিটেনপ্রবাসী এক বৌদ্ধ মানবাধিকারকর্মী এই মর্মে তথ্য দেন যে, ১৯৭৮ সালে তৎকালীন জেনারেল জিয়া সরকার দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় রোহিঙ্গাদের ফেরত না নেয়া হলে অস্ত্র সরবরাহের হুমকি দিয়েছিল। আর এরপরই ওই হুমকিকে অবমাননাকর বিধায় মাত্র ৪ বছরের ব্যবধানে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইন করে রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রবিহীন করা শুরু করে তৎকালীন নে উইন সরকার, যার জের চলছে এখনও।

যা হোক, কিছু বিলম্বে হলেও এই প্রথম হাসিনা সরকার বিষয়টি নিয়ে গেছে আন্তর্জাতিক পরিসরে এবং জাতিসংঘে। সামরিক মদদপুষ্ট মিয়ানমার সরকারের সর্বশেষ দমনপীড়ন এবং দলে দলে রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগের খবরে বিশ্বব্যাপী নিন্দা ও ধিক্কারের ঝড় উঠছে। বিষয়টি জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে জাতিসংঘেও। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও বর্তমানে অবস্থান করছেন সেখানে। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা বলেছেন। যেটি অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্ববহ। পরবর্তীতে তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অবশ্য শরণার্থী সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মনোভাব জানেন বিধায় সে বিষয়ে সহায়তা প্রত্যাশা করেননি, যা তিনি পরিষ্কার করেছেন রয়টার্সের সঙ্গে সাক্ষাতকারে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অবশ্য সুস্পষ্ট করে বলেছেন, মিয়ানমারে অনতিবিলম্বে সেনা অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদে ফিরিয়ে নিতে হবে সেদেশে। দীর্ঘদিন পর মৌনতা ভেঙ্গে সুচি জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছেন তাতেও পরিষ্কার করে বলেছেন, মুসলমানরা কেন বাংলাদেশে যাচ্ছে তা খতিয়ে দেখা হবে এবং সেদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের যাচাই করে ফেরত নেয়া হবে। আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাখাইন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি। রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান ও সম্মানজনক পুনর্বাসনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ৬ দফা শান্তি ফর্মুলাও পেশ করেছেন। কিছুটা সময়সাপেক্ষ হলেও এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে বর্তমান সরকারের সফল পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য ও সার্থকতা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.